kalerkantho

নারী দিবস

তারাবুনিয়ার 'তারা' হেলেনা

রফিকুল ইসলাম, রাজাপুর থেকে ফিরে   

৮ মার্চ, ২০১৭ ১৯:০৪



তারাবুনিয়ার 'তারা' হেলেনা

গ্রামের দরিদ্র শিশুদের বিনামূল্যে শিক্ষাদান ও উপকরণ সরবরাহ করছেন। দুস্থ রোগীকে অর্থ, রক্তদান করছেন।

শুধু তাই নয়, ঘরে ঘরে গিয়ে শিশুদের স্বাস্থ্যের খোঁজ নেন। গরিব ঘরের মেয়েদের বিয়েতে সহযোগিতা, শীতে হতদরিদ্রদের কাপড় দেন। পরামর্শ দেন সবাইকে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহারের। এভাবে নারীরা নিজেদের জন্য, এমনকি গ্রামের জন্য শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। সমাজ বদলের এ কাজে নারীদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হেলেনা বেগম। গ্রামের নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথও দেখিয়েছেন তিনি। তাঁর দেখানো পথে ওই গ্রামের অন্তত ৬৫ জন নারী দাঁড়িয়েছেন নিজের পায়ে। সংসারে এনেছেন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য।  

শুরুর দিকে হেলেনার সমাজ বদলের এ কাজকে এলাকার লোকজন বাঁকা চোখে দেখতেন।

বছর দশেক হলো পাল্টে গেছে সেই দৃষ্টিভঙ্গি। ঝালকাঠীর রাজাপুর উপজেলার দক্ষিণ তারাবুনিয়া গ্রামের হেলেনা বেগমের কাজের প্রশংসা এখন সবার মুখে মুখে। হস্তশিল্পে দক্ষতা দেখিয়ে নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন বয়সের অসহায় অর্ধশতাধিক নারীকে তিনি স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ তারাবুনিয়া দুস্থ নারীকল্যাণ সমিতির উৎপাদিত পণ্য এখন বিক্রি হচ্ছে ঢাকার অভিজাত দোকানগুলোতে। এসব কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন অনেক পদক। এখন তাঁর পরিচিতি তারাবুনিয়ার গ্রামের 'তারা' হিসেবে।   

অংটি বিক্রির টাকায় শুরু  
শেরে বাংলা ফজলুল হকের জন্মভুমি সাতুরিয়া। ঝালকাঠীর রাজাপুরের একটি গ্রাম। ১৯৬৪ সালে এই গ্রামেই হেলেনা বেগমের জন্ম। এসএসসি পাশের পর ১৯৮৯ সালে প্রতিবেশী স্কুল শিক্ষক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয়। শিক্ষক হিসেবে ভালো থাকলেও পরিবারের প্রতি তিনি ছিলেন অনেকটা উদাসীন। পড়ালেখা আর না এগুলোও পাঁচ বছরের ব্যবধানে দুই সন্তানের মা হন। তবে পরিবার থেকে সাহায্যের হাত গুটিয়ে নিলেন তাঁর শ্বশুর। স্বামীর শিক্ষকতার টাকায় সংসার চলছিল না। তাই শুরু হলো অভাব অনটন। এভাবে কেটে গেল আটটি বছর। একদিন নিজে কিছু করার উদ্যোগ নিলেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালো অর্থের অভাব। কারণ তখন হাতে একটি টাকাও ছিল না। নারী বলে কেউ টাকা ধারও দিতে সাহস পাচ্ছিল না।  

শেষমেষ বিয়ের প্রস্তাবের সময় মুখ দেখে শ্বশুর যে সোনার আংটিটি দিয়েছিলেন, সেই অংটিটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন হেলেন। সেটি বিক্রি করে একটি সেলাই মেশিন নিয়ে আসেন। কিন্তু সেলাইয়ের কাজ জানেন না। পার্শ্ববর্তী ভাণ্ডারিয়া উপজেলার সদরের ফিরোজ খলিফার কাজ থেকে স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণ নেন। পরে বাড়ির আশপাশের বউ-ঝিদের কাপড় সেলাইয়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন শুরু হয়। সেই উপার্জিত অর্থ দিয়ে গড়ে তোলেন একটি মুরগির খামার।  যুব উন্নয়ন থেকে প্রশিক্ষণ নিলেন। সেখান থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করলেন গরু পালন। গরুর গোবর দিয়ে স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উপজেলায় প্রথম বায়োগ্যাস প্লান্ট তৈরি করেন।  

