kalerkantho


খাগড়াছড়ির তিন ফুটবল কন্যা

আবু দাউদ, খাগড়াছড়ি   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



খাগড়াছড়ির তিন ফুটবল কন্যা

ফুটবলে ছেলেরা যখন একের পর এক দুঃসংবাদ দিচ্ছে। দ্রুত পিছিয়ে পড়ছে আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে। ঠিক সেই সময়ে চমকের পর চমক দেখাচ্ছেন মেয়ে ফুটবলাররা। নারী ফুটবলের সাফল্য গোটা উপমহাদেশ ছাড়িয়ে বিস্তৃতি ঘটেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। সর্বশেষ অনূর্ধ্ব ১৫ ফুটবলে পরাশক্তি ভারতকে হারিয়ে নতুন শক্তি রূপে আবির্ভূত হয়েছেন নারী ফুটবলাররা। আর এ সাফল্যের পেছনে নান্দনিক ফুটবল খেলে অবদান রাখেন পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়ির দুই বোন অনুচিং মগিনি ও আনাই মগিনি এবং মনিকা চাকমা। তাঁরা এখন খাগড়াছড়ির গর্বই নন; সারাদেশের মানুষের নয়নমনি। ভারতের সাথে ফাইনাল খেলায় খাগড়াছড়ির মেয়ে আনুচিং ফরোয়ার্ড, আনাই রাইট ডিফেন্ডার ও মনিকা চাকমা সেন্টার মিডফিল্ডে খেলে বাংলাদেশ দলকে এনে দিয়েছিলেন মর্যাদাপূর্ণ শিরোপা।

আনাই, অনুচিং ও মনিকাদের খেলাধুলা দেখে অনুপ্রেরিত অন্য মেয়েরাও। খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে নিয়মিত অনুশীলন করছেন। তবে তাঁদের জন্য পৃথক খেলার সুবিধা না থাকায় সমস্যা হচ্ছে। অবশ্য খেলার আয়োজন করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানালেন ক্রীড়া সংস্থার সংশ্লিষ্টরা।

জেলা ক্রীড়া সংস্থার সেক্রেটারি জুয়েল চাকমা জানালেন, বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ফুটবলই হল নারী ফুটবল জাগরণের আসল রহস্য। সেখান থেকে ট্যালেন্ট খুঁজে জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচিত হতে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। নারী ফুটবল দলের কোচ ক্যহ্লাচাই চৌধুরীর আন্তরিক কোচিং এ অনেক নারী ফুটবলার বেরিয়ে এসেছে জাতীয় পর্যায়ে। এছাড়া নারী ফুটবলে ভালো করার কারণেই খাগড়াছড়িতে ভেন্যুতে আঞ্চলিক নারী ফুটবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সেক্রেটারি জুয়েল চাকমা জানান, খুব সহসাই নারী ফুটবলের আরেকটি প্রতিযোগিতা আয়োজনের চেষ্টা চলছে।

জানা যায়, বঙ্গমাতা ফুটবলের বিভাগীয় পর্যায়ের খেলায় এই তিনজনের খেলার কৌশল নজরে আসে ফুটবল সংশ্লিষ্টদের। মূলতঃ রাঙামাটির ক্রীড়া সংগঠক বীর সেন চাকমা তাদেরকে নিজের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করেন।

জেলা সদরের দুর্গম সাতভাইয়া পাড়ায় অত্যন্ত ভাঙাচোরা বাড়িতে বাস করেন বাংলাদেশের নারী ফুটবলের উদীয়মান দুই বোন অনুচি মগিনী ও আনাই মগিনী। তাঁদের গ্রামে যেতে যোগাযোগ ব্যবস্থাও তেমন ভালো নেই। আনুচিং মগিনী, আনাই মগিনীদের পরিবারে তিন ভাই ও চার বোন। তাঁরা দুবোন ছাড়া সবাই জুমচাষি। ফুটবল পাগল আনুচিং মগিনী ও আনাই মগিনী প্রাথমিকে পড়াশোনার সময় নানা বস্তু গোল করে ফুটবল খেলত গ্রামের আনাচে কানাচে। ২০১১ সালে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে সবার নজর কাড়ে। এর পরের গল্প জানা দেশবাসীর। ফুটবলের মাধ্যমে দুই বোন বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চান বহুদূর। বাংলাদেশ নারী ফুটবলের জাতীয় দলের আরেক অহংকার মনিকা চাকমার বাড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার দুর্গম বর্মাছড়িতে। উপজেলা সদর প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে পায়ে হাঁটাপথ। যেসব গ্রামে খেলাধুলা দূরে থাক, মৌলিক অধিকারের অনেক সুবিধাই নেই। কিন্তু বঙ্গমাতা ফুটবলই তাঁদের স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে। নিজেদের প্রবল ইচ্ছে শক্তি আর ক্রীড়া নিপুণতা দুর্গম গ্রাম থেকে তুলে এনেছে তাঁকে।

নারী ফুটবল দলের অন্যতম খেলোয়াড় মনিকা চাকমা বললেন, ‘আমরা ভালো করব আশাবাদী ছিলাম। সেভাবেই জিতেছি। আগামীতেও ফুটবলকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

একই অনুভূতি জানাল আনুচিং ও আনাই। তাঁদের এত সুনামের পেছনে বঙ্গমাতা ফুটবলই বেশি অবদান রেখেছে বলে মন্তব্য তাঁদের।

ফুটবলে এখন অনেক উজ্জ্বল এসব খুদে খেলোয়াড়দের পরিবারের অবস্থা তেমন ভালো নয়। তাঁদের পরিবারের কষ্ট লাঘব ও নিজেদের পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে অবশেষে এগিয়ে এসেছেন পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী।

জেলা ক্রীড়া সংস্থাও খুদে খেলোয়াড়দের উন্নয়নে সচেতন।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় নারী ফুটবল দলের তিন কন্যাকে পুনর্বাসনের যাবতীয় উদ্যোগ নিয়েছেন। দাঁড়িয়েছেন তাদের ও পরিবারের পাশে। চলতি অর্থবছরের মধ্যেই আনাই-আনুচিং ও মনিকা চাকমার ঘর পুনঃনির্মাণ করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জানান, তিন ফুটবল কন্যার জন্য ৫০ হাজার টাকা করে এফডিআর, শিক্ষাবৃত্তিসহ তাঁদের জন্য করণীয় সব দায়িত্ব পালন করবে জেলা পরিষদ।

খবর পেয়ে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান তাঁদের পরিবারের খোঁজ-খবর নেওয়ায় খুশি সবাই। আনুচিং ও আনাই এর বাবা রিপ্রুচাই মগ আনন্দে উচ্ছ্বসিত। সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরীর প্রতিও ধন্যবাদ জানান তিনি।


মন্তব্য