kalerkantho

দেশভাগের দায়দায়িত্ব

১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দেশভাগের দায়দায়িত্ব

দেশভাগের প্রস্তাব অনুমোদন করছেন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতারা

পরস্পরের ঘোরতর শত্রু কংগ্রেস ও লীগ শেষ পর্যন্ত ওই একটি ব্যাপারেই দেখা গেল একমত হতে পেরেছে, সেটা হলো দেশভাগ।...দেশভাগ ঘটল জাতীয়তাবাদী হতে গিয়ে ভারতবাসীর সাম্প্রদায়িক হওয়ার কারণে। সাম্প্রদায়িকতা একটি সমাজের ওপরতলার রাজনৈতিক ঘটনা। প্ররোচনাদাতা ছিল ব্রিটিশ শাসকরা, কলকাঠি সতর্কতার সঙ্গে তারাই নাড়ছিল; যদিও সামনাসামনি লড়াইটা বেধে গিয়েছিল হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যেই...

 

►        শ্রেণিবিভাজন শক্ত করার জন্যই ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন উৎসাহিত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মেকওলের পরামর্শ ছিল, এমন একটি শ্রেণি তৈরি করা, যারা দোভাষীর কাজ করবে। শ্রেণিটিকে ভদ্রতা করে ‘দোভাষী’ বলেছেন, আসলে যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো দালাল ও চর

 

►        কংগ্রেসের মধ্য দিয়ে চেষ্টা করা হয়েছিল মধ্যবিত্তকে আড়াআড়িভাবে জনগণ থেকে আলাদা করে ফেলার; বিভাজনের সেই উদ্যোগই আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল মুসলিম লীগ গঠনের ফলে। এবারকার ভাগাভাগিটার চরিত্র দাঁড়াল খাড়াখাড়ি—অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক

 

সাতচল্লিশে তো দেশভাগ হলো, সেই যে অত্যন্ত ক্ষতিকর ও একেবারেই অপ্রত্যাশিত ঘটনা, তার জন্য দায়ী কে? কংগ্রেস বলবে দায়ী হচ্ছে মুসলিম লীগ, মুসলিম লীগ দোষ চাপাবে কংগ্রেসের কাঁধে। পারস্পরিক এই দোষারোপের ভেতর সত্য যে নেই তা অবশ্যই নয়; দায়ী দুই পক্ষই, কম আর বেশি। উভয়েই ছিল অনমনীয়, ফলে ভাগ না হলে গৃহযুদ্ধ বেধে যাবে—এমন আশঙ্কা অমূলক ছিল না। কিন্তু মূল অপরাধ গান্ধী যাকে তৃতীয় পক্ষ বলতেন সেই ব্রিটিশেরই, অন্য কারো নয়। আসল ঘটনাটা তারাই ঘটিয়েছে, ‘জাতীয়তাবাদী’ দুই পক্ষকে এমনভাবে ক্রমাগত উসকানি দিয়েছে যে ওই দুই পক্ষ পরস্পরের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে এবং দেশভাগ অনিবার্য হয়ে পড়েছে।

সাম্রাজ্যবাদের সেই ইতিহাসপ্রসিদ্ধ নীতি, ভাগ করো এবং শাসন করো, সেটা ভারতভাগের ক্ষেত্রে মোটেই অসত্য ছিল না; ছিল পুরোপুরি সত্য। কখনো তারা হিন্দুদের দিকে ঝোঁকার ভঙ্গি করেছে, কখনো মুসলমানদের দিকে; কিন্তু ভেতরে একেবারেই অনড় ছিল নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের অবস্থানে। ভাগ করার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পরিবর্তে ডমিনিয়ন স্ট্যাটাস দিয়ে আপাতত বিদায় নিয়েছে, কিন্তু ক্ষমতা যেটুকু দেওয়ার তা তুলে দিয়ে গেছে দুই দিকের দুই তাঁবেদার শাসকশ্রেণির হাতে। কংগ্রেস পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলা শুরু করেছিল; কিন্তু সেই দাবি ভুলে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইনের সংশোধনের ভিত্তিতেই ‘স্বাধীন’ হতে সম্মত হলো এবং রয়ে গেল ব্রিটিশ কমনওয়েলথের ভেতরই। অন্যদিকে মুসলিম লীগ তো স্বাধীনতা নিয়ে তেমন মাথাই ঘামায়নি, তাদের কথা ছিল যেকোনো ভিত্তিতেই হোক ‘পাকিস্তান’ চাই; যে জন্য ডমিনিয়ন স্ট্যাটাসে তাদের কোনো আপত্তি থাকার কথা ছিল না, আপত্তি থাকেওনি। পরস্পরের ঘোরতর শত্রু কংগ্রেস ও লীগ শেষ পর্যন্ত ওই একটি ব্যাপারেই দেখা গেল একমত হতে পেরেছে, সেটা হলো দেশভাগ, যদিও ‘স্বাধীন’ হওয়ার ঠিক দুই দিন পর র‌্যাডক্লিফের রোয়েদাদ অনুযায়ী দুই রাষ্ট্রের সীমারেখার নির্ধারণ দেখে উভয় পক্ষই যারপরনাই অসন্তুষ্ট হয়েছিল। কিন্তু তত দিনে তো যা হওয়ার হয়ে গেছে এবং হয়ে যাওয়া সেই ঘটনার অভিশাপ থেকে এই উপমহাদেশ এখনো মুক্ত হয়নি।

