kalerkantho


অপরাজিতা

বাল্যবিয়ে ঠেকিয়ে মেয়েটি আবার স্কুলে যাচ্ছে

জাহেদুল আলম, রাউজান   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বাল্যবিয়ে ঠেকিয়ে মেয়েটি আবার স্কুলে যাচ্ছে

রাউজান গহিরা দলইনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষে সহপাঠীদের সঙ্গে উম্মে হাবিবা মায়া।

মেয়েটি পড়তে চায়। পড়ালেখা করে হতে চায় বড় ডাক্তার।

চিকিৎসক হয়ে সেবা করতে চায় দেশের মানুষের। তবে তার পড়ালেখায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিবার। জন্মদাতা মা-বাবা। পড়ালেখা বন্ধ করে মা-বাবা মেয়েটির ইচ্ছার বিরুদ্ধে শিশু বয়সেই বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন দ্বিগুণ বয়সী অর্থকড়িশালী প্রবাসী এক যুবকের সঙ্গে। কিন্ত ওই স্কুলছাত্রী বিয়ে নয়, তার পণ পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া। নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া। শেষপর্যন্ত সে তার লক্ষ্যেটিই জিইয়ে রাখলো। নিজের অন্যায্য বিয়ে ঠেকাতে সোজা অভিযোগ নিয়ে চলে গেল উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে। ইউএনওর নির্দেশে বন্ধ হয়ে গেল সেই বাল্যবিয়ে। শ্বশুরবাড়ি নয়, মেয়েটি এখন যাচ্ছে নিয়মিত স্কুলে। আর দশ মেয়ের সঙ্গে সেও স্কুলের টুল-টেবিলে বসে ক্লাস করছে। স্বপ্ন দেখছে বড় ডাক্তার হওয়ার। পরিবার, সমাজ ও পারিপার্শ্বিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে দৃঢ় মনোবল নিয়ে ছুটছে সাহসী এ স্কুলছাত্রী। এ মেয়ের সাহসিকতা দেখে মুগ্ধ স্কুলের শিক্ষক, সহপাঠী, এলাকাবাসী ও জনপ্রতিনিধিরা।

অদম্য এ স্কুলছাত্রীর নাম উম্মে হাবিবা মায়া। বয়স সবেমাত্র ১৬। সে রাউজান উপজেলার গহিরা দলইনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার্থী সে। তার বাড়ি গহিরা দলইনগর গ্রামে। বাবা আবুল বশর বাবুল প্রবাসী। মা রাশেদা আকতার প্রবাসী স্বামীর অনুমতিতে মেয়ের বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিলেন রাউজান পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের মোবারকখীল এলাকার তাজুল ইসলামের দুবাইপ্রবাসী ছেলে মো. ফখরুলের সঙ্গে। বিয়েতে কখনো মত ছিল না মেয়ে মায়ার। তবু মা আর ছেলেপক্ষ নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড়। যেকোনোভাবে এ বিয়ে হবেই। বয়স কম, তাই কাজির কাছে বিষয়টি ধরা পড়বে-এই ভেবে আকদ পড়ানোর সুবিধার্থে দুপক্ষ সুকৌশলে আদালত থেকে এফিডেভিটও সংগ্রহ করে নেয়।

১০ নভেম্বর আকদ হওয়ার দিন ধার্য ছিল। কিন্তু মায়া এই বিয়ে কখনো মেনে নিতে পারছে না। সে ধরেছে পণ। ৯ নভেম্বর মায়া বিয়ে ঠেকাতে সিদ্ধান্ত নেন স্কুলের শিক্ষকদের মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামীম হোসেন রেজার কাছে যাবে। সেদিন দুপুর একটায় দলইনগর স্কুলের প্রধান শিক্ষক পিন্টু নন্দীর কাছে তার বিয়ে ঠিক করার বিষয়টি জানান। এরপর স্কুল কমিটির সদস্য ও ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আবছার বাশি তা জানতে পারেন স্কুলের প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে। চেয়ারম্যান ও স্কুল শিক্ষকদের সহায়তায় ওই দিন দুপুর সাড়ে তিনটায় মায়া অভিযোগ নিয়ে পৌঁছেন ইউএনওর কাছে। তাঁর কাছে লিখিত আবেদন করে মায়া লিখেছে, ‘আমি বাল্য বিবাহের শিকার। তাই আমাকে এই বাল্য বিবাহের হাত থেকে রক্ষা করে পড়ালেখা করার সুযোগ দিলে আমি আপনার নিকট কৃতজ্ঞ থাকিব। আমি পড়ালেখা করে দেশের সেবা করতে চাই। ’

