kalerkantho


দুই জেলার ৮ থানার তদারকি!

তবু নিরাপত্তাহীনতায় নাইক্ষ্যংছড়িবাসী

মনু ইসলাম, বান্দরবান   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



তবু নিরাপত্তাহীনতায় নাইক্ষ্যংছড়িবাসী

... নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের কোনো এলাকায় সন্ত্রাস, ডাকাতি, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মুক্তিপণ আদায়, মাদক পাচার বা খুনের মতো অপরাধ সংঘটিত হলে কোনো থানা দায়িত্ব নিতে রাজি হয় না। এতে গা বাঁচাতে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। এ অবস্থায় বছরের পর বছর ধরে প্রতিকারহীনভাবে সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে অপহরণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতির ঘটনা ঘটছে ...

 

বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার ৮ থানার আওতাধীন হওয়ার পরও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার লাখ খানেক অধিবাসী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গৃহীত না হওয়ায় উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ‘সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্যে’ পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন এ উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের কোনো এলাকায় সন্ত্রাস, ডাকাতি অপহরণ, চাঁদাবাজি, মুক্তিপণ আদায়, মাদক পাচারকারী বা খুনের অপরাধ সংঘটিত হলে কোনো থানা দায়িত্ব নিতে রাজি হয় না। এতে গা বাঁচাতে বাড়তি সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। এ অবস্থায় বছরের পর বছর ধরে প্রতিকারহীনভাবে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে অপহরণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতির ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার অবস্থান বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে। ওপারে মিয়ানমার। এপারে বান্দরবানের লামা ও আলীকদম থানার সীমান্ত, পশ্চিমে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া, রামু ও কক্সবাজার সদর থানা এবং দক্ষিণে উখিয়া ও টেকনাফ থানা। নাইক্ষ্যংছড়ি থানা ছাড়াও বাইশারী ও ঘুমধুম ইউনিয়নে পুলিশের দুটি তদন্ত কেন্দ্র রয়েছে এই উপজেলায়। এর বাইরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির ৩টি ব্যাটালিয়ন, আনসার এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন র‌্যাব সদস্যদের তত্পরতাও রয়েছে নাইক্ষ্যংছড়িতে। কিন্তু কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। নাইক্ষ্যংছড়ি-সোনাইছড়ি সড়কের অবস্থাও প্রায় অনুরূপ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলার ঈদগাঁও পয়েন্ট থেকে বাইশারী ইউনিয়নের ঈদগড় পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার সড়কের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে কক্সবাজারের রামু থানা। অন্যদিকে ঈদগড় থেকে বাইশারী বাজার পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার রাস্তায় দায়িত্ব পালন করে নাইক্ষ্যংছড়ি থানার পুলিশ। অথচ এই সড়কে প্রায়ই রাস্তার ওপর ব্যারিকেড দিয়ে ডাকাতির ঘটনা ঘটছে।

অস্ত্র উঁচিয়ে বাস-টেক্সি-জিপ থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী এবং সচ্ছল ব্যক্তিদের। পাহাড়ের আটকে রেখে মুক্তিপণ হিসেবে মোটা অংকের টাকা আদায় করে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে অপহূতদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সম্প্রতি অপহূত হয়ে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ অভিযানে মুক্ত ব্যবসায়ীর একজন আত্মীয় বলেন, ‘আপনারা লিখে দেন, পুলিশ-বিজিবি অভিযানে টিকতে না পেরে সন্ত্রাসীরা তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।’ রাগান্বিত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘অথচ আমাদেরকে দিতে হয়েছে সোয়া লাখ টাকা।’

এদিকে যুগ যুগ ধরে নিরাপদ থাকলেও বছর তিনেক যাবৎ সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে নাইক্ষ্যংছড়ি-সোনাইছড়ি-ঘুমধুম সড়ক। এখন সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ বার অপহরণ ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে এই সড়কে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে জুমছড়ি এলাকায় সন্ত্রাসীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সোনাইছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাহান মারমা এবং ৯ মার্চ রাতে পাইয়াঝিরি পাড়ায় একই ইউনিয়নের ওয়ার্ড কাউন্সিলর মং হ্লা অং তঞ্চঙ্গ্যা। বাহান মারমা নির্যাতন ঘটনার পর ওই এলাকা থেকে ৫টি চাক পরিবার প্রাণভয়ে বাড়ি-ঘর ছেড়ে উপজেলা সদরে চলে আসেন। জনসাধারণের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড (সিএইচটিডিবি) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নাইক্ষ্যংছড়ি-সোনাইছড়ি-ঘুমধুম সড়ক নির্মাণের পর থেকে যানবাহন ব্যবহার করে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় পার্শ্ববর্তী জেলার সন্ত্রাসীরা অরাজকতা চালিয়ে যাচ্ছে এই সড়কে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান,  বান্দরবান জেলা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ মুছা বাইশারী তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কে ডাকাতি ও ছিনতাই ঘটনা কিছুটা কমে আসে। সার্বক্ষণিক টহল এবং ঘটনার পরপরই অপারেশন চলার কারণে ঘটনা ঘটানোর বিষয়ে সতর্ক হয়েই মাঠে নামতে হচ্ছে সন্ত্রাসীদের। সাব-ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ মুছা স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘পরিস্থিতি এখন পুলিশের নিয়ন্ত্রণে এসে গেছে। সন্ত্রাসীদের দীর্ঘদিনের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দিতে কিছুটা সময় লাগছে।’