ব্যক্তিগতভাবে ব্রিটিশদের অনেককেই অবশ্য ভারতবিভক্তির বিপক্ষে অবস্থান নিতে দেখা গেছে; যেমন একেবারে শেষ পর্যায়ে বড়লাট মাউন্টব্যাটেনকে মনে হয়েছে যে তিনি খুবই দুঃখিত ভারতকে এক রাখতে পারলেন না দেখে এবং তাঁর ভাষায় ‘উন্মাদ’ ও ‘নির্বোধ’ পাকিস্তানের দাবি মেনে নিতে হলো বলে; কিন্তু ঘটনা কারো ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল ছিল না। মাউন্টব্যাটেন হয়তো ভেবেছিলেন যে ভারতকে অক্ষত এবং ব্রিটিশ কমনওয়েলথের ভেতরে রেখে দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে ‘বীরত্ব’ তিনি অর্জন করেছিলেন তাকে আরো প্রসারিত করবেন; তদুপরি ভাগ না হয়ে এক থাকলেই ব্রিটিশের পক্ষে যে প্রভাব বজায় রাখা সহজ হতো—এটাও সত্য। দেশভাগের ব্যাপারটা ছিল সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের দরুনই সেটা ঘটেছে; লীগ ও কংগ্রেস উভয়েই ছিল অসহায় ক্রীড়নক, যদিও তারা সেটা জানত না। অবশ্য তাদের নিজস্ব স্বার্থ ব্রিটিশের স্বার্থের সঙ্গে নানাভাবে যুক্তও ছিল। ওঠাবসায়, চালচলনে তাদের সঙ্গে শাসকদের যতটা যোগাযোগ ছিল, ততটা যোগাযোগ জনগণের সঙ্গে ছিল না। উভয় দলেরই লক্ষ্য ছিল শাসক হওয়া। তিন পক্ষ মিলে এরা শেষ পর্যন্ত এক পক্ষই—জনগণের প্রতিপক্ষ। দার্শনিক হেগেল যে বলে গেছেন রাষ্ট্র না থাকলে ইতিহাস থাকে না, সে কথা সত্য নয় ঠিকই; কিন্তু আধুনিক যুগে রাষ্ট্র যে কতটা শক্তি রাখে, বিশেষ করে সে যদি হয় চতুর ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে ভারত বিভাগের মধ্য দিয়ে।

মওলানা আজাদ মনে করেন, ভারত বিভাজনের বীজ প্রথমে বপন করা হয় ১৯২৩ সালে চিত্তরঞ্জন বাংলার হিন্দু-মুসলমানের নেতৃত্বের ভেতর সমতার ভিত্তিতে যে ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ তৈরি করেছিলেন কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দ্বারা, সেটা যখন নাকচ হয়ে গেল তখন থেকেই। চিত্তরঞ্জন সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, চিত্তরঞ্জনের অকালমৃত্যু না ঘটলে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি নতুন আবহাওয়া তৈরি হতো। তাঁর এই বক্তব্যে যথার্থতা আছে। ওই সময়ে গান্ধীকে চ্যালেঞ্জ করার মতো চিত্তরঞ্জন ভিন্ন দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি কংগ্রেসে ছিলেন না। চিত্তরঞ্জন জীবিত থাকলে হয়তো বাংলার রাজনীতি সর্বভারতীয় রাজনীতি থেকে আলাদা রাখতে চাইতেন। কিন্তু কতটা সফল হতেন বলা মুশকিল, কেননা সর্বভারতীয় কংগ্রেস ও লীগ তো বটেই, রাষ্ট্রের কর্তারাও তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াত। দাঁড়াত এই কারণে যে ওই তিন পক্ষের সবাই ছিল এককেন্দ্রিক শাসনের পক্ষপাতী এবং বাংলার রাজনীতি স্বতন্ত্র ধারার হোক, এমনটা কোনো পক্ষেরই পছন্দ হতো না।

