kalerkantho


ছাগলপালন করে সচ্ছল ৮০০ নারী

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ছাগলপালন করে সচ্ছল ৮০০ নারী

.... সীতাকুণ্ডের সৈয়দপুরে নারীদের মাঝে ছাগলপালন বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। এখানকার বেশির ভাগ ঘরে কমবেশি ছাগল রয়েছে।

গৃহবধূ থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়ারাও সংসারে সচ্ছলতা আনতে ছাগল-হাঁস-মুরগি পালন করে। এতে সংসারে আসছে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ...

 

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুরে প্রায় প্রতিটি সংসারে সচ্ছলতা আনতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও ব্যাপক অবদান রাখছে। তাঁরা যুগ যুগ ধরে পশুপালন, গৃহস্থালি ও হাতের কাজ করে সংসার এগিয়ে নিয়ে চলছেন। তবে অনেকভাবে আয় উপার্জন করলেও এখানে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছাগলপালন। প্রায় প্রতিটি ঘরে কমবেশি ছাগলপালন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এ ইউনিয়নে আট শতাধিক নারী ছাগলপালনে সচ্ছল হয়েছে। যা অন্য এলাকার জন্য উদাহরণে পরিণত হতে পারে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সীতাকুণ্ডের সৈয়দপুর ইউনিয়নের নারীদের মধ্যে ছাগল পালন বেশ জনপ্রিয়। এ এলাকার বেশির ভাগ ঘরেই কমবেশি ছাগল রয়েছে।

গ্রামের গৃহবধূ থেকে শুরু করে স্কুল পড়ুয়া কিশোরীরাও সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ছাগল-হাঁস-মুরগি প্রভৃতি পালন করেন। এতে প্রতিটি সংসারে পুরুষের উপার্জনের সাথে নারীদের এ আয় যুক্ত হয়ে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে আসছে।

সরেজমিনে সৈয়দপুর ইউনিয়নের মধ্যেরধারী, ব্রিকফিল্ড, বাঁকখালী, হাঁচুপাড়া, পশ্চিম সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, গ্রামের ঘরে ঘরে গৃহপালিত পশুপালন করে ব্যস্ত সময় পার করছে অসংখ্য নারী। পরিদর্শনকালে মধ্যেরধারী গ্রামে কথা হয় গৃহবধূ শাহানাজ বেগমের সঙ্গে। তিনি ওই এলাকার রকিয়ত উল্লার স্ত্রী।

শাহানাজ (৫২) জানান, তাঁর সংসারটি অনেক বড়। ৯ মেয়ে ও এক ছেলে আছে। স্বামী কৃষিকাজ করতেন। এখন বয়সের ভারে তেমন একটা কাজ কর্ম করতে পারেন না। তাই সংসারের হাল ধরেছেন তিনি। স্বামীর পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সম্পদ থেকে যায় আয় হত তা দিয়ে কোনরকম দিন চলত। মেয়েদের বিয়ে দিতে গিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়। এ অবস্থায় সংসারে আর্থিক সংকট সৃষ্টি হলে বছর কয়েক আগে ছাগলপালন শুরু করেন তিনি। প্রথমে তিনটি ছাগল কেনেন। নিয়ম মেনে সেগুলো পালন করায় ছাগলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। অল্প সময়ে তাঁর ছাগল বেড়ে যায় অনেক। কিছুদিন পর পর এক দুটি করে ছাগল বিক্রি করতে থাকেন তিনি। একটি ছাগল ২ থেকে ৩-৪ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ টাকায় সংসার খরচ, মেয়ের বিয়ের খরচসহ অনেক কাজ করেছেন তিনি। এখনো ২২টি ছাগল আছে তাঁর।

শাহানাজ বলেন, ‘এখন আমি ছাগল পালনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এ থেকে যা আয় হয় তাতেই দিন চলে। স্বামী রকিয়ত তেমন একটা কাজকর্ম করতে পারেন না। তবে ছাগলপালনে সহযোগিতা করেন। সকালে উঠে ছাগলগুলোকে নিয়ে যান সাগরপাড়ের বনে। তারপর ঘাস কাটেন। আবার বেলা শেষে ছাগলগুলো নিয়ে আসেন ঘরে। ’