মায়ার এমন আকুতিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার স্কুলছাত্রীর মা রাশেদা আকতারকে তার দপ্তরে ডেকে এনে মুচলেকা নিয়ে ওই বাল্যবিয়ে ঠেকান।

এবার শুরু হয় মায়ার ওপর মানসিক চাপ। বিয়ে করতে না পেরে পাত্রের পরিবার থেকে মায়ার মায়ের কাছে বার বার ফোন করতে থাকে। বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে পাত্রের পরিবার তার মাকে নানারকম কথাবার্তা বলছিল। মায়ের আশ্বাস ছিল, মায়াকে দুবছর পর আবার ওই পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেবেন। এসব কথাবার্তা সহ্য হচ্ছিল না মায়ার। ১২ নভেম্বর স্কুলে আসার সময় পথিমধ্যে নেমে আবারও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে নালিশ দিতে যাচ্ছিল সে। এ খবর পেয়ে মা রাশেদা বেগম দৌঁড়ে আসেন স্কুলে। অনেক আকুতি মিনতিতে মাঝপথ থেকে মায়া ফিরে আসে স্কুলের অফিস কক্ষে। এ সময় মায়া শিক্ষকদের সামনে বলে, ‘পাত্রের পরিবার মাকে নানা অযৌক্তিক কথা বলছে। মাও ওই পাত্রের সাথে দুবছর পর বিয়ে দিতে চায়। এগুলো শুনতে আমার ভালো লাগছে না। আমার বাড়িতে থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে ভালো লাগছে না। ওইদিন (যেদিন বাল্যবিয়ে ঠেকানো হলো) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেছিলেন বাড়িতে পড়ালেখার অসুবিধা হলে তিনি অন্যকোথাও রেখে আমার পড়ালেখা চালিয়ে যেতে সহায়তা করবেন, সেজন্য তার কাছে যাচ্ছিলাম। ’

তার মা, স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও অন্যরা তাকে নিঃসংকোচে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিলে মায়ের আদরে আশ্বাসে আবার ক্লাসে ফিরে যায় মায়া।

১২ নভেম্বর বেলা ১১টার দিকে অন্য সহপাঠীদের সঙ্গে ক্লাস করছিল মায়া। মুখে তার মাস্ক পরা। ক্লাসে বসে কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপ হয় তার। সে বলে, ‘আমি অনেক লেখাপড়া করতে চাই। ডাক্তার হতে চাই। মানুষের সেবা করতে চাই। ’

স্কুলের প্রধান শিক্ষক পিন্টু নন্দী বলেন, ‘মায়ার চারিত্রিক বিষয়, চাল-চলন খুবই ভালো। সে লেখাপড়া করতে চায়। বিয়ের কথা তুলে তার মেধা-মননে আঘাত দেওয়া ঠিক হয়নি। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরো সচেতন হওয়া উচিত। ’

ক্লাসের গণিত বিভাগের শিক্ষক মনিরুল হক বলেন, ‘মেয়ে হিসেবে খুবই ভালো মায়া। ভদ্র, নম্র। পড়ালেখার ইচ্ছা আছে তার। ক্লাসে কারো সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে দেখিনি। ’

ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আবছার বাশি বলেন, ‘বাল্যবিয়ে সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে। স্কুল শিক্ষার্থী মায়া নিজের বাল্যবিয়ে রোধে প্রতিবাদী হয়ে যেভাবে এগিয়ে এসেছে, তাতে সে সকলের কাছ থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছে। ’

মায়ার খালাতো ভাই আবু খোরশেদ চৌধুরী বলেন, ‘খালাতো বোন মায়াকে আমি ডাক্তার হিসেবে দেখতে চাই। সেজন্য সে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়ছে। মায়া ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। একদিন সে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। ’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হোসেন রেজা বলেন, ‘আমি বাল্যবিয়ে বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে দেরি করি না। মায়ার মতো যে কেউ এগিয়ে এলে সমাজ থেকে বাল্যবিয়ে দূর হবে। ’


মন্তব্য