এ কথা ঠিক যে ইংরেজ শাসন ভারতবর্ষকে এক করেছিল, তাই বলে এই উপমহাদেশের মানুষদের ঐক্যবদ্ধ রাখা যে তাদের কর্মসূচির মধ্যে ছিল তা মোটেই নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যে বলেছেন, ওটি ‘অজগর সাপের ঐক্যনীতি’, ‘গিলে খাওয়াকেই সে এক করা বলে প্রচার করে’, সে বর্ণনা ভারতবর্ষে ইংরেজের ঐক্য স্থাপননীতির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। ইংরেজ ভারতবর্ষকে এক করতে চায়নি, গিলে খেতে চেয়েছে। তবে এ দেশের মানুষকে যে সম্পূর্ণ দাস-দাসীতে পরিণত করা যাবে না, সেটা তারা প্রথম থেকেই জানত, যে জন্য ভারতবর্ষীয়দের ভেতর ঝগড়া-ফ্যাসাদ বাধিয়ে তোলার নীতি গ্রহণে বিলম্ব করেনি। শুরুতে ইংরেজের পক্ষপাতিত্ব ছিল হিন্দুদের দিকেই। সেটাই ছিল স্বাভাবিক। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি যে শাসনভার কেড়ে নিয়েছিল, সেটি হিন্দু নয়, মুসলমান শাসকদের কাছ থেকেই। দ্বিতীয়ত, ভারতবর্ষে হিন্দুরাই ছিল সবচেয়ে বড় সম্প্রদায়। তৃতীয়ত, ব্যবসা-বাণিজ্য, এমনকি শিক্ষায়ও তারা মুসলমানদের তুলনায় এগিয়ে ছিল। এসব কারণে কম্পানির লোকরা প্রথমে বেনিয়ান, পরে জমিদার এবং পরবর্তী সময়ে কর্মচারী ও পেশাজীবী হিসেবে হাতের কাছে যাদের পেয়েছে তাদের প্রায় সবাই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের—কেউ ছিল প্রস্তুত, কাউকে প্রস্তুত করে নেওয়া গেছে। মুসলমানদের তেমনভাবে পাওয়া যায়নি। ১৮৫৭-তে সিপাহিরা যে জনবিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটায়, তাতে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই ছিলেন; কিন্তু যেহেতু শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহকে পুনরায় ক্ষমতায় বসানোর প্রতীকী চেষ্টা ওই অভ্যুত্থানের ভেতর থেকে বের হয়ে এসেছিল, তাই কম্পানির পক্ষে মুসলমানকে শত্রুভাবাপন্ন মনে করার সংগত কারণ ঘটেছিল।

কম্পানির লোকদের দিক থেকে বিশেষ রকমের অবিশ্বাস ছিল নতুন যে শ্রেণিটি গড়ে উঠেছিল সেই সহযোগী শ্রেণিটির প্রতিই। কেননা শ্রেণিটি বেশ চতুর, নানা দিক দিয়ে দক্ষ এবং ইংরেজি শিক্ষা এরাই প্রথমত ও প্রধানত পাচ্ছিল; এরা যে নিজেদের সুবিধার জন্যই ইংরেজের সহযোগী হয়েছে, এ জ্ঞান ইংরেজদের না থাকার কোনো কারণ ছিল না। ইংরেজ জানত যে এই নতুন শ্রেণিটির পূর্বসূরিরাই একদা আধিপত্য বিস্তারে কম্পানিকে সাহায্য করেছে এবং সেই কাজটা ছিল নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতারই শামিল; আর একবার যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তারা সুযোগ পেলে নিজেদের স্বার্থে বিশ্বাসঘাতকতার ওই কাজে পুনরায় ব্রতী হবে না এমন মনে করাটা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। সর্বোপরি এই নতুন শ্রেণির চরিত্রটা দাঁড়াচ্ছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্তের এবং ইংরেজদের নিজেদের শ্রেণিগত অভিজ্ঞতাই তাদের জানিয়ে দিয়েছে যে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি যতই অনুগত থাকুক না কেন, মনের ভেতরে পরাধীনতাজনিত গ্লানি এবং তার বিপরীতে স্বাধীনতার স্পৃহাকে প্রশ্রয় না দিয়ে পারবে না।