শাহানাজ ছাগলপালন শুরু করলেও এখন স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলেই কাজটি করে সংসার চালাচ্ছেন। শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট কত টাকার ছাগল বিক্রি করেছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই তাঁর কাছে। তবে শুধু এটুকু বলতে পারেন, ছাগলপালন শুরুর পর তাঁর দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তাদের বিয়েতে ছাগল বিক্রি থেকে পাওয়া বেশ কিছু টাকা খরচ করেছেন তিনি। আত্মীয়স্বজন আসেন বেড়াতে। নিজের খরচ আছে, সবই করেন এ টাকায়। পুকুর পাড়ে ঘেরা দেওয়া একটি জায়গায় তাঁর প্রিয় ছাগলগুলো থাকে। সেখানে ছাগলগুলো দেখাতে দেখাতে তিনি বলেন, ‘আরো আগে থেকে যদি ছাগলপালন করতাম ভালো হত। সংসারটা আরো ভালো চলত। ’ এখনো যা চলছে তাতে খুশি তিনি। ছাগল থেকে দুধ ও মাংস পাচ্ছেন নিয়মিত। ঘরোয়া অনুষ্ঠানে ছাগলের মাংস, নিয়মিত নাতি-নাতনিদের দুধ খাওয়ানো তো আছে। সব মিলিয়ে শুধু নগদ টাকা ছাড়াও অনেকভাবে কাজে আসে এই প্রাণীগুলো। তাই আগামী দিনে আরো বড় করে খামার গড়ার আশা রাখেন তিনি। আত্মপ্রত্যয়ী এ নারী বলেন, ‘ঘরে আমার গরু, হাঁসও আছে। হাঁস থেকে নিয়মিত ডিম পাই। আর গরু মোটাতাজা করে কোরবানে বিক্রি করি। ’

তবে ছাগলপালন বিষয়ে তিনি স্থানীয় এনজিও সংস্থা ইপসার সার্বিক সহযোগিতা পেয়েছেন। ইপসা তাঁকে ‘আধুনিক পদ্ধতিতে ছাগলপালন’ বিষয়ে প্রশিক্ষণও দিয়েছে। সেই প্রশিক্ষণ তাঁর ছাগলপালনে দারুণ কাজে আসছে। এরপরও যদি কোনো রোগ বা সমস্যা দেখা দেয় তাহলে ইপসার প্রকল্পের সহকারী ভেলুচেইন ফেসিলেটর মো. ওসমান গণির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি ভেটেরিনারি সার্জনকে নিয়ে এসে অথবা তাঁর সাথে কথা বলে ওষুধ বা পথ্য দেন। এতে অনেক উপকৃত হন। ’৭০ এর দশকে মাধ্যমিক পাস করা এই গৃহবধূ শাহানাজ বলেন, ‘কিছুটা পড়াশোনা করায় কাজে লাগছে। স্বাবলম্বী হতে নিজে যেমন পরিশ্রম করি তেমনি এলাকার অন্যদেরও উৎসাহিত করি। ’ তাঁর দেখাদেখি আরো অনেকে ছাগলপালন করছেন ওই গ্রামে। কোনো সমস্যায় পড়লে তাঁরা সবাই তাঁর সাথে যোগাযোগ করেন সমাধানের জন্য। তিনি ইপসার সাথে যোগাযোগ রেখে তাঁদের উপকার করেন।

কথা হয় আরেক গৃহবধূ জামাল উল্লাহর স্ত্রী ফাতেমা বেগমের সাথে। তিনিও সংসারের আয় উপার্জন বৃদ্ধিতে ছাগলপালন করেন। ফাতেমা জানান, ২৭ বছর ধরে ছাগলপালন করছেন তিনি। এ থেকে প্রচুর টাকা আয়ও করেছেন। সংসারে স্বামীর আয়ের সাথে তাঁর আয় যুক্ত হয়ে পরিবারে সচ্ছলতা আসে। তবে তিনি নিজ বুদ্ধিতেই পালন করতেন। বিগত কয়েক বছরে তাঁর ছাগলগুলো হঠাৎ শুকিয়ে যেতে থাকে। অজ্ঞাত এক রোগে একে একে আটটির মতো ছাগল মারা যায়। ভয়ে অনেক ছাগল বিক্রি করে দেন তিনি। কমিয়ে ফেলেন সংখ্যা। এখন তাঁর চারটি ছাগল আছে। ছাগলের রোগ হলে উপজেলায় বা দূরে কোনো ডাক্তার দেখানো তাঁর পক্ষে কষ্টকর হওয়ায় কারো পরামর্শ নিতে পারেননি। ফলে তাঁর অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে।

ফাতেমা জানান, তবে দেরিতে হলেও এখন তিনি ইপসা যে এ বিষয়ে সহযোগিতা করে তা জেনেছেন। তাই ভবিষ্যতে যেকোনো সমস্যায় তাদের সাথে যোগাযোগ করবেন বলে জানান। এ ইউনিয়নের বাঁকখালী গ্রামের গৃহবধূ রাণী বালা জলদাশও ছাগলপালন করেন। একসময় মাত্র ৪টি ছাগল ছিল তাঁর। সেগুলো থেকে বেড়ে গিয়ে ৩০টি ছাগল হয়েছিল তাঁর। জীবিকার প্রয়োজনে প্রায় সবকটি বিক্রি করে দিয়েছেন। তাছাড়া আরো সমস্যার বিষয় হচ্ছে স্বামী মাছ ধরতে চলে যান। তাই ছাগলগুলোকে নিয়ে চরানো, ঘাস কেটে আনা অসুবিধাজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বেশির ভাগ ছাগল বিক্রি করে ফেলেন। তাঁর ৭টি ছাগল আছে।

