kalerkantho


অপরাজিতা
রাউজানের লাকী চৌধুরী

অসহায় নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মনির্ভর করাই তাঁর কাজ

জাহেদুল আলম, রাউজান (চট্টগ্রাম)   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



অসহায় নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মনির্ভর করাই তাঁর কাজ

লাকী আকতার। রাউজান পৌরসভার সাপলঙ্গা এলাকায় তাঁর বাড়ি। পাঁচ বছর আগে স্বামী তালাক দিলে একসন্তান নিয়ে তিনি নিরুপায় হয়ে পড়েন। বাবার বাড়িতে বসে বুকভরা কষ্টে দিনগুলো পার করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না তাঁর। শেষ পর্যন্ত তখন তিনি দারস্থ হন রাউজান লাকী বিউটি পার্লার অ্যান্ড বুটিকসের স্বত্বাধিকারী লাকী চৌধুরীর কাছে। তিনি লাকীকে ভরণপোষণ দিয়ে নিজ বাসায় রেখে রূপচর্চা, সাজসজ্জার প্রশিক্ষণ দেন। তিন বছর প্রশিক্ষণশেষে ওই বিউটি পার্লারেই চাকরির সুযোগ করে দেওয়া হয় তাঁকে। লাকী চৌধুরীর এই আশ্রয়ে লাকী আকতারের ভাগ্য খুলেছে। তাঁর মনে এখন আর কোনো দুঃখ নেই। আর্থিক সমস্যাও কেটে গেছে। এক ছেলে সন্তান নিয়ে লাকী স্বপ্ন দেখছেন নতুন ভবিষ্যতের।

কক্রবাজারের মা-বাবাহীন এতিম নিপা আকতারকেও শিশুকাল থেকে নিজের বাড়িতে রেখে বিউটি পার্লারে কাজ শেখান লাকী চৌধুরী। সেই নিপাকে তিনি নিজ খরচে বিয়েও দেবেন। শুধু লাকী, নিপা নন, প্রায় দেড় শ স্বামী পরিত্যক্ত নারী, গরীব, অসহায়, দুস্থ তরুণীর পাশে দাঁড়িয়েছেন লাকী চৌধুরী। বিউটি পার্লারের রূপচর্চা, সাজসজ্জা, ব্লক, বাটিক, সেলাই,

শো-পিচ তৈরিসহ বিভিন্ন হাতের কাজ প্রশিক্ষণ দিয়ে এ পর্যন্ত দেড়-দুই শ নারীকে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়েছেন লাকী চৌধুরী। তাঁর কাছ থেকে হাতের কাজ শিখে এবং প্রত্যক্ষ সহযোগিতা নিয়ে এক শর বেশি নারী মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে, চট্টগ্রাম, ঢাকা শহর, হাটহাজারীসহ বিভিন্ন এলাকায় দোকান খুলে এবং চাকরি করে আত্মনির্ভর হয়েছেন। লাকী চৌধুরী শুধু একজন বিউটিশিয়ান কিংবা রমণীদের হাতের কাজের প্রশিক্ষকই নন, তিনি ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা মেম্বারও।

২০১৬ সালে উপজেলার ৭ নম্বর রাউজান ইউনিয়নের সংরক্ষিত ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তিনি ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া সামপ্রতিক সময়ে উপজেলা পরিষদের মহিলা সদস্যও নির্বাচিত হন। নারী-পুরুষের সুখে দুঃখে তিনি রাতদিন যান ছুটে। লাকী চৌধুরী  রাউজান ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর এলাকার জালাল আহমদের মেয়ে। তাঁর স্বামীর বাড়িও একই এলাকায়। স্বামীর নাম মো. রুস্তমগীর। সমাজসেবায় স্ত্রীর পাশে থেকে সহযোগিতা ও উদ্বুদ্ধ করেন রুস্তমগীর। তাঁরা এক ছেলে সন্তানের জনক-জননী।

জানা যায়, ২০০৪ সাল থেকে নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলার কাজ শুরু করেন লাকী চৌধুরী। এর আগে তিনি ঢাকা রেনেসাঁ ও চট্টগ্রাম শহরের দিশারী ট্রেনিং সেন্টার থেকে ব্লক, বাটিক, সেলাই, শো-পিচ, পার্লারসহ বিভিন্ন হাতের কাজের প্রশিক্ষণ নেন। সামপ্রতিক সময়ে ভারত থেকে ফেসিয়ালের ওপরও প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন। গড়ে তোলেন কয়েকটি বিউটি পার্লার। তিনি প্রতিবছর তিনজন গরিব অসহায় নারীকে নিজের ঘরে রেখে ভরণপোষণ করে তাঁর রাউজান পৌরসভা সদরের লাকী বিউটি পার্লারে রূপচর্চার কাজ শেখান। পরে তাঁদের প্রত্যককে ৫০ হাজার টাকা করে সম্মানী দেন। এরপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা কেউ বিভিন্ন এলাকায় রূপচর্চার দোকান দেন, কিংবা শহর-বন্দরে চাকরি নেন। ২০০৭ সাল থেকে এরকম প্রশিক্ষণ নিয়ে ৪০ নারী এখন দেশ-বিদেশে রূপ চর্চার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং চাকরি করে আর্থিক সচ্ছলতা এনেছেন। এর মধ্যে রাউজানের গহিরার ইমু, হাটহাজারীর দুই বোন শারমিন, জেসমিন, চাক্তাইয়ের সেলিনা আকতার, কদলপুরের ঝর্ণা, রাঙামাটি জেলার ঘাগড়ার পম্পি নাথ চট্টগ্রাম শহরে কাজ করেন। এছাড়া রাঙ্গুনিয়ার ঠাণ্ডাছড়ির রুমা আকতার সৌদি আরবে, কদলপুরের উর্মি আকতার আবুধাবীতে রূপচর্চার চাকরি নিয়ে গেছেন। পূর্ব রাউজানের কুসুম আকতার হাটহাজারীতে, মোহাম্মদপুরের জেসমিন আকতার মনি, বেরুলিয়ার মানু ঢাকায় ও রাউজানে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। এছাড়া বর্তমানে পাঁচজন অসহায় নারীকে রাউজান লাকী বিউটি পার্লার অ্যান্ড বুটিকসে রেখে রূপচর্চা, সাজসজ্জার কাজ শেখানো হচ্ছে।

এদিকে মোহাম্মদপুর স্কুল, হাজী আবুল খায়েরের বাড়িসহ বিভিন্নস্থানে গ্রুপিং করে শিক্ষার্থী, স্বামী পরিত্যক্তা নারী, অসহায় তরুণী ও আগ্রহী বিভিন্ন বয়সী মহিলাদের ব্লক, বুটিকস, পার্লার, শো-পিচ, সেলাই, ফেসিয়ালসহ বিভিন্ন হাতের কাজের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন ১০০ জনকে। এ প্রশিক্ষণ নিয়ে তাঁরাও বিভিন্ন এলাকায় কর্মজীবন নিয়ে সচ্ছলভাবে জীবনযাপন করছেন। এছাড়া যাঁরা ইতোমধ্যে নানা প্রশিক্ষণ নিয়ে গেছেন, তাঁদের বিয়ে ও আর্থিক সমস্যায় সহযোগিতার হাত বাড়ান লাকী চৌধুরী। নিজের এলাকার গরিব অসহায় মানুষের পাশেও আর্থিক, মানসিক সহযোগিতা করেন তিনি। মাসে দুই-তিনটা গরিবের মেয়ের বিয়েতে কোনো টাকা ছাড়াই তাঁর বিউটি পার্লার থেকে সাজিয়ে দেন। মোহাম্মদপুর স্কুলকে কলেজে রূপান্তরের সময় প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি নিজের তহবিল ছাড়াও বিত্তশালীদের কাছ থেকে আর্থিক অনুদান এনে দেন। লাকী চৌধুরী তাঁর কর্ম ও সামাজিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন লিজেন্ড হারবাল বিউটি প্রোডাক্ট এর পক্ষ থেকে ‘শ্রেষ্ঠ বিউটিশিয়ান’ পুরস্কার।

২০১৪ সালে শেরে বাংলা এ কে এম ফজলুল হক, তারুণ্য সংসদ, স্মার্ট চ্যালেঞ্জার, প্রতিশ্রুতি সংসদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন সম্মাননা। এ বছর নারী দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম শহরের একটি সংগঠনও তাঁকে সম্মাননা দিয়েছে।

গহিরা জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতাল, আলিকো, জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চাকরি করে জীবনের সচ্ছলতা পাননি পটিয়া উপজেলার রতনপুর গ্রামের পম্পি শীল। সর্বশেষ তিন বছর আগে তিনি লাকী বিউটি পার্লার অ্যান্ড বুটিকসে এসে কাজ শিখেন। এখনো আছেন সেখানে। তিনি বলেন, ‘রূপচর্চা, সাজসজ্জার কাজটি শিখতে পেরে তাঁর ভালোই লাগছে। অন্য যেসব পেশা ছেড়ে এসেছি, এর মধ্যে এ পেশায় কাজ করে ভবিষ্যত সুন্দর বলে মনে হচ্ছে।’

আশ্রয় পাওয়া লাকী আকতার বলেন, ‘লাকী চৌধুরীর কাছে এসে প্রশিক্ষণ পেয়ে আমি এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি।’

নারী উন্নয়নে দায়িত্ববোধ ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা বিউটিশিয়ান ও সমাজসেবিকা লাকী চৌধুরী বলেন, ‘গরিব, দুস্থ, অসহায়, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের সচ্ছল ও স্বাবলম্বী করে তোলার উদ্দেশ্যে আমি হাতের কাজের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি সকল বয়সী নারীদের। ভেবেছি সাজসজ্জা ও হাতের কাজের মূল্য এখন খুবই বেশি এবং জনপ্রিয়। তাই মনে করলাম এসব কাজের প্রশিক্ষণ দিলে নারীরা আত্মনির্ভর হবে। কারো মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না। যারা এ পর্যন্ত আমার কাছ থেকে সাজসজ্জা ও অন্যান্য হাতের কাজ শিখেছে, তাদের কেউ ব্যর্থ হয়নি। তারা এখন নিজে কিছু করে সংসার চালাতে পারছে। কর্মজীবন শুরু করেছে। কেউ নিজে প্রতিষ্ঠান করেছে। কেউ বিদেশে গেছে। এটা আমার বড় পাওনা। তবে এমনকাজে আমাকে খুবই সহযোগিতা দিয়ে গেছেন আমার স্বামী রুস্তমগীর। তাঁর প্রতি আমি বিশেষ কৃতজ্ঞ।’


মন্তব্য