বড় ভয়টা আসলে ছিল এই জায়গাটিতেই। সিপাহিদের অভ্যুত্থান ইংরেজকে জানিয়ে দিয়েছে যে ভারতবর্ষের কৃষকরা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট অবস্থায় রয়েছে। তারা দুর্ভিক্ষে নিপতিত হয়েছে। ইংরেজের সমর্থনপুষ্ট জমিদারদের নিপীড়ন তারা সহ্য করেছে, নীলকরদের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়েছে। ইংরেজ শাসন সবার জন্যই দুঃসহ হয়ে উঠছে, বিশেষভাবে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে তাঁতিরা আর সিপাহি অভ্যুত্থান দমন করতে গিয়ে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে তাতে সিপাহিরা তো বটেই, তাদের আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরাও ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে রয়েছে। সিপাহি অভ্যুত্থানে মধ্যবিত্ত যোগ দেয়নি। বরং তাদের নিজেদের স্বার্থ ইংরেজদের শাসনের সঙ্গে যুক্ত বোধ করে অভ্যুত্থানকারীদের বিপক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি আবার কোনো অভ্যুত্থান ঘটে, তাহলে তাতে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একাংশ যে যোগ দেবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা তো কেউ দিতে পারেনি। স্থানীয় বিদ্রোহ হয়েছে, সন্ন্যাসী, ফকির, সাঁওতাল, ফরায়েজি, কৃষক, নীলচাষি—এরা এখানে-সেখানে ফুঁসে উঠেছে, সশস্ত্রভাবে লড়াই করেছে; বড় অভ্যুত্থান তাই পুনরায় ঘটতেই পারে। আর তেমন লড়াইয়ে মধ্যবিত্ত তরুণরা যদি একবার জড়িয়ে পড়ে, তাহলে ঘটনা যে প্রলয়ংকর হবে, এটা ইংরেজ জানত; ফরাসি বিপ্লবের ব্যাপারে তারা অনবহিত ছিল না।

সেই রকমের ভয়ংকর কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি যাতে না হয়, সে জন্য শিক্ষিত মধ্যবিত্তকে স্থায়ীভাবে মেহনতি মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার বুদ্ধি এঁটেছিল। অভ্যুত্থানের ২৮ বছরের মাথায় ১৮৮৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের একজন অবসরপ্রাপ্ত আইসিএস অফিসার অ্যালেন অক্টেভিয়ান হিউম (১৮২৯-১৯১২) যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তার পেছনে মধ্যবিত্ত ও মেহনতি মানুষের মধ্যে একটি আড়াআড়ি ভেদ তৈরিই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। এ ব্যাপারে তৎকালীন বড়লাট লর্ড ডাফেরিনের সম্মতি থাকাটা ছিল স্বাভাবিক এবং তা পাওয়া গিয়েছিল বৈকি।

এটা মোটেই তাৎপর্যহীন নয় যে কংগ্রেস গঠিত হয়েছিল মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটদের নিয়ে এবং তাদের ওপর ভরসা করেই। হিউম এই গ্র্যাজুয়েটদের লেখা তাঁর একটি চিঠিতে ফরাসি বিপ্লবের মতো মারাত্মক ঘটনা যে ভারতবর্ষে ঘটতে পারে এবং তেমন একটি ‘মহাপ্রলয়’ ঘটলে ইংরেজ সরকার তো বটেই, নতুন মধ্যবিত্তও যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, সেই আশঙ্কার বর্ণনা বেশ চিত্রবহুল ভাষায়ই দিয়েছিলেন। বলেছিলেন যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বুঝতে পারছে না যে তারা একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মুখে বসে আছে এবং ‘এই দেশে যদি একটি সর্বাত্মক কৃষক অভ্যুত্থান ঘটে, তাহলে সেদিন এমন কোনো শক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে পারবে তাকে দমন করতে।’

