kalerkantho

নারী দিবস

আপন আলোয় উদ্ভাসিত ‘বোদওঁয়া’ শেফালী

জহর দফাদার, যশোর থেকে   

৮ মার্চ, ২০১৭ ১৬:৫১



আপন আলোয় উদ্ভাসিত ‘বোদওঁয়া’ শেফালী

শেফালী দাস যখন শ্বশুরবাড়ি চলে আসেন, তখন তাদের অার্থিক অবস্থা ছিল খুবই খারাপ!

শ্বশুরবাড়ি; কিন্তু ভাড়া বাসা। এমন অবস্থা যে, উঠোন নিকোতে একটু গোবর চাইতে গেলেও প্রতিবেশীরা বিরক্ত হতেন। এমনও দিন গেছে, আধ পেটা খেয়ে না খেয়ে কেটেছে বেলা।

নিজের বাড়িতে বসে নারকেলের পাতা থেকে শলাকা বের করতে করতে শেফালী দাস (৫০) বলছিলেন তার দুরবস্থার কথা।  
তাঁর দু’রুমের সেমি পাকা বাড়ির উঠোনে বসে কাজ করছিলেন। বাইরে থেকে ডাক দিলে তিনি ভেতরে যেতে বলেন। পরিচয় শুনে বসতে এগিয়ে দেন প্লাস্টিকের টুল।

শেফালী দাস থাকেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মহিষাহাটি ঋষীপল্লী এলাকায়। এই এলাকার নাম বছর ২০ আগে ‘হিলারি আদর্শপাড়া’ নামে হিসেবে পরিচিতি পায়। লোকজনের মুখে তখন উচ্চারিত হতো ‘হিলারিপাড়া!’ এখন আর কেউ এই নামে ডাকে না।  

শেফালী দাসের বাবার বাড়ি যশোর সদরের চুড়ামনকাঠি এলাকায়।

তার মায়ের বান্ধবীর ছেলে ছেলে গোবিন্দ দাস (৫৭)। গোবিন্দ দাস তার স্বামী। ছোটবেলায় তাকে দাদা বলে সম্বোধন করতেন শেফালী।  

জিজ্ঞেস করি, দিদি বয়স কত চলছে আপনার?
তিনি বেশ কৌতুকবোধ করলেন। এক গাল হেসে বললেন, ‘আমার এখন যা বয়স, বিয়ের বয়সও তাই!’ 

দু’চোখে কৌতুহল তুলে তাকাই তার দিকে। তিনি বলে যান অকপটে-
‘বড় হয়ে শুনতে পাই, আমার যখন চার মাস বয়স, তখন আপনাদের দাদা গোবিন্দ দাসের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। তিনি (স্বামী) তখন ৭ বছরের। খুব ছোটবেলায় তাদের বাড়ি যাতায়াত ছিল আমার। তাকে দাদা বলেই ডাকতাম। দেশস্বাধীনের পর ভারত থেকে যখন ফিরি, তখন আমার সাত বছর। সেসময় জানতে পারি, তার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেছে। তারও দুই-তিন বছর পর আমি শ্বশুরবাড়ি চলে আসি। ’

একসময় শ্বশুরবাড়ি হলেও পরের বাসায় থাকতেন শেফালী-গোবিন্দ দম্পতি। বলেন, ‘প্রতিবেশীদের কাছে একটু গোবর চাইতে গেছি; তারা মুখ কালো করে বলতেন- নেই। এখন দেখেন, আমার গোয়ালে দুটো গরু, পাঁচটা ছাগল!’

কীভাবে সেই অবস্থার উন্নয়ন- জানালেন তিনি।
গোবিন্দ দাসের পৈত্রিক পেশা হচ্ছে জুতা-স্যান্ডেল পলিশ করা। তিনি এই পেশাতেই আছেন। দু’মেয়ে এবং এক ছেলে তাদের পরিবারে।

শেফালী জানান, বছর ২৫ আগে দুই হাজার টাকা ঋণ নেন। সেই টাকা খাবারের পেছনে খরচা না করে কাজে লাগান। বাড়িতে বসে শেফালী ওই টাকা দিয়ে বাঁশ, শলাকা ইত্যাদি কিনে ঝুঁড়ি, কুলো, ঝাঁড়ু– ইত্যাদি তৈরি করে বিক্রি করতে থাকেন।  

বছর ২০ আগে যেবার ঋষীপল্লীতে (হিলারি আদর্শপাড়া) এসেছিলেন সাবেক মার্কিন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন, তার কন্যা চেলসি ও ড. ইউনূস

এরপর সেই ঋণ শোধ করে আবারও নেন- এভাবে চলতে থাকে। কিস্তির টাকা ঠিকমত পরিশোধ করায় তার সম্পর্কে ভাল ধারণা হয় ঋণপ্রদানকারী সংস্থার কাছে।
তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ গত বছর আমি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ নিই। ওই টাকার সঙ্গে আরও তিন লাখ দিয়ে বাড়ির পাশে ২১ শতক জমি কিনেছি। সেখানে লাগানো হয়েছে মেহগনি গাছ। ’

তিনি জানান, ২৫ বছর আগে তার সহায়-সম্পদ বলে কিছুই ছিল না। এখন ৫ শতক জমির পরে নিজের একটি বাড়ি হয়েছে; আছে আলাদা রান্নাঘর আর গরুর জন্যে গোয়াল।

তিনি বলেন, ‘দু’মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। ছেলেকেও। তাদের বিয়েতে সাধ্যমত ধুমধাম করা হয়েছে; এলাকার মানুষজনকে নিমন্ত্রণ করে খাইয়েছি। মেয়ে কিংবা ছেলেবৌকেও সাধ্যমত গহনা দিয়েছি। ’

২০১৫ সালে শেফালী দাস বোদওঁয়া পুরস্কারে ভূষিত হন। এই পুরস্কারটি হচ্ছে একটি ঋণ প্রদানকারী সংস্থার। যারা ঋণ নিয়ে নিজেদের আর্থিক উন্নয়ন সাধন করতে পারেন; শুধুমাত্র তাদেরই দেওয়া হয়।


মন্তব্য