kalerkantho


রুমার অগ্রবংশ অনাথালয়

দুর্গম পাহাড়ে আশার আলো

মনু ইসলাম, বান্দরবান   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দুর্গম পাহাড়ে আশার আলো

হাজারখানেক খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতেই শোনা গেল ঢং ঢং ঘন্টা ধ্বনি। সিঁড়ির শেষ ধাপ পেরিয়ে একটি টিনশেড ঘর।

কক্ষের ভেতর লাইন করে সাজানো বেশ কয়েকটি হাইবেঞ্চ, লোবেঞ্চ। ওখানে বসে নিমগ্ন তিনজন শ্রমণ (বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী প্রত্যেককেই জীবনে একবার শ্রমণব্রত পালন করতে হয়) জোরে জোরে পড়ছে, ‘মানব জীবন কর্মমুখর। কাজের মাধ্যমেই মানব জীবনের সফলতা। কাজ করতে গেলে ভুল হয় এবং এই ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে মানুষ তার জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এ পৃথিবীতে সবাই কর্মী নয়। কিছু অলস অকর্মণ্য মানুষ আছে, যারা সবসময় অন্যের পিছে লেগে থাকে। অন্যের কাজের খুঁত ধরে। সমালোচনা করে। ফলে কোনো কোনো কাজ করতে গেলে কেউ কেউ দ্বিধাগ্রস্ত হয়...।

জীবন দর্শনের এমন পাঠে মনটা ভরে যায়। এ সময় দেখা গেল সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে আরো কয়েকজন শিশু। কয়েক ধরনের ইউনিফর্ম পরে পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে সমান দূরত্ব রেখে তালে তালে নেমে যাচ্ছে। গন্তব্য যার যার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

এভাবেই অগ্রবংশ অনাথালয়ে প্রতিটি দিন শুরু হয়।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে রুমা উপজেলা সদরের বাজার সংলগ্ন পাহাড় চূড়ায় গড়ে ওঠা আশ্রমে প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি দেওয়া হচ্ছে মানবিক শিক্ষাও। ১৯৯৫ সালে এই আশ্রমটি গড়ে তোলেন বৌদ্ধভিক্ষু ইন্দাগা ভান্তে। এখন তিনি প্রয়াত। কিন্তু দিনে দিনে বেড়েছে এর ব্যাপ্তি। ছেলেশিশু এবং কন্যাশিশু মিলিয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২০।

ইন্দাগা ভান্তের শিষ্য ভিক্ষু উ নাইন্দিয়া ভান্তের ওপর এখন এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব বর্তেছে। তাঁরই প্রচেষ্টায় নামমাত্র ফি দিয়ে থাকা, খাওয়া, টিউশন, খাতা-কলম এবং চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছে প্রান্তিক অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা। সহায়-সম্বলহীন ও এতিম-অনাথ শিশুরা এসব সুযোগ পাচ্ছে নিখরচায়। ফলে এই আশ্রমকে কেন্দ্র করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা বিস্তারের এক নতুন সম্ভাবনা সূচিত হয়েছে।

সম্প্রতি এই আশ্রম পরিদর্শনে গিয়ে জানা গেল এসব অজানা কথা। ভিক্ষু উ নাইন্দিয়া ভান্তে জানান, প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠে প্রয়োজনীয় কাজ, স্কুলের পাঠ প্রস্তুতি শেষে শিক্ষালয়ে যাওয়া এবং সেখান থেকে ফিরে খাওয়া ও বিশ্রাম শেষে বিকেলে খেলাধুলা শেষে আবার পাঠে মনোযোগ-এভাবেই গড়ে তোলা হচ্ছে আশ্রমের শিশুদের।

তিনি জানান, শিক্ষার্থীপিছু বার্ষিক সাকুল্য ব্যয় হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা করে নেয়া হচ্ছে। এর বাইরে এতিম এবং অনাথদের এই আশ্রমে রাখা হয় সম্পূর্ণ নিখরচায়। উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী করে তোলার জন্যে সামর্থ্যবান পরিবারের হলেও কলেজ পড়ুয়াদের কাছ থেকে কোনো খরচ নেওয়া হয় না। এর বিনিময়ে তারা মাঝে মাঝে জুনিয়রদের টিউশন দেয়। পরিচর্যা করে।

হ্লা থুই চিং মারমা বর্তমানে রুমা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। কয়েক বছর আগে সে এই আশ্রমের বাসিন্দা হয়। সামর্থ্যবান হওয়ার কারণে এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত তাকে বার্ষিক ৭ হাজার টাকা করে ফি দিতে হয়েছিল। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হবার পর থেকে আর কোনো ফি দিতে হচ্ছে না।

হ্লা থুই চিং মারমা জানায়, ফ্রি পাওয়ার জন্যেই নয়, একটি নিরাপদ ও পারিবারিক পরিবেশে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়ে সবচেয়ে বেশি সন্তুষ্ট সে।

হ্লা থুই বলে, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে আমিও এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে পিছিয়ে পড়া মানুষদের পাশে দাঁড়াবো।

ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেল-এই অনাথ আশ্রমে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যে আছে পৃথক থাকার ঘর। আছে স্টাডি রুম ও কোচিং সেন্টার। স্যানিটারি ল্যাট্রিন ও নিরাপদ পানির চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে এখানে।

জানা গেল, সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে রেজিস্টার্ড অনাথালয় হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানের ৩১ জন এতিমের জন্যে মাসিক গ্রান্ট দেওয়া হয়। এর বাইরে শিক্ষার্থীদের ফি এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া সামান্য কিছু দান দিয়েই পুরো ব্যবস্থাপনা চালাতে হচ্ছে। আরো বেশি সহযোগিতা পেলে প্রতিষ্ঠানের কর্ম পরিধি বাড়ানো সম্ভব হবে।

তিনি জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর উদ্যোগে একটি পাকা ছাত্রীনিবাস, মন্দির ঘরসহ নানা সুবিধা পাওয়া গেছে। পাকা ভবন নির্মাণের সামর্থ্য না থাকায় ছাত্রদের রাখা হচ্ছে একটি টিনশেড মাচাং ঘরে।

এ সমস্যা সমাধানে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুরের সহযোগিতা কামনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে ছাত্রাবাসের পাশে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এরপরও ঝুঁকি নিয়ে ছাত্রাবাস চালানো ছাড়া আর কোনো গতি নেই। এ অবস্থায় আরো একটি পাকা ছাত্রাবাস খুবই প্রয়োজন। ’

জানা গেল, প্রান্তিক ও দুর্গম এলাকার শিশু পড়ুয়াদেরই এই আশ্রমে রাখা হয়। ফলে তারাও পাঠে বেশ মনোযোগী থাকেন। উ নাইন্দিয়া ভান্তে জানান, এই অনাথালয় থেকে একজন শিক্ষার্থী বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পড়ছে। আরো একজন পড়ছে অনার্স। কর্মসংস্থানও হয়েছে কারো কারো।

উ নাইন্দিয়া ভান্তের প্রত্যাশা আরো কিছুটা সুবিধা এবং বিত্তবান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি  এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সহযোগিতা পেলে অগ্রবংশ অনাথালয়কে তিনি এই অঞ্চলের কুয়াশায় ঢাকা সমাজ জীবনে আলোকবর্তিকা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারবেন।


মন্তব্য