সংগ্রামী জীবন 
গরিব কৃষক বাবার ঘরে জন্ম হেলেনা বেগমের। বাবা জমিতে কৃষিপণ্য ফলাতেন। কোনও ভাই না থাকায় বাবার সাঙ্গে মাঠে কাজ করতেন তিনি। জমিতে উৎপাদিত পণ্য মাথায় করে বাজারে নিয়ে যেতেন, এমনকি বিক্রিও করতেন। বিয়ে হয় এক রক্ষণশীল পরিবারে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলা তো দূরের কথা ঘরের বাইরেও যাওয়া ছিল নিষেধ। তাই বিয়ের আট বছর কেটেছে অনেকটা বন্দি অবস্থায়। কিন্তু হেলেনা তো ঘরে বন্দি থাকার মেয়ে নন। কারণ বাবার পরিবারে কোনও ছেলে না থাকায় ঘরের নিত্য প্রয়োজনীয় কাজের পাশাপাশি বাজারে যেতে হতো তাঁকে। ছোটবেলা থেকে সব ধরনের কেনাকাটা তিনিই করতেন। সেই মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে বন্দি থাকবে- এটা তো হতে পারে না। একদিন ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে স্বামীর জুতোর মধ্যে রাখা টাকার সন্ধান পান তিনি। সেই টাকা জমানোর মাধ্যমে শুরু হয় স্বাবলম্বী হওয়ার পথচলা।   

লেখাপড়া জানা হেলেনা শ্বশুরবাড়িতে এসে দেখেন, যৌতুকের জন্য ওই গ্রামের নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অল্প বয়সী মেয়েদের দেওয়া হচ্ছে বিয়ে। শিশুরা স্কুলে না গিয়ে ক্ষেতে কাজ করছে। গ্রামের এ চিত্র হেলেনাকে নাড়া দেয়। কিছু একটা করার কথা ভাবেন তিনি। স্বপ্ন দেখেন গ্রামের সব ছেলেমেয়ে স্কুলে যাবে, কোনো বাল্যবিয়ে, নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটবে না। নারীরাও আয় করে সমাজে মাথা উঁচু করে চলবেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ২০০২ সালের ২১ ডিসেম্বর গ্রামের ৩৫ জন দরিদ্র নারীকে নিয়ে একটি সমিতি গঠন করেন। সমিতির নাম দেন দক্ষিণ তারাবুনিয়া দুস্থ নারীকল্যাণ  সমিতি। পরে সমবায় কার্যালয় থেকে 'মহীয়সী নারীকল্যাণ সমিতি' নামে আরো ৩৫ নারীর সমন্বয়ে একটি সমিতি গঠন করেন।  

নাদীয়ার জন্য ভিক্ষা 

বছর নয়েক আগের কথা। সমিতির সদস্য তাসলিমা বেগম শিল্পীর মেয়ে নাদীয়া খেলতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়। মেয়ের পুরো মুখমণ্ডল আগুনে ঝলসে যায়। হেলেনা বলেন, "তাকে নিয়ে প্রথমে ভাণ্ডারিয়া হাসপাতাল ও পরে শেরে বাংলা মেডিক‍্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করাই। চিকিৎসক বললেন, মেয়েকে বাঁচাতে অনেক টাকার প্রয়োজন। কিন্তু শিল্পীর হাত তখন খালি। স্বামী ইউসুফ হাওলাদারের কাছে বেশি টাকা নেই। শেষমেষ সিদ্ধান্ত  নেই আমিই বাসে বাসে গিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলব। কথা অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। অনেকে ভিক্ষুক হিসেবে চার আনা, এক টাকা দিচ্ছে। অবার পরিচিত যারা তারা আমাকে দেখে ভড়কে গেছেন। বলছেন, হেলেনা তোর এই অবস্থা। বিষয়টি খুলে বলার পর তাদের ভুল ভেঙেছে। " 

তাসলিমা বেগম শিল্পী ও তার স্বামী ইউসুফ হাওলাদার বলেন, "চিকিৎসকের কথায় আমার মেয়ের সুস্থতার বিষয়টি একদম ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু হেলেনা আপা আমাদের মনোবল জুড়িয়েছেন। বাসে বাসে আর বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে চাঁদা তুলে মেয়েকে সারিয়ে তুলেছেন। তাঁর এ অবদানের বিষয়টি অস্বীকার করার নয়। সেদিনে সেই ছোট্র মেয়ে নাদীয়া এখন মাধ্যমিকে পড়ছে। " রাজাপুরের আফসার উদ্দিন মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী নাদীয়া বলে, "বাবা-মার কাছে শুনেছি, আমাকে বাঁচানোর জন্য হেলেনা চাচি গ্রামে গ্রামে ঘুরে চিকিৎসার টাকা তুলেছেন। বাসে বাসে গিয়ে টাকাও তুলেছেন। "