ওই এলাকার নারীরা জানান, সৈয়দপুর ইউনিয়নের সাগর উপকূলীয় পরিবেশ ও চারণভূমির কারণে এখানে প্রতিটি পরিবারই ছাগল, গরু, ভেড়াসহ বিভিন্ন প্রকার গৃহপালিত পশুপালন করে বাড়তি আয় করেন। শত শত নারী এভাবে সংসার সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, সীতাকুণ্ডের উন্নয়ন সংস্থা ইপসা এখানে ‘আধুনিক পদ্ধতিতে ছাগলপালন’ নামক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। গেল কয়েক বছরে এই প্রকল্পের কারণে তাঁরা ছাগল পালনকারী নারীদের নিয়ে ট্রেনিংসহ বেশ কিছু প্রোগ্রাম করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, ইপসার ‘আধুনিক পদ্ধতিতে ছাগলপালন’ প্রকল্পের সহকারী ভেলুসেইচ ফেসিলেটর মো. ওসমান গণি বলেন, ‘আমি সৈয়দপুরে চাকরিতে এসেছি মাত্র কয়েক মাস। কিন্তু একটি বিষয় লক্ষ করলাম এখানে। প্রায় প্রত্যেক ঘরের নারীরাই কিছু না কিছু করে সংসার বাঁচানোর যুদ্ধে লিপ্ত। বিশেষত প্রচুর মহিলা ছাগলপালন করেন এখানে। ’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে একটা জরিপ করছি। এতে এ ইউনিয়নের ৮০০ নারীকে পেয়েছি যাঁরা ছাগলপালন করে সচ্ছল হচ্ছেন। এদের মধ্যে ২০ থেকে ৪০টির বেশি ছাগলপালন করেন এমন নারীর সংখ্যা ২৫ জনের মতো। এছাড়া ২-৪ থেকে বিভিন্ন সংখ্যায় ছাগলপালন করছেন শত শত নারী। ইতোমধ্যে আমরা ৮০০ জনের তালিকা করেছি। এখনো কাজ শেষ হয়নি। ’ জরিপ সম্পন্ন হলে এই সংখ্যা এক সহস্র ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করছেন তিনি।

সমৃদ্ধি প্রকল্পের সমাজ উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. মাহবুব আলম বলেন, ‘এখানে কাজ করতে গিয়ে এসব নারী উদ্যোক্তাদের সাথে পরিচয়ের পর থেকে তাঁদেরকে সাধ্যমতো উপকার করার চেষ্টা করেছি। ছাগল ও অন্য পশুর রোগব্যাধি হলে ভেটেরিনারি সার্জন ডা. গোলাম মহিউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করে সাথে সাথে ওষুধ দেওয়া হয়েছে। ফলে তাঁরা অনেক জটিল সংকট সহজে উত্তরণ করতে পেরেছেন। ’

এ বিষয়ে ভেটেরিনারি সার্জন ডা. গোলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘এখানে অসংখ্য নারী ছাগলপালন করছেন দেখে ভালো লাগে। কোনো সমস্যায় পড়লে তাঁরা আমাকে জানান। আমিও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অথবা পরামর্শ দিয়ে থাকি। ’

সৈয়দপুর ইউপির চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম নিজামী বলেন, ‘এখানে নারীরা নানান কাজে সম্পৃক্ত হয়ে সংসার সংগ্রাম করছেন। এর মধ্যে গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি পালনও রয়েছে। আমরা নিজেরাও অনেক দরিদ্র নারীকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে গরু-ছাগল দিয়েছি। তাঁদের মধ্যেও অনেকে বেশ লাভবান হয়েছেন বলে শুনেছি। ’

উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসার মো. শাহআলম বলেন, ‘এ ধরনের নারীদের আমরা সবসময় ট্রেনিং দিয়ে থাকি। বিগত দিনেও সৈয়দপুরের অনেক নারীকে আমরা ছাগলপালন বিষয়ে ট্রেনিং দিয়েছিলাম। আমার বিশ্বাস যেসব নারী ট্রেনিং পেয়েছেন তাঁরা উপকৃত হচ্ছেন। নতুন করেও কেউ যদি আমাদের ট্রেনিং পেতে চান সাহায্য করতে প্রস্তুত। আর যাঁরা ট্রেনিং পাবেন তাঁরা সরকারি ঋণ নিতে চাইলে আমি সহযোগিতা করব। ’


মন্তব্য