kalerkantho


জাতীয়তাবাদ পেরিয়ে ইতিহাসের সন্ধানে

১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জাতীয়তাবাদ পেরিয়ে ইতিহাসের সন্ধানে

১৮৫৭ সালে বারাকপুরে সিপাহি বিদ্রোহ

জমিদাররা তিতুমীরের কৃষক বাহিনীর কাছে বারবার পরাজিত হয়। তিনি নদীয়া, চব্বিশ পরগনা, ফরিদপুর জেলাকে স্বাধীন ঘোষণা করে সেখানকার জমিদারদের তাঁকে করদানের আদেশ দেওয়ার পর এই লড়াই সরাসরি ইংরেজবিরোধী হয়ে দাঁড়ায়। ব্রিটিশদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের বিরুদ্ধে তিতুমীরের বাহিনী শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি। কিন্তু এই লড়াই, এই সাহস অবিস্মরণীয়। অনেকেই তিতুমীরকে হিন্দু জমিদারদের আক্রমণ এবং জমিদার দেবনাথ রায়কে হত্যার কারণে সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে থাকেন। তবে ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে ও সুপ্রকাশ রায় জানিয়েছেন, তিতুমীরের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু যেমন হিন্দু জমিদার ছিল, তেমনি ধনী মুসলমানও ছিল, তেমনি তাঁর পক্ষে ছিল হিন্দু-মুসলিম-নির্বিশেষে সব কৃষক; যদিও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় যুদ্ধ আকারে জিহাদ ও ইসলাম প্রতিষ্ঠা তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল

 

►        ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ আমাদের ইতিহাসে সিপাহি বিদ্রোহ হিসেবেই পরিচিত; যদিও কার্ল মার্ক্স একে বলেছিলেন প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতাযুদ্ধ। কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধ হিসেবে এর পাঠ নেই বললেই চলে

 

►        দীনবন্ধু মিত্রর ‘নীলদর্পণ’কে ঘিরেই আসলে ভদ্রলোকদের প্রতিবাদটা জমে ওঠে।...আর নাটকটাও প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা নয়, ঢাকা থেকে

 

►        আধুনিক রাজনৈতিক দল গঠিত হওয়ার পর এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় কৃষক আন্দোলন তেভাগা। সাম্প্রদায়িক আবহাওয়ার বিষাক্ত পরিবেশে এটা ছিল এক গৌরবদীপ্ত কৃষক সংগ্রাম

 

ইতিহাস শুধু অতীতের ঘটনাবলি নয়, ইতিহাস দারুণভাবে বর্তমানও। অতীতের বহু ঘটনা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে, হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতলে। যেসব ঘটনা হারিয়ে যায় তা শুধু তার সমকালীন গুরুত্ব বা প্রভাব বিবেচনায়ই ঘটে না; বরং অনেক বেশি করে ঘটে বর্তমানের ওপর তার প্রভাব বিবেচনায়, কোন শ্রেণি তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে, কার হাতে ইতিহাস রচিত হচ্ছে, তার ওপর। সেদিক থেকে জাতীয়তাবাদী ধারার বাইরে যে আন্দোলনগুলো হয়েছে এই ভূখণ্ডে, তার প্রায় বিস্মৃতির কারণ আসলে আন্দোলনগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষিত না হওয়া; ইতিহাসের ওপর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া—না শাসনক্ষমতার দিক থেকে, না বয়ানের বিষয়বস্তুর দিক থেকে। কিন্তু এই ভুলে যাওয়া ইতিহাস আজও আমাদের তাড়া করে ফেরে। তার বিস্মৃতি তাই আপাতবিস্মৃতি। তাকে এক অর্থে জোর করে ভুলিয়ে রাখা হয়েছে; বিকাশের স্বাভাবিক নিয়মে তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। এই অনুসন্ধান সে কারণে জরুরি শুধু নয়, আবশ্যক। এই নিবন্ধে চেষ্টা করা হবে আমাদের ইতিহাসের একটা বিশেষ কালপর্বে, ব্রিটিশ শাসনের অধীনে এখানে জাতীয়তাবাদী ধারার বাইরে যে আন্দোলনগুলো হয়েছে, তা অনুসন্ধান করার মাধ্যমে কিছু প্রবণতা ধরার।

