kalerkantho

নারী দিবস

'এইসব নারীদের ভালোবাসা, প্রশ্রয় আর সান্নিধ্যেই আমার বেড়ে ওঠা'

আনিসুর বুলবুল   

৮ মার্চ, ২০১৭ ২২:১৭



'এইসব নারীদের ভালোবাসা, প্রশ্রয় আর সান্নিধ্যেই আমার বেড়ে ওঠা'

ছবি : সংগৃহীত

ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে পাশের গ্রামের এক বাড়িতে বেড়াতে গেছি। আমাদেরকে বসতে দিয়েছে বড় ঘরের খাটের ওপর।

সবাই ব্যস্ত কথা-বার্তায়; আমি ব্যস্ত খাটের পায়ার উপরের লাটিম সাদৃশ্য গোল ডিজাইনটা নিয়ে! কেমনে সেটাকে কেটে বাড়িতে নিয়ে আসা যায় প্ল্যান করছি।

খাটের নিচেই পেয়ে গেলাম দা। দা নিয়ে রেডি হলাম, লাটিমটা কেটে আমাকে নিতেই হবে! দিলাম কোপ!

ঘরের কথা-বার্তা বন্ধ; সবাই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার হাতে দা। আমিও তাকিয়ে আছি সবার দিকে। মা এগিয়ে এসে আমার হাত থেকে দা কেড়ে নিতে চায়। আমি দেই না। মাকে বলি, আমার এই লাটিমটা চাই-ই চাই!

ওই বাড়ির লোকজন আসল লাটিম নিয়ে এলো আমাকে দিতে, মা-ও কত্তো বুঝালো ... কিন্তু আমি নাছোরবান্দা! লাটিমটা আমার চাই।

শেষ অবধি সেই খাটের পায়ার ওপরের লাটিম সাদৃশ্য ডিজাইনটা কেটেই নিয়ে এসেছিলাম।

আপাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খাতির ছিলো বড় আপার সঙ্গে; তারপর নার্গিসাপা। মাঝে মধ্যে নার্গিসাপার স্বর্ণের চেইন পরে ঘুরাঘুরি করতাম। একদিন বিকেলে দুলাভাইয়ের সিডি এইটটি নিয়ে সোজা হাজির হলাম এক স্বর্ণকারের দোকানে। গলা থেকে চেইনটি খুলে দিয়ে বল্লাম, কিছু অংশ কেটে নাক ফুল বানায়া দে।

স্বর্ণকার পরিচিত। কোনো কথা না বাড়িয়ে কাজ শুরু করলো। বাকি স্বর্ণের চেইন আমাকে ফেরত দিলো।

কয়েকদিন পরে আপা তার স্বর্ণের চেইন চাইলো। দিলাম। আপা চেইন হাতে নিয়ে বুঝতে পারে। বলে, তুই চেইন কেটে কি করছিস? বলি, প্রেমিকার জন্য নাকফুল বানিয়েছি। আপা কপালে হাত মারতে মারতে ঘরের ভেতরে যায়।

রাত সাড়ে এগারটা! অফিসের ডেস্কে বসে কাজ করছি। হঠাৎ বউয়ের আসে কল। আমি লাবিবার খোঁজখবর নেওয়ার পর হাতে কাজ থাকায় বউকে বল্লাম- এখন রাখি তাহলে? বউ বলে- রাখবাই তো! এখন কি আর মনে আছে ২৭ আগস্টের কথা!

আমি কোনভাবেই মনে করতে পারছি না! ২৭ আগস্টে কী! বউও বললো না। লাবিবা কান্না করছে বলে কলটি কেটে দিলো। আমি চিন্তা-ভাবনা করে আর এই দিনটির কথা মনে করতে পারলাম না। কাজে মন দিলাম।

মিনিট দুয়েক পরে মোবাইলে একটি এসএমএস আসে। খুলে দেখি বউ এসএমএস করেছে। "ajker ai dine ami tomar dekha peyecilam. ata amar souvaggo. tai hoito dintike vulte parina! r tomar durvaggo. tai hoito vule geco.... sob kicur por ... i love you."

আমি হাতের কাজ ফেলে রেখেই হারিয়ে যাই সেই ২০০৩ সালের ২৭ আগস্টে! বউয়ের কাছে পুরাই ধরা খাই! শুধু রিপ্লাই করি! "i love you & i miss you too".

লাবিবার মাথার চুল কেউ ছাঁটাতে পারছে না। নাপিতের কাছ থেকে ফেরত এনে লাবিবার মা ও নানি দুজনেই সারাদিন লাবিবার পিছু পিছু ঘুরেছে! কিটক্যাট, আইসক্রিম, জুস, ললিপপ, চিপস, বিস্কুট কোনো কিছুতেই লাবিবাকে রাজি করাতে পারেনি। লাবিবা তার চুল ছাঁটাতে দেবে না। বউতো লাবিবার ওপর রেগে অস্থির!

বৃহস্পতিবার রাতে গিয়ে বাড়িতে পৌঁছি। বউ আমার দিকে তাকিয়ে অবাক! লাবিবা আমাকে দেখেই 'টাকলু বাবা' বলে চিল্লাইয়া উঠে। লাফিয়ে আমার কোলে ওঠেই বলে, বাবা, আমিও টাকলু হবো! বলি, ঠিক আছে কাল সকালে করে দেবো! লাবিবা বলে, না বাবা, এক্ষুনি হবো।

কি আর করার! আফটার অল মেয়ে বলে কথা! ভবিষ্যতে কত কিছুই তো লাবিবার জন্য বিসর্জন দিতে হবে! না হয় এখন থেকে 'চুল' বিসর্জনের মধ্য দিয়েই সেটা শুরু করলাম!


এইসব নারীদের ভালোবাসা, প্রশ্রয় আর সান্নিধ্যেই আমার বেড়ে ওঠা, বড় হওয়া, বেঁচে থাকা।

আজ ৮ মার্চ। আন্তর্জাতিক নারী দিবস।

পৃথিবীর সকল নারীদের জানাই অফুরন্ত ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা।


লেখক : সহসম্পাদক, কালের কণ্ঠ


মন্তব্য