kalerkantho


মুক্তিযুদ্ধের গল্প

শুয়ে আছেন কাপ্তাই হ্রদের বুকে ছোট্ট টিলায়

বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



শুয়ে আছেন কাপ্তাই হ্রদের বুকে ছোট্ট টিলায়

তখন সকাল গড়িয়ে নেমেছিল দুপুর। রাঙামাটির পাহাড় ঘেরা অপরূপ কাপ্তাই হ্রদের শান্ত নীল জলরাশি ঝিক ঝিক করছিল। ঠিক তখনই হঠাৎ শত্রুপক্ষ হানাদার বাহিনীর কামান ও মর্টার শেল গর্জে উঠল। শান্ত পাহাড়ি জনপদ গোলাগুলির শব্দে আকাশ-বাতাস ফেটে যাচ্ছে যেন। হ্রদের পানিতে সৃষ্টি হয়েছিল আলোড়ন। হায়েনাদের মূল লক্ষ্য ছিল বুড়িঘাটের চিংড়িখালের বরাবর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ দখল করা। তখন চিংড়িখাল বরাবর উত্তর-দক্ষিণের হ্রদের ছোট এক টুকরো চরের ওপর প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করে শত্রুপক্ষের গতিবিধি লক্ষ্য রাখার জন্য মেশিনগানার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন তত্কালীন অষ্টম ইস্টবেঙ্গল ও ইপিআরের (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) সদস্য শহীদ ল্যান্সনায়ক মুন্সী আব্দুর রউফ।

১৯৭১ সাল ২০ এপ্রিল। সবার আগে তীব্রগতিতে এগিয়ে আসছিল হানাদার বাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের এক কোম্পানির অধিক সৈনিক। ৬টি তিন ইঞ্চি মর্টার ও অন্যান্য ভারী অস্ত্র নিয়ে তিনটি লঞ্চ ও দুটি স্পিড বোট নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের এলাকায় ঢুকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানকে চতুর্দিকে ঘিরে ফেলে ওরা। মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের উপর মর্টারশেল ও অন্যান্য ভারী অস্ত্র দিয়ে গোলাবর্ষণের ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। কিন্তু প্রতিরক্ষা ব্যুহতে দায়িত্বরত ল্যান্সনায়ক মুন্সী আব্দুর রউফ শত্রুপক্ষের প্রবল গোলাবর্ষণের মুখেও মেশিনগান নিয়ে নিজস্ব অবস্থানে স্থির ছিলেন। মুন্সী আব্দুর রউফ নিজস্ব অবস্থান থেকে মেশিনগান দিয়ে শত্রুর ওপর গোলাবর্ষণ অব্যাহত রেখে সহ-যোদ্ধাদের নিরাপদে পশ্চাদপসারণে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তখন মুন্সী আব্দুর রউফ বেরিয়ে এলেন তার পরিখা থেকে। মেশিনগান তুলে ধরে অনবরত গুলি ছুড়তে লাগলেন সরাসরি শত্রুর স্পিড বোটগুলোকে লক্ষ করে। তাঁর অসীম সাহস ও দুর্দান্ত মেশিনগানের গুলির আঘাতে শত্রুপক্ষের দুটি লঞ্চ ও একটি স্পিডবোট পানিতে ডুবে যায় এবং দুই প্লাটুন শত্রু সৈন্যের সলিল সমাধি হয়। বাকি দুটি অক্ষত স্পিডবোট এ অবস্থা দেখে দ্রুত পশ্চাদপসারণ করে মুন্সী আব্দুর রউফের মেশিনগানের রেঞ্জের বাইরে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে সমগ্র প্রতিরক্ষা ব্যুহ এলাকায় গুলিবর্ষণ শুরু করে। কিন্তু হঠাৎ পাকিস্তানি বাহিনীর একটি মর্টারের গোলা তাঁর ওপর আঘাত করে এবং তিনি শাহাদাত বরণ করেন। শহীদ মুন্সী আব্দুর রউফের আসীম সাহস ও বীরত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ফলে শত্রু বাহিনী মহালছড়িতে মুক্তিবাহিনীর মূল অবস্থানের দিকে অগ্রসর হতে পারেনি। তিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করে কর্তব্যপরায়ণতা ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। এজন্য তাঁকে দেওয়া হয় বীরত্ব ও দেশপ্রেমের অমর স্বীকৃতি হিসেবে ‘বীর শ্রেষ্ঠ’ উপাধি।

বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ ১৯৪৩ সালে পহেলা মে ফরিদপুরের বোয়ালমারী থানার আওতাধীন সালামতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মুন্সী মেহেদী হোসেন ও মায়ের নাম মুকিদুন নেছা। তিনি ১৯৬৩ সালের ৮ মে তত্কালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এ সৈনিক পদে যোগদান করেন। যার নম্বর হল ১৩১৮৭।

দেশ স্বাধীন হওয়ার দীর্ঘ ২৫ বছর পর তাঁর কবর শনাক্ত হয়। রাঙামাটি শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার উত্তরে নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের কাপ্তাই হ্রদের চারদিকে ঘেরা চিংড়িখাল এলাকায় অপরূপ সৌন্দর্য ঘেরা একটি ছোট টিলার উপর বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের স্মৃতিসৌধ। ১৯৯৬ সালের দিকে তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রফিকুল ইসলাম (বীর উত্তম) মুন্সী আব্দুর রউফের শাহাদাত বরণের স্থানটি খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন বিডিআরের রাঙামাটির সদর দপ্তরকে। কয়েক মাস অক্লান্ত পরিশ্রমের পর তত্কালীন সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর আব্দুল বারিক সিকদার তার সহযোগীদের নিয়ে স্থানটি খুঁজে বের করেন।

জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল যুদ্ধ শেষে চার দিন পর বুড়িঘাট এলাকার স্থানীয় অধিবাসী দয়াল কৃষ্ণ চাকমা শহীদ মুন্সী আব্দুর রউফের লাশ দেখতে পেরেছিলেন। দয়াল কৃষ্ণ চাকমাই নিজ হাতে বীর শ্রেষ্ঠের মরদেহ এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ওই স্থানে সমাধিস্থ করেন। পরে স্থানটি চিহ্নিত করে বিডিআরের সদর দপ্তরের উদ্যোগে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর মুন্সী আব্দুর রউফের স্মৃতির উদ্দেশ্যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। সে সময় টিলাটি পরিষ্কার করতে গিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধের দেড় ইঞ্চি কয়েকটি গুলিসহ কিছু স্মৃতি চিহ্ন পাওয়া যায়। গুলিগুলোতে লেখা ছিল পিওএফ অর্ডিন্যান্স ৬৩ লট। পরবর্তীতে বাংলাদেশ রাইফেলস সদর দপ্তর ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের আর্থিক সহায়তায় চার লাখ টাকা ব্যয়ে বীর শ্রেষ্ঠের কবরের উপর একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৭ সালের ১ মার্চ এই স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ রাইফেলসের তত্কালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান।

 


মন্তব্য