kalerkantho


ডা. খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

তিন প্রজন্মের মিলনমেলা

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



তিন প্রজন্মের মিলনমেলা

১৯০৭ সালে চট্টগ্রামের বর্তমান জামালখান সড়কে ‘অন্নদাচরণ খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ এর যাত্রা শুরু হয়। একই বছর এটি সরকারি বিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়। হাঁটি হাঁটি পা পা করে যুগ যুগ ধরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে নারী শিক্ষার এই প্রাণকেন্দ্র।

সকালের কুয়াশা তখনো কাটেনি। এর মাঝে রিকশার টুংটাং শব্দ নীরবতা ভেঙে দেয় চট্টগ্রাম নগরীর জামালখান মোড়ে শতাধিক নারীর কোলাহল। আনন্দের এ কোলাহল নগরীর খ্যাতনামা স্কুল ডা. খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রীদের।

গত শুক্রবার ‘চলো মাতি এক সাথে’ এই স্লোগানে তিন প্রজন্মের অংশগ্রহণে জমে ওঠে স্কুলটির ১১১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সদ্য মাধ্যমিক পেরোনো ছাত্রী যেমন এসেছে, তেমনি এসেছেন মুক্তিযুদ্ধের আগে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া ছাত্রীও। এসেছেন ৬০ থেকে ৯০ দশকের ছাত্রীরা। দেখা মেলে ১৯৫৬ সালের ছাত্রীরও। স্কুলপ্রাঙ্গণে ঢোকতেই চোখে পড়ে মধ্যবয়সী ও প্রবীণ ছাত্রীদের ব্যাপক উপস্থিতি। একে অপরকে জিজ্ঞেস করে বেড়াচ্ছেন কে কোন ব্যাচের? কত সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন? সবাই খুঁজে ফিরছেন নিজ নিজ ব্যাচের সহপাঠীদের। দেখা হলেই মাতছেন সেলফিতে। জ্যেষ্ঠ ছাত্রীদের দেখা পেলেই অনুজরা জিজ্ঞেস করছিলেন, আপা আপনাদের সময়ে স্কুল কেমন ছিল? হোস্টেলজীবন কেমন কাটিয়েছেন? আর এমন প্রবীণ ছাত্রীদের সাথে দেখা হওয়ার মুহূর্তটি ধরে রাখতে সেলফি তুলে নিতে ভুললেন না কেউ। র‌্যালি, আলোচনা সভা, স্মৃতিচারণ ও ফটোসেশনে সবাই প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার বললেন, ‘স্কুলে এলাম ১১ বছর পর। এসে মনে হচ্ছে, আবার ছোট হয়ে গেছি। ডা. খাস্তগীর স্কুলের প্রাক্তন এই ছাত্রীর কণ্ঠে ফুটে উঠে তাঁর আনন্দ।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের সময় মেয়েরা পড়াশোনা করার কথা ভাবাই যেত না। সেখানে এই খাস্তগীর স্কুল তৎকালীন সময়ে আমাদের পথ দেখিয়েছে। অনেক সাহায্য করেছে। তাঁর সময়ে ঘটে যাওয়া অনেক স্মৃতি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে ভাগাভাগি করলেন।’

স্কুলটির ১১১তম এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধান অতিথি ছিলেন দেশবরেণ্য কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।  তিনি বলেন, ‘এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আমি মনে করি পৃথিবীর এমন একটি প্রান্ত যেখানে সবাই আসে তাদের জীবনটাকে মনোরমভাবে সাজাতে। আমি মনে করি এই স্কুলটি সবসময় তার শিক্ষার্থীদের মনোরম জীবন সাজাতে অনুপ্রাণিত করে। এই স্কুলের ছাত্রী ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, যিনি স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি তাঁর নামে একটি বইও লিখেছি।’

এই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী কানিজ ফাতেমা কিশোরগঞ্জ জেলার যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ। তিনি কালের কণ্ঠকে বললেন, ‘১০০ বছর পূর্তিতেও এসেছি। এবারও জ্যামের রাস্তায় ১১ ঘণ্টা পাড়ি দিয়ে অনেক ভালো লাগা থেকে এসেছি। দিন দিন অনেক চিত্র পাল্টে যাচ্ছে। শুধু পাল্টায়নি স্কুলের প্রাঙ্গণে এসে নিজেকে স্কুলে ছাত্রী ভাবার কথা! এখানে এসে অনেকের দেখা যেমন পেয়েছি। আবার অনেককে মিস করেছি। তবু অনেক ভালো লাগছে যা আসলে বলে শেষ করার মতো না।’

২০০২ ব্যাচের ডা. জয়িতা, আতিকা ও সিমকী বললেন, আমাদের আনন্দের কোনো ভাষা নেই, নেই কোনো ব্যাখ্যা। একান্ত অনুভবে। রাঙিয়ে দেয় মনুপ্রাণ। যেখানে থাকে না নবীনু প্রবীণের ভেদাভেদ। সকলে মেতে উঠে একই সুরে একই ছন্দে।

কালের সাক্ষী হয়ে থাকতে তিন প্রজন্ম একসঙ্গে! বয়সের ব্যবধান ভিন্ন। প্রৌঢ়, মাঝবয়স, তারুণ্য। একই পরিবারের এই সদস্যদের আরো একটি পরিচয় তাঁরা একই স্কুলের শিক্ষার্থী। এমন তিন প্রজন্মের দেখা পাওয়া গেল খাস্তগীর স্কুলের পুনর্মিলনীতে। নাতি ও পাঁচ মেয়ের হাত ধরেই স্মৃতিময় স্কুল প্রাঙ্গণে পা রাখলেন পঁচাত্তর পেরোনো রোকেয়া খানম।

স্কুল প্রাঙ্গণে ৫৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রোকেয়া খানম জানালেন, তাঁর পাঁচ মেয়ে নাহিদ খানম ৭৯, নাজমা বেগম ৮৩, জাকেরা বেগম ৮৪, সাঈদা খানম ৮৯, জাহেদা বেগম ৯০। সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে ২০১২ তে স্কুলপর্ব শেষ করে সেজ মেয়ের সন্তান সামিহা নাওয়ার। প্রিয় স্কুলে দাঁড়িয়ে ৬২ বছর আগেই যেন ফিরে গেলেন রোকেয়া খানম। মানসপটে আঁকছেন হয়তো বদলে যাওয়ার পরিচিত অনেক দৃশ্যের প্রতিচ্ছবি।

১১১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজক কমিটির সভাপতি

ডা. শাহানারা চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘খাস্তগীর স্কুল যুগ যুগ ধরে নারী শিক্ষা বিস্তারের একটি প্রাণকেন্দ্র হিসেবে এগিয়ে চলেছে। প্রতিবছর জাঁকজমকভাবে এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে এর আলোকবর্তিকাকে আরও উঁচুতে তুলে ধরা এবং সবার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন রচনা করা।’

এই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নাম ও কর্ম কালজয়ী ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়েছে। ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী নেত্রী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার,

কল্পনা দত্ত, কল্যাণী দাস, বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ও কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের জননী মৈত্রেয়ী দেবী, অধ্যাপিকা শিপ্রা দত্ত ও ভারতীয় বিজ্ঞানী শোভনা ধর ডা. খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

দ্বিতীয় দিনে চিটাগাং টিউনার মিউজিয়াম টিমের সহযোগিতায় প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় ছন্দে ছন্দে মাতিয়ে তুলে পুরো ক্যাম্পাস। কতকাল পর তারা আবার স্কুলজীবনটা ফিরে পেয়েছিল। এজন্য তাঁদের মনে-প্রাণে আনন্দের কমতি ছিল না।

কিন্তু সেদিনের পর সবাই আবার যার যার জায়গায় ফিরে গেছে। যান্ত্রিক ব্যস্তময় জীবনে প্রাণের সখিদের সঙ্গে আবার কখন দেখা হবে বা ভবিষ্যতে আর কোনোদিন দেখা হবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।

এই ভেবে প্রিয় স্মৃতির জায়গা ছেড়েছেন আবেগের টানে ছুটে আসা প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।


মন্তব্য