kalerkantho

জীবন বাঁচায় ‘জীবন’

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



জীবন বাঁচায় ‘জীবন’

পার্বত্য জনপদ রাঙামাটি বরাবরই সবকিছুতে পিছিয়ে। উন্নয়ন আর সমৃদ্ধির নানান গালগল্প আর ফিরিস্তির ভিড়ে ঠিকই এখানে আলোকিত কাজ কিংবা স্বপ্নের চাষাবাদ কম।

একটা সময় ছিল যখন নিজের আত্মজ কিংবা স্বজন অথবা বিপন্ন কোনো প্রতিবেশীর প্রয়োজন, শহরে বড় কোনো সড়ক দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে আহত মানুষের রক্তের প্রয়োজনে অসহায় বোধ করতো মানুষ। এমন অসংখ্য ঘটনাই ঘটেছে শুধুই রক্তের অভাবে প্রাণ হারিয়েছে বহু  মানুষ। এমনই এক ক্রান্তিকালে আজ থেকে ছয় বছর আগে পার্বত্য শহর রাঙামাটিতে যাত্রা শুরু করে ‘জীবন’ নামের একটি সংগঠন।

রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আনোয়ারুল কবির পাটোয়ারীর নেতৃত্বে এক ঝাঁক সদ্য কিশোর পেরিয়ে আসা রাঙামাটি সরকারি কলেজ ও মহিলা কলেজের আটজন তরুণ-তরুণীর হাত ধরে যাত্রা শুরু করে সংগঠনটি। ধীরে ধীরে শহরের মানুষের প্রয়োজন কিংবা বিপদের প্রধান নির্ভরতা হয়ে ওঠেছে সংগঠনটি। এমন অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যাবে, গভীর রাত কিংবা ঝড়ের দিনে, কিংবা ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগেও রক্তের প্রয়োজনে মানুষ জীবনের মিকি বা রাসেল এর নাম্বারে ফোন করেই সমাধান মিলেছে।

গত ৬ বছরে কয়েক হাজার মানুষের পাশে রক্তের সহযোগিতা নিয়ে দাঁড়িয়েছে জীবন। শুধু তাই নয়, ধীরলয়ে শহরের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের শক্ত এবং দৃঢ় সাংগঠনিক ভিতও তৈরি করেছে সংগঠনটি।

এখন রাঙামাটির অসংখ্য তরুণ-তরুণী সম্পৃক্ত হয়েছে কিংবা রয়েছে ‘জীবন’ এর সাথে।

রাঙামাটি সরকারি কলেজ, মহিলা কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই আছে জীবনের নিজস্ব ইউনিট। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে রাঙামাটির সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিবেশী জেলা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠছে জীবনের কার্যক্রম। মূলত অনলাইনের ডাকে রক্তে সংগ্রহ করে দেওয়ার প্রয়াসেই যাত্রা শুরু করা জীবন, এখন অনলাইন, অফলাইন সর্বত্রই সক্রিয়।

যেভাবে ‘জীবন’ নির্মাণ

২০০৮ সালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক আনোয়ারুল কবির পাটোয়ারীর বাবা। অসুস্থ বাবার জন্য রক্তের খোঁজে পাগলপ্রায় তিনি। কিন্তু কোথাও মেলছে না রক্ত। পরে অনেক কষ্টে তাঁর এক ছাত্রের বড় ভাই রক্ত দেওয়ায় সেই যাত্রায় বেঁচে যান বাবা। কিন্তু সন্তানের বুকে ঠিকই সেদিনের রক্তের জন্য হাহাকারটি রয়ে যায়। এ নিয়ে ভাবনার মধ্যেই ২০১১ সালে রাঙামাটি সরকারি কলেজ ও রাঙামাটি মহিলা কলেজে অধ্যয়নরত আট শিক্ষার্থী সাজিদ বিন জাহিদ মিকি, প্রত্যুষ দেব উৎস, আবু সুফিয়ান রাফসান, গায়িত্রী চক্রবর্তী, মেহের নিগার চৌধুরী, মো. আশফাক হোসেন, তাসলিমা হক জেরিন ও ইয়াকিম পিয়াসকে নিয়ে গঠিত হয় ‘জীবন’। বর্তমানে জীবনের নির্বাহী কমিটি ২৩ সদস্য বিশিষ্ট।

রাঙামাটিতে ৭ ইউনিট কমিটি আছে। অনলাইনে প্রায় সাড়ে সাত হাজার ডোনার তৈরি যেকোনো সময় রক্ত দিতে।

হাঁটি হাঁটি পা পা করে ছয় পেরিয়ে ১১ নভেম্বর সাত বছরে পদার্পণ করেছে জীবন। দিনটি উপলক্ষে রাঙামাটি শহরে সকালে বর্ণাঢ্য সমবেত র‌্যালি, শিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সংগঠনটি। প্রতিটি আয়োজনে ছিল রাঙামাটির বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সক্রিয় ও আন্তরিক উপস্থিতি।

গত ছয় বছর ধরে রাঙামাটিবাসীর প্রয়োজন আর ভালোবাসার অন্য নাম হয়ে ওঠা ‘জীবন’ এখন ‘আইকন অব দ্য সিটি’। বিগত পাহাড়ধসের ভয়াবহ ক্রান্তিকালে ‘জীবন’ কর্মীরা যেভাবে দিনরাত পরিশ্রম করেছে তাকে ‘বিরল’ বললেও অত্যুক্তি হবে।

‘জীবন’ এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সাজিদ বিন জাহিদ মিকি বলেন, ‘‘অনেক স্বপ্ন নিয়ে একদিন আমরা কজন মিলে ‘জীবন’  শুরু করেছিলাম। আজ সেটাই ধীরে ধীরে রাঙামাটিবাসীর ভালোবাসার ‘জীবন’ এ পরিণত হয়েছে। এটাই বিগত ছয় বছরের অর্জন। মানুষের পাশে থাকার প্রত্যয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিলো, মানুষের পাশেই থাকতে চাই আমৃত্যু। ’’

‘কী পেলাম কিংবা কী হারালাম সেটা জরুরি নয়, রক্ত দেয়ার পর রক্তগ্রহীতার ও তাঁর স্বজনদের মুখের হাসি আর রক্তদাতার মুখের পরিতৃপ্তিটাই আমাদের অর্জন। ’-যোগ করেন জাহিদ মিকি।


মন্তব্য