তারাবুনিয়া গ্রামে একদিন 
 
কেউ রান্না করছেন, সঙ্গে চলছে কাপড়ে নকশা তোলা। কেউ শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন, থেমে নেই নকশা করা। উঠানে গল্প করতে করতে চলছে হাতের কাজ। সবার হাতে সুঁই-সুতা। সুঁইয়ের ফোঁড়ে নান্দনিক নকশায় ফুটে উঠছে একেকটা কাপড়। বিশেষ কায়দায় সেলাই ও ভাঁজ করে ওই কাপড় দিয়ে বানানো হচ্ছে ব্যাগ। বুধবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামটির নারীরা কাপড়ে এভাবে নকশা তোলার কাজ করছেন। একটি সাধারণ কাপড়ের নকশার কাজের পর কতটা অসাধারণ হয়ে ওঠে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। সেখানকার বেশির ভাগ বাড়িতে চকচক করছে টিনের চালা। খড়ের কুঁড়ে ঘর নেই বললেই চলে। গ্রামের নারীরা নকশা তোলার কাজে ব্যস্ত।  

জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও ঘুম থেকে উঠেই শাহীনুরকে খাবারের চিন্তায় অস্থির থাকতে হতো। এখন তাঁদের সেই চিন্তা নেই। নেই কোনো অভাব। স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে থাকার উপায় পেয়ে গেছেন তাঁরা। তাঁদের বাড়িতে এখন টিনের ঘর আছে, আছে নলকূপ ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। শাহীনুর কাজ করে জমানো টাকায় স্বামীকে একটি টমটম কিনে দিয়েছেন। গ্রামের গৃহিনী সুলতানাও কিনেছেন একটি গাভি, ছাগল আর কয়েক শতাংশ জমি। তারাবুনিয়া গ্রামের শুধু শাহীনুর ও সুলতানাই কেবল নন। তারাবুনিয়াসহ পার্শ্ববর্তী ভাণ্ডারিয়া, গালুয়া, নলবুনিয়া গ্রামের স্বাবলম্বী হয়েছেন অন্তত ৬৫ নারী।  

কথা হয় তারাবুনিয়া গ্রামের বিভা রানীর সঙ্গে। জানালেন, পাঁচ বছর আগে তাঁর স্বামী মারা যান। দুই ছেলে আর চার মেয়েকে নিয়ে কষ্টের জীবন শুরু করেন। এরই মাঝে তিনি মেয়ের বিয়ে দেন। ফলে স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পদ শেষ হয়ে যায়। অভাবের তাড়নায় ছেলে মেয়েদের নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। শুরু করেন ব্যাগে নকশা তোলার কাজ। নকশার কাজ করে মাসে চার হাজার টাকা আয় করছেন। সেই টাকায় সংসার চলে। ছেলে-মেয়েরা পড়ালেখা করছে। বিউটি আক্তার জানান, পরিবার তেমন স্বচ্ছল ছিল না। প্রায়ই অভাব লেগেই থাকত। এখন টিনের ঘর করেছেন। গাছগাছালি ঘেরা বাড়িতে হাঁস-মুরগি, ছাগল পালন করছেন। কাজ করে মাসে চার হাজার টাকা আয় করছেন। সন্তানরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে।  

স্বীকৃতি 
কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী ক্যাটাগরিতে উপজেলা, জেলা এবং বরিশাল বিভাগীয় পর্যায়ে জয়িতার সন্মানে ভূষিত হয়েছেন হেলেনা। আইএফআইসি ব্যাংকের উদ্যোগে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তার সনদ পেয়েছেন। এ ছাড়া রাজাপুর উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে পেয়েছেন সম্মাননা। নিজের কাজ চালিয়ে যেতে চান আমৃত্যু। বললেন, "যখন নারী নির্যাতন মামলাগুলো নিয়ে বসতাম তখন অনেক জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তি আসামির পক্ষ হয়ে আমাকে ফোন করতেন, চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু আমি নতি স্বীকার করিনি। " 

হেলেনা বেগম আরো বলেন, "অসহায় নারীরা জনপ্রতিনিধি বা থানায় গিয়ে যা বলতে পারেন না, আমার কাছে এসে তা খোলাখুলিভাবে বলতে পারেন। তাই এখানে আসা অধিকাংশ পারিবারিক বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হচ্ছে। সমিতির সদস্যদের জন্য একটি বৃদ্ধাশ্রম আর সন্তানদের জন্য একটি স্কুল গড়ার স্বপ্ন দেখেন হেলেনা বেগম। কিন্তু সমিতির উদ্যোগে বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে জমি কেনা কঠিন। তাই এ স্বপ্নের বাস্তবায়ন নিয়ে দুশ্চিন্তাও রয়েছে তাঁর। সরকারের সহায়তা চান কিনা- জানতে চাইলে হেলেনা বললেন, "সরকার চাইলে হয়তো জমির ব্যবস্থা হতে পারে। "


মন্তব্য