এদিকে গত রবিবার অনুষ্ঠিত বান্দরবান জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার জননিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উ শৈ সিং এমপি যেকোনো মূল্যে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সুপার জাকির হোসেন মজুমদারকে নির্দেশ দিয়েছেন। সভায় জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে শিগগিরই একটি বৈঠক ডাকা হবে।’

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার এস এম সারোয়ার কামাল জানান, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির বিস্তারিত বিবরণ জেলা প্রশাসনকে নিয়মিতভাবে অবহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি এটি কি চাঁদাবাজির জন্যে সন্ত্রাস সৃষ্টি, নাকি আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়ে লোকজনকে এলাকা ছাড়ানোর কোনো ষড়যন্ত্র-তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, ৮০’র দশকে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী এলাকায় বাণিজ্যিক রাবারচাষের জন্য সরকার ব্যবসায়ীদের কাছে ২৫ একর বিশিষ্ট শত শত প্লট লিজ দেয়। এর ফলে কয়েকটি বড় বড় গ্রুপ অব কম্পানি এবং ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বাইশারী এলাকায় রাবারবাগান স্থাপন করে। এসব রাবারবাগানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় বহিরাগত শ্রমিকরা নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় ঢুকে পড়ে। বাগানগুলোতে আর্থিক লেন-দেন চলার কারণে এখানে রাবারবাগান কেন্দ্রিক কয়েকটি চাঁদাবাজ চক্র গড়ে ওঠে। অন্যদিকে পাহাড়ের গাছ-বাঁশ এবং পাথর ব্যবসা থেকে চাঁদাবাজির জন্যও আরো কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ তত্পর হয় এসব এলাকায়। রাবারবাগান মালিক এবং কাঠ ও পাথর ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা পেতে দেরি হলেই সন্ত্রাসীরা বাগান ও সাইট থেকে ব্যবসায়ীদের লোকজনকে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে তামাকচাষ ও ইয়াবা ব্যবসাকে কেন্দ্র করেও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। অভিযোগ ওঠেছে, জনগণের যাতায়াতের সুবিধার জন্যে সড়ক বানানো হলেও ইয়াবা ও মাদক পাচারকারীরা নাইক্ষ্যংছড়ি-সোনাইছড়ি-ঘুমধুম সড়ককে চোরাচালানোর নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।

১০ মার্চ রাতে সোনাইছড়ি পুলিশ ক্যাম্পের চেকপোস্টে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ ৫ শতাধিক ইয়াবাসহ ২ ইয়াবা কারবারিকে আটক করায় জনগণের সন্দেহ সত্যে পরিণত হয়েছে।

নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ওসি আলমগীর শেখ জানান, টেকনাফ থেকে সোনাইছড়ি সড়ক ধরে কাউয়ারখোপ এলাকায় ইয়াবা পাচারের একটি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠেছে-এমন গোপন তথ্যের ভিত্তিতে মোস্তাক ও নুরুল হুদাকে চ্যালেঞ্জ করে চেকপোস্টে কর্মরত পুলিশ। এ সময় তাদের দেহ তল্লাশি চালিয়ে পকেটের ভেতর রাখা ৩টি প্যাকেটভর্তি ইয়াবা পাওয়া গেছে।

এদিকে পুলিশ দাবি করেছে, গত ৬ মার্চ ঈদগাঁও এলাকা থেকে ছৈয়দ আলমের অপহরণ ঘটনার সাথে জড়িত ডাকাত সর্দার মোহাম্মদ সেলিমকে গত ৯ মার্চ বাইশারী এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে। ৬ মার্চ ঈদগাঁও পূর্ব গজালিয়া গ্রাম থেকে ৭০ বছরের বৃদ্ধ সৈয়দ আলমকে সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে। অপহরণের সাথে গ্রেপ্তার করা সেলিম সরাসরি জড়িত ছিল। মুক্তিপণ পরিশোধ করার মাধ্যমে অপহরণের ৩ দিন পর সৈয়দ আলম মুক্তি পান।

বাইশারী তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মোহাম্মদ মুছা জানান, ৯ মার্চ বিকেলে মোহাম্মদ সেলিমকে কক্সবাজারের ঈদগাঁও তদন্ত কেন্দ্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ঈদগাঁও পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মিনহাজ মাহমুদ ভূঞা জানান, সৈয়দ আলমকে অপহরণের সাথে গ্রেপ্তারকৃত সেলিমের সরাসরি জড়িত থাকার অনেক তথ্য প্রমাণ তাদের কাছে আছে।

 


মন্তব্য