প্রথমেই উল্লেখ করেছি, আমরা মূলত জাতীয়তাবাদী ধারার বাইরের আন্দোলনগুলো এখানে আলোচনার চেষ্টা করব। প্রশ্ন আসে, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনগুলো কি এই আন্দোলন থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন? তাদের ভেতর কি সংযোগসূত্র নেই? গৌতম ভদ্র বলেছেন, ‘ভারতীয় ইতিহাস বেণিবন্ধনের মতো মিলেছে, আবার আলাদা হয়ে গেছে।’ তবে কতটুকু মিলেছে আর কতটুকু আলাদা হয়েছে সেটি বিচার্য। মোটা দাগে এখানকার জাতীয়তাবাদী রাজনীতি জনতার আন্দোলনের সরাসরি যৌক্তিক পরিণতি যে নয়, সেটা নানা বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতা থেকেই বলা যায়। এ অঞ্চলে আধুনিক জাতীয়তাবাদী দলভিত্তিক রাজনীতি শুরু কংগ্রেসের হাত ধরে। কী ছিল তার প্রেক্ষাপট? ১৮৭৩-৭৪ সালে এক ভয়ংকর দুর্ভিক্ষে অগ্নিগর্ভ অবস্থা বিরাজ করছিল। বিভিন্ন জেলা থেকে ভয়ংকর সব খবর আসতে শুরু করল ইংরেজ শাসকদের কাছে। তারা তখন বিদ্রোহের ভয়ে কম্পমান। বিশেষত যদি শিক্ষিত সমাজ গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে যোগ দেয়, তাহলে তারা সমূহ বিপদের আশঙ্কা করছিল। এই অবস্থায়ই ইংরেজ কর্মকর্তা হিউম, বড়লাট ডাফরিন প্রমুখ দেশীয় শিক্ষিত রাজনীতিবিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলে অসন্তোষ ‘সঠিক পথে’ পরিচালনার তাড়া অনুভব করে। হিউমের উদ্যোগেই কংগ্রেস গঠনের প্রাথমিক উদ্যোগ চলে। (‘ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস’, ই এম এস নাম্বুদিরিপাদে)

যদিও শিগগিরই নানা মতভিন্নতা দেখা দেয়। কংগ্রেস যেমন হিন্দু জমিদার ও নতুন ব্যবসায়ী বুর্জোয়া শ্রেণির রাজনৈতিক প্রয়োজনের একটা প্রকাশ ছিল, তেমনি মুসলিম লীগও উঠতি মুসলিমদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ছিল। ব্রিটিশদের কাছে মুসলিম লীগ কংগ্রেসকে তাঁবে রাখার এবং হিন্দু-মুসলিম বিভাজন আরো উসকে দিয়ে নিজেদের শাসন মসৃণ করার একটা উপায় হিসেবেই বিবেচিত হয়েছিল। কংগ্রেসের হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী মোড়ও মুসলিম লীগের উত্থানের পেছনে ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু সেই আলোচনা আপাতত আমাদের জন্য খুব জরুরি নয়; এটা লক্ষ করা বরং জরুরি যে জনতার রোষ একটা নিয়ন্ত্রণযোগ্য কাঠামোর মধ্যে রাখার প্রয়োজনে উদ্ভব ঘটেছিল একটা আধুনিক জাতীয়তাবাদী দলের। তারা নীলচাষিদের আন্দোলন বা সিপাহি বিদ্রোহের মতো অনিয়ন্ত্রণযোগ্য বিদ্রোহের পুনরাবৃত্তি চাইছিল না।

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ আমাদের ইতিহাসে সিপাহি বিদ্রোহ হিসেবেই পরিচিত; যদিও কার্ল মার্ক্স একে বলেছিলেন প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতাযুদ্ধ। কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধ হিসেবে এর পাঠ নেই বললেই চলে। ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে যায়। মিরাট, দিল্লি, রোহিলখণ্ড, আগ্রা, কাশী, ছোট নাগপুর, নিমুচ, আজমির, পাঞ্জাব, অযোধ্যা, বাংলায় পাটনা ও ছোট নাগপুরে তা ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লি, অযোধ্যা, রোহিলখণ্ড ও বুন্দেলখণ্ড স্বাধীন হয়, ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ, মধ্য ভারত, মধ্য ভারতীয় দেশীয় রাজ্যসমূহ ও বিহারে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলতে থাকে। (‘সিপাহী যুদ্ধের ১৫০ বছর’, দে’জ পাবলিকেশন) এর ঢেউ পূর্ব বঙ্গেও আছড়ে পড়ে। ঢাকা ও সিলেটে ইউরোপীয় সেনাদের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়, চট্টগ্রামে বিদ্রোহীরা কোষাগার লুণ্ঠন করে এবং কারাগার ভেঙে কয়েদিদের মুক্ত করে দেয়। (‘সিপাহীযুদ্ধ ও বাংলাদেশ’, রতনলাল চক্রবর্তী) এই বিদ্রোহ শুধু সিপাহিদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ছড়িয়ে পড়েছিল জনসাধারণের মধ্যেও। জি বি ম্যালেন তাঁর ‘হিস্ট্রি অব দি ইন্ডিয়ান মিউটিনি’তে লিখেছেন, ‘অযোধ্যা, রোহিলখণ্ড, বুন্দেলখণ্ড এবং সগর ও নর্মদা এলাকায় জনসাধারণের অধিকাংশ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল। পশ্চিম বিহার, পাটনা বিভাগের বহু জেলা এবং মীরাটে জনসাধারণ ও সিপাহীরা একই সময়ে বিদ্রোহ করে।’

