kalerkantho


মায়ের মতো শিক্ষক হতে চান সুস্মিতা

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মায়ের মতো শিক্ষক হতে চান সুস্মিতা

সুস্মিতা আচার্য। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোকপ্রশাসন বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। দুই পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন তিনি। অনুষদভিত্তিক সর্বোচ্চ ফলাফলের জন্য ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক’ অর্জন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তাঁর হাতে এ পদক তুলে দেন। পড়ালেখার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও রয়েছে তাঁর বিচরণ। লিখেছেন : মোবারক আজাদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলায় সুস্মিতা আচার্যের জন্ম। সেখানেই তাঁর বেড়ে উঠা। বাবা মিহির লাল আচার্য ছিলেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। বর্তমানে অবসরে আছেন। মা শিলা আচার্য প্রাথমিক স্কুলের সহকারী শিক্ষক। দুই ভাই-বোনের মধ্যে সুস্মিতা ছোট। তাঁর বড় ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ডিপার্টমেন্টে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভিনিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি অধ্যয়নরত।

তাঁর ভাবিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগের প্রভাষক। শিক্ষক পরিবারে জন্ম ও বেড়ে উঠার ফলে এ পেশার প্রতি ঝোঁক বেশি সুস্মিতার।

এসএসসি পাস করেছেন ২০০৮ সালে মুরাদনগর উপজেলায় কোম্পানিগঞ্জ বদিউল আলম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। এইচএসসি পাস করেন ২০১০ সালে ঢাকার হলিক্রস কলেজ থেকে। পড়ালেখার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন এই মেধাবী তরুণী। শৈশবে পরিবার থেকেই গানে হাতেখড়ি সুস্মিতার। বড় ভাই গান করতেন, তাঁরই সংগীত গুরু হরিপদ দেবনাথের কাছে সুস্মিতার হাতেখড়ি, তালিম নেওয়া এবং তখন থেকেই হারমোনিয়ামের সঙ্গে সখ্যতা। পরবর্তীতে ওস্তাদ ফেরদৌস সরকারের কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতসহ অন্যান্য গানের তালিম নেন সুস্মিতা। তবে রবীন্দ্র সংগীতের প্রতি ঝোঁক বেশি তাঁর।

জানালেন, স্কুলে পড়ার সময় বিভিন্ন সময় জাতীয় শিশু শিল্পী প্রতিযোগিতা, জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ, নারী দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে অংশগ্রহণ করে পুরস্কার অর্জন করেছেন সুস্মিতা।

২০০১ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) নিবেদন নামের একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন তিনি। এছাড়া স্কুলে পড়ার সময় অংশ নেন বিতর্ক প্রতিযোগিতায়। যদিও পরবর্তীতে কলেজে ওঠার পর আর নিয়মিত করা হয়নি বিতর্ক।

২০১১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধীনে লোকপ্রশাসন বিভাগে ভর্তি হন সুস্মিতা। প্রীতিলতা হলের আবাসিক ছাত্রী হওয়ায় প্রীতিলতা হল আয়োজিত সকল সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেন তিনি।

সংস্কৃতি ও পড়ালেখায় দুটোতেই সমান বিচরণ ছিল তাঁর। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের অনার্স ও মাস্টার্স দুটোতেই সুস্মিতার প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়াতেই বোঝা যায়।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রবর্তিত ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক ২০১৬’ এর জন্য মনোনীত হন সুস্মিতা। অনুষদ ভিত্তিক সর্বোচ্চ ফলাফলের জন্য এই মনোনয়ন পান তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক ২০১৬’ তাঁর হাতে তুলে দেন।

স্বর্ণপদক প্রাপ্তির অনুভূতি জানতে চাইলে সুস্মিতা বলেন, ‘পুরস্কারপ্রাপ্তির অনূভূতি সবসময় আনন্দের। আর সেটা যদি হয় শিক্ষা সম্পর্কীয় তাহলে তো খুশির কোনো সীমা নেই। জীবনে বিভিন্ন ধরনের পুরস্কার পাওয়ার পরেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বর্ণপদক গ্রহণ করার অনুভূতিটা ভিন্ন।’

‘‘এতদূর এসে মনে হলো গুণীজনের সেই চিরচেনা বাক্য ‘পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না। সত্যি তাই অনুভব করছি। এ পুরস্কার শুধু আমাকে সম্মানিত করেনি আমার পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয়কেও সম্মানিত করেছে। আশা করি ভবিষ্যতেও আমার এই চেষ্টার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।’’-যোগ করেন সুস্মিতা।

তিনি বলেন, ‘আমি এ কৃতিত্বের জন্য আমার বাবা-মা ও বিভাগের শিক্ষকদের কাছে অনেক ঋণী। যাঁদের জ্ঞানগর্ভ শিক্ষাদানের ফলেই আমি এই কৃতিত্ব অর্জন করেছি।’

সুস্মিতা অবসরে রবীন্দ্র ও নজরুল সংগীত শুনে সময় কাটান। তাছাড়া প্রিয় শখ বইপড়া। সমরেশ মজুমদার ও শরৎচন্দ্র তাঁর প্রিয় লেখক।

প্রিয় ব্যক্তিত্ব সুস্মিতার মা ও বাবা। তাঁদের অনুকরণ ও অনুসরণ করেই তাঁর পথচলা। বললেন, ‘বাবা বলতো হোঁচট খেয়ে চলা থামিয়ে দিও না, ধরে নাও এটাই তোমার নতুন কাজের শুরু। মা চাকরিজীবী হলেও মুহূর্তে সব কাজ রেখে আমাদের দিকে নজর রেখেছেন। মা বলতেন, পড়াশোনার পাশাপাশি গান বাজনা সবই জানতে হবে। বাবা-মায়ের এ কথাগুলো সবসময় মেনে চলার চেষ্টা করি।’

সুস্মিতা বর্তমানে কিছু গবেষণার কাজে যুক্ত আছেন। আইএলটিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমফিল করার জন্য অতি সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন।

ভবিষ্যতে কোন পেশায় আসার ইচ্ছা জানতে চাইলে সুস্মিতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। তাই আমি দেশের শীর্ষ পীঠস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চাই। একমাত্র এ পেশা অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আমাদেরকে দূর করতে সহায়তা করে। যেহেতু পরিবারই শিক্ষকতা পরিবার তাই ছোটবেলা থেকেই এ পেশার প্রতি প্রবল ঝোঁক। তবে এটা ছাড়া যদি কোনো পেশায় যাই সবার কাছে দোয়া প্রার্থী আমি যেন মেধা, মনন ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেখানে কাজ করতে পারি। দেশের জন্য কিছু করতে পারি।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ পর্যন্ত আসতে আমার মা বাবাসহ আমার বড় ভাই এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেক দিক নির্দেশনামূলক সহযোগিতা পেয়েছি। যা আমাকে স্বপ্ন দেখতে এবং স্বপ্ন পূরণ করতে প্রতিনিয়ত সহায়তা করেছে। আশা করি আজীবন তাঁদের কাছে এই সহযোগিতা পেয়ে যাব। উচ্চশিক্ষার বিষয়ে অনেক আগ্রহী আমি। সুযোগ পেলে নিজের বিষয়ের ওপর ডিগ্রি নেওয়ার চেষ্টা করব।’


মন্তব্য