সিপাহি অভ্যুত্থান ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ওপর যে কত বড় আঘাত ছিল, সেটা স্থানীয় প্রশাসকরা নিজেদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে জেনেছেন। কার্ল মার্ক্স (১৮১৮-৮৩) ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস (১৮২০-৯৫) ইংল্যান্ডে থেকে এবং শাসক ব্রিটিশের সূত্রে প্রাপ্ত অপর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে হলেও ঠিকই ধরে নিয়েছিলেন যে এ ছিল ভারতবর্ষের মানুষের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ ও ক্ষোভের একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। এঙ্গেলস অত্যন্ত সঠিকভাবেই মন্তব্য করেছেন, সামন্তবাদী উপাদান এবং মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও অভ্যুত্থানের ফলে পুরনো সামাজিক সম্পর্কগুলোতে ফাটল ধরেছিল এবং জনগণের ‘নিদ্রাচ্ছন্নতা’ আর আগের মতো থাকেনি। ফলে ব্রিটিশকে ‘পুনরায়’ ভারত জয় করতে হয়েছে; কিন্তু এই দ্বিতীয় বিজয়ে ভারতীয় জনগণের চিত্তে ব্রিটিশ ক্ষমতার প্রতিষ্ঠা বৃদ্ধি পায়নি। ব্রিটিশ শাসকরা সেটা খুব ভালোভাবেই জানতেন।

শ্রেণিবিভাজন শক্ত করার জন্যই ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন উৎসাহিত করা হয়েছে। সরকারি প্রণোদনার জন্য সবাই যে অপেক্ষায় থেকেছে তা অবশ্য নয়, তার আগেই উঠতি মধ্যবিত্ত নিজস্ব উদ্যোগে ইংরেজি শেখা শুরু করে দিয়েছিল। ১৮১৭ সালে কলকাতায় যে হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠা বেসরকারি উদ্যোগেই ঘটে, প্রায় ৪০ বছর পর সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রেসিডেন্সি কলেজ গড়ে ওঠে ওই হিন্দু কলেজ ভিত্তি করেই, ১৮৫৫ সালে; সিপাহি অভ্যুত্থানের দুই বছর আগে। আর ওই অভ্যুত্থানের বছরই তিন প্রধান শহর কলকাতা, মুম্বাই ও মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। এই শিক্ষার মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণি তার নিজের শক্তি বৃদ্ধি করছিল এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা ইংরেজরা আশা করছিল যে কংগ্রেস গঠনের ফলে শ্রেণিবিভাজন আরো দৃঢ় করা সম্ভব হবে।

ইংরেজি শিক্ষার রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রবর্তনের ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগী ছিলেন টি বি মেকওলে (১৮০০-৫৯), যিনি ভারতে শিক্ষাবিস্তারের উদ্দেশ্যে আসেননি, উচ্চ বেতন নিয়ে তাঁর ভারত আগমন ঘটেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির আইন উপদেষ্টা হিসেবে। কলকাতায় ১৮৩৪ থেকে ১৮৩৮ পর্যন্ত চার বছর অবস্থান করে তিনি ইন্ডিয়ান পেনাল কোড প্রণয়ন করে দিয়ে যান, নানা সংশোধন সত্ত্বেও যেটি উপমহাদেশে এখনো চালু রয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে ওই আইনপ্রণালী ভারতীয় জনগণের জন্য ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়নি, লক্ষ্যটা ছিল ইংরেজের এবং সম্পত্তিমান ভারতীয়দের স্বার্থের পাহারাদারি পোক্ত করা। ইংরেজ অনুগত ও পৃষ্ঠপোষিত জনবিচ্ছিন্নভাবে গড়ে ওঠা সুবিধাভোগী মধ্যবিত্তকে আইনি ব্যাপারে সহায়তা দিতে এসে মেকওলে শিক্ষাগত সহায়তা দেওয়ারও সুবন্দোবস্ত করলেন, ১৮৩৫ সালে সরকারিভাবে ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনের সুপারিশ জানিয়ে, যে সুপারিশ সরকার সোৎসাহে গ্রহণ ও কার্যকর করেছে। ইংরেজি শিক্ষা চালু করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মেকওলের উক্তিটি বহুল আলোচিত, যাতে বলা হয়েছে যে সর্বশক্তি দিয়ে এমন একটি শ্রেণি তৈরি করা চাই, ‘যারা আমাদের এবং যে লাখ লাখ মানুষকে আমরা শাসন করছি, তাদের মধ্যে দোভাষীর কাজ করবে। এরা রক্ত ও বর্ণে হবে ভারতীয়; কিন্তু রুচি, মতামত, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে হবে ইংরেজ।’ শ্রেণিটিকে ভদ্রতা করে ‘দোভাষী’ বলেছেন, আসলে যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো দালাল ও চর। সমাজকে বিভক্ত করতে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিচ্ছিন্নতার সৌধ গড়ে তুলতে ইংরেজি শিক্ষা যেভাবে উপাদান ও উৎসাহ সরবরাহ করেছে, ভারতবর্ষের সামাজিক ইতিহাসে শিক্ষাকে সে রকমের ভূমিকা গ্রহণ করতে এর আগে কখনো দেখা যায়নি। শিক্ষিত-অশিক্ষিতের পার্থক্য নিশ্চয়ই আগেও করা হতো, কিন্তু শিক্ষাকে ব্যবহার করে মানুষে মানুষে দূরত্ব সৃষ্টির কাজটা ছিল ইংরেজ শাসকদের একটি অভিনব ও কার্যকর পদক্ষেপ।

মেকওলের প্রসঙ্গ যখন উঠেছেই, তখন তাঁকে দৃষ্টান্ত হিসেবে নিয়ে দেখা যেতে পারে, ইংরেজ শাসকরা ভারতবর্ষকে নিজেদের শাসনে রাখার জন্য কেন অতটা ব্যস্ত ছিল। যারা দুর্নীতি করত তাদের কথা তো আলাদাই, এমনকি মেকওলের মতো যাঁরা উদারনৈতিক (হুইগ পার্টির লোক, রক্ষণশীল টোরি পার্টির নন), তাঁদেরও বেশির ভাগই ভারতবর্ষের সভ্যতা-সংস্কৃতির গুণ সম্পর্কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য তো করতেনই, এই উপমহাদেশকে তাঁরা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের এক উর্বর ভূমি হিসেবেও পেয়েছিলেন। রজনী পাম দত্ত (১৮৯৬-১৯৭৪) তাঁর ‘ইন্ডিয়া টুডে’ বইতে ভারতে চাকরি নিয়ে আসার আগে মেকওলের (১৮৩৩) লেখা একটি চিঠি উদ্ধৃত করেছেন, যাতে নবীন লেখক মেকওলে তাঁর ভগ্নিকে বেশ হতাশার সুরেই জানাচ্ছেন, তাঁকে তো লেখালেখি করেই জীবিকা অর্জন করতে হবে, কিন্তু ওই কাজ করে কখনোই তিনি বছরে ২০০ পাউন্ডের বেশি উপার্জন করতে পারেননি; অথচ নিজের ও পরিবারের ব্যয়ভার বহনের জন্য তাঁর আয় করা দরকার ছিল কমপক্ষে ৫০০ পাউন্ড। এই অন্ধকারে তাঁর জন্য আলোর একটি রেখা দেখা দিয়েছে; ভারতে যে চাকরি নিয়ে তিনি যাচ্ছেন, সেটির বেতন হচ্ছে বছরে ১০ হাজার পাউন্ড এবং কলকাতায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে মেলামেশা করেন, এমন লোকদের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, সেই শহরে অত্যন্ত সমারোহের সঙ্গে বসবাস করলেও বছরে পাঁচ হাজারের বেশি খরচ পড়বে না; বেতনের বাকিটা তিনি সুদসহ সঞ্চয় করতে পারবেন এবং তাই চাকরি শেষে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে যখন তিনি ইংল্যান্ডে ফিরবেন, তখন তাঁর তহবিলে থাকবে নগদ ৩০ হাজার পাউন্ড। তাঁর জন্য এর চেয়ে বেশি সৌভাগ্যের ব্যাপার আর কী-ই বা হতে পারে।

কিন্তু কংগ্রেসকে ইংরেজরা যেভাবে ব্যবহার করবে বলে ভেবেছিল, ঠিক সেভাবে ব্যবহার করতে পারেনি। অল্প সময়ের মধ্যেই নানা ধ্বনি উঠেছে; বড়লাট লিটনের সময় যেসব নিবর্তনমূলক আইন পাস করা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে ছিল মঞ্চাভিনয় আইন (১৮৭৬), স্থানীয় ভাষায় সংবাদপত্র প্রকাশ আইন (১৮৭৮) ও অস্ত্র আইন (১৮৭৮)। কংগ্রেসের অধিবেশনে সেগুলো প্রত্যাহারের পক্ষে প্রস্তাব উত্থাপনের চেষ্টা চলেছে। ১৯০০ সালে লর্ড কার্জন যখন এলেন, তখন তিনি তো কংগ্রেসের কাজকর্ম দেখে বেশ বিরক্তই ছিলেন এবং বলেছিলেন যে কংগ্রেসের মনে হয় চলতে-ফিরতে অসুবিধা হচ্ছে এবং তাঁর ‘মহৎ উচ্চাশাগুলোর একটি হচ্ছে কংগ্রেসকে শান্তির সঙ্গে মৃত্যুমুখে পতিত হতে সহায়তা দান করা।’ বঙ্গভঙ্গের যে পরিকল্পনা কার্জনরা করেছিলেন, তার লক্ষ্যগুলোর একটি ছিল কংগ্রেসের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করা।

বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা ক্রমেই প্রবল হচ্ছিল। কার্জনের পর যিনি বড়লাট হয়ে আসেন, সেই লর্ড মিন্টো কংগ্রেসকে দুর্বল করার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন, কিন্তু তাঁর ব্যবহৃত পদ্ধতিটা ছিল ভিন্ন ও অভিনব; কংগ্রেসকে ভেতর থেকে না ভেঙে তার বাইরে একটি প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো। সেই প্রতিষ্ঠানটিই হলো নিখিল ভারত মুসলিম লীগ। জনবিচ্ছিন্ন মধ্যবিত্তকে জনগণ থেকে আলাদা করার জন্য সরাসরি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল কংগ্রেসকে, এবার আরো একটি বিভাজন তৈরির লক্ষ্যে মুসলমান নেতাদের অনুপ্রাণিত করে স্থাপন করা হলো মুসলিম লীগকে।

১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় নতুন প্রদেশ পূর্ববঙ্গ ও আসামের রাজধানী ঢাকায়। কংগ্রেসের মধ্য দিয়ে চেষ্টা করা হয়েছিল মধ্যবিত্তকে আড়াআড়িভাবে জনগণ থেকে আলাদা করে ফেলার; বিভাজনের সেই উদ্যোগই আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল মুসলিম লীগ গঠনের ফলে। এবারকার ভাগাভাগিটার চরিত্র দাঁড়াল খাড়াখাড়ি—অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক। শুধু তা-ই নয়, মুসলিম লীগ গঠনের পরিপূরক পদক্ষেপ হিসেবে এলো হিন্দু-মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা। ভোটাধিকার ছিল অত্যন্ত সীমিত, এমনকি ১৯৩৭ সালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনেও দেশের ৩৫ কোটি মানুষের মধ্যে ভোটাধিকার ছিল মাত্র চার কোটির, অর্থাৎ ১১.৫ শতাংশের। এভাবে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল গঠন এবং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা করে দিয়ে দেশভাগের পথ পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। দেশভাগ ঘটল জাতীয়তাবাদী হতে গিয়ে ভারতবাসীর সাম্প্রদায়িক হওয়ার কারণে। সাম্প্রদায়িকতা একটি সমাজের ওপরতলার রাজনৈতিক ঘটনা। প্ররোচনাদাতা ছিল ব্রিটিশ শাসকরা, কলকাঠি সতর্কতার সঙ্গে তারাই নাড়ছিল, যদিও সামনাসামনি লড়াইটা বেধে গিয়েছিল হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যেই। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে অগ্রসর হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা যখন ধর্মের শরণাপন্ন হলেন, তখন তাঁরা নিজেদের অজান্তেই সাতচল্লিশ সালে দেশের মর্মান্তিক বিভাজনের জন্য ক্ষেত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়লেন। রাষ্ট্রের কর্তারা বাংলা ভাগ করতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে সরে এসেছিলেন, যেন তারই প্রতিশোধ নিলেন সাতচল্লিশে ভারত ভাগ করে।


মন্তব্য