মহাবিদ্রোহ সব অর্থেই স্বাধীনতাসংগ্রামের এক উদাহরণ। হিন্দু-মুসলিম বিরোধের বদলে একটা ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হিন্দুদের মাধ্যমে শুরু হয়ে বিদ্রোহের নায়ক হয়ে উঠেছিলেন বাহাদুর শাহ। মাত্র কয়েক দিনের জন্য হলেও ভারতবাসী ব্রিটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়েছিল। কিন্তু কেন এই সংগ্রাম স্বাধীনতাসংগ্রাম বলে গণ্য হলো না? সম্ভবত সবচেয়ে বড় কারণ শিক্ষিত ভদ্রলোকরা, সমাজের মান্যগণ্য ব্যক্তিরা তাকে সেভাবে গ্রহণ করেনি। বরং সে সময়ের স্থানীয় সংবাদপত্রে, বিভিন্নজনের লেখনীতে, ভদ্রলোকদের সভায় এই সংগ্রামকে রীতিমতো শাপশাপান্ত করা হয়েছে। ২৬ মে ১৮৫৭ সংবাদ প্রভাকরে হিন্দু মেট্রোপলিটন কলেজে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের এক সভার বিবরণী প্রকাশিত হয়। তার প্রথম প্রস্তাব এখানে উল্লেখ করছি—‘এই সভা শ্রবণকরত অত্যন্ত দুঃখিত হইয়াছেন যে এতদ্দেশীয় কয়েক দল পদাতিক সৈন্য গবর্নমেন্টের বিরোধী হইয়া স্থানে স্থানে অত্যাচারকরণে প্রবৃত্ত হইয়াছে এবং তাহাদিগের এই অসচ্চরিত্র এবং ব্যবহার জন্য সভার ঘৃণা ও ভয়।’ এ ছাড়া তাঁরা এই বিদ্রোহের কোনো কারণ খুঁজে পাননি এবং ব্রিটিশ রাজকে সব ধরনের সহায়তার অঙ্গীকার করেছেন। সংবাদ প্রভাকর, সম্বাদ ভাস্কর, হিন্দু প্যাট্রিয়ট ইত্যাদি পত্রিকা সম্পাদকীয় লিখে বিদ্রোহের নিন্দা ও ব্রিটিশ রাজের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

মীরাট ছিল বিদ্রোহের অন্যতম কেন্দ্র এবং সেখানে জনসাধারণ সেনাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। সেখানকার ভদ্রলোকদের অবস্থান প্রকাশ করেছেন সেরেস্তাদার মহিজুদ্দিন, ‘সওয়ার ও সিপাহীরা আপনাদের মধ্যে পরামর্শ করিয়া এই সকল বিভ্রাট বাধাইয়াছে। ভদ্রলোকেরা যদি এ বিষয়ে পূর্ব হইতে কিছুমাত্র জানিতে পারিতেন, তাহা হইলে বিদ্রোহের পূর্বেই এ সকল বিষয় প্রকাশ হইয়া পড়িত।’ অশ্বিনীকুমার সেন ‘সিপাহী বিদ্রোহে ভেতো বাঙালী’ শীর্ষক প্রবন্ধে বিদ্রোহের ৫০ বছর পর বাঙালি বীর প্যারিমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্মরণ করেছেন, যিনি বিদ্রোহ দমনে এবং ইংরেজ রাজ রক্ষায় তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘ফাইটিং মুন্সেফ’ উপাধি পেয়েছিলেন। আশা করি এগুলো থেকে শিক্ষিত ভদ্রলোকদের সিপাহি বিদ্রোহ সম্পর্কে মনোভাবের খানিকটা পরিচয় পাওয়া যাবে এবং কেন তা স্বাধীনতাযুদ্ধের স্বীকৃতি পায়নি তা-ও খানিকটা বোঝা যাবে।

নীলচাষিদের বিদ্রোহ কিন্তু অনেকটাই সমর্থন পেয়েছিল ভদ্রলোকদের। তবে সমর্থনটা একেবারে সরল-সোজা ছিল না; বরং এসেছিল একটু ঘুরপথে। বহুদিন থেকেই নীলকরদের অত্যাচার চলছিল, খবরের কাগজেও পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকেই চাষিদের ওপর নীলকরদের নানামুখী অত্যাচারের খবর আসতে থাকে। গ্রামগুলোতে চাষিরা, যাদের রায়ত বলা হতো, তারা ফুঁসে উঠছিল। তাতে ভদ্রলোকদের সঙ্গে নীলকরদের স্বার্থের বিরোধও তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু তাঁরা নিজেরা কোনো বিদ্রোহের কথা ভেবেছেন এমন কোনো প্রমাণ নেই, এমনকি প্রজাদের দিক থেকে কোনো সহিংস বিদ্রোহ হতে পারে সেটাও তাঁরা কল্পনা করেননি। রণজিৎ গুহর পর্যবেক্ষণ, দীনবন্ধু মিত্রর ‘নীল দর্পণ’কে ঘিরেই আসলে ভদ্রলোকদের প্রতিবাদটা জমে ওঠে। শিবনাথ শাস্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা সবাই প্রচণ্ড আলোড়িত হয়েছিলাম।’ তবে এই আলোড়নটা আসলে ঘটেছিল ‘নীল দর্পণ’ প্রকাশিত হওয়ার আট মাস পর। আর নাটকটাও প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা নয়, ঢাকা থেকে। রণজিৎ গুহর একটা অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ, ‘এই আট মাসে আপাতদৃষ্টিতে বাংলার লেফটেন্যান্ট-গভর্নর ও বাংলার সরকারের সচিবের ভেতর আসলে মামুলি প্রাত্যহিক সরকারি কাজকর্ম বিষয়ে যোগাযোগের কিছু খামতির কারণে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে যায় এবং নীলকররা পুরো নাটকটাকে একটা কেলেঙ্কারির কারণে পরিণত করতে সুযোগ পায়। ঠিক এই সময়ই বাংলার বিদ্বৎসমাজ বুঝতে পারে, নীল দর্পণকে সমর্থন করার মাধ্যমে নীলকরের লাঠিয়ালের কাছে মাথা কাটা যাবার ঝুঁকি না নিয়েই কৃষকদের সমর্থন করা যায়। কাজেই জেমস লংম্যান যখন রায়তদের জন্য তাঁর চিন্তা এবং লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে বিব্রত হওয়া থেকে বাঁচানো উভয় দ্বারা তাড়িত হয়ে কণ্টকমুকুট পরতে এগিয়ে এলেন, কলকাতার অগ্রগামীরা তখন খারাপ ইংরেজদের (নীলকর) বিরুদ্ধে ভাল ইংরেজদের (মিশনারি ও কর্মকর্তা) পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।’ ফলে এই সমর্থন কৃষকদের ঔপনিবেশিক প্রভুদের বিরুদ্ধে সরাসরি যে সংগ্রাম তাতে সমর্থন নয়, বরং আরেক ভদ্রলোকের লেখার পেছনে দাঁড়ানো এবং মহত্প্রাণ ইংরেজ শাসকদের মহত্ত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে তাতেই আশ্রয় খোঁজাও বলা যায়।

এর আগে এই অঞ্চলে বড় আকারের বিদ্রোহের মধ্যে আছে সাঁওতাল বিদ্রোহ এবং তিতুমীরের আন্দোলন, তাঁর বিখ্যাত বাঁশের কেল্লা। এই সব আন্দোলনের সঙ্গে শিক্ষিত ভদ্রলোকদের সম্পর্ক ছিল না বললেই চলে। উভয় বিদ্রোহই ছিল যুগপৎ জমিদার, মহাজন ও ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে। আর তাতে অংশ নিয়েছিল বিরাটসংখ্যক কৃষক জনসাধারণ। উভয় বিদ্রোহেই ধর্ম প্রতিরোধের উপাদান হিসেবে একটা কেন্দ্রীয় জায়গা নিয়েছিল। ধার্মিকতা ‘হুলের’ ধারণার কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল। যে শক্তি তাকে উদ্দীপনা জুগিয়েছিল তা এমন সব চিন্তা দ্বারা গঠিত হয়েছিল এবং এমন ভাষায় তা প্রকাশিত হয়েছিল, যা ছিল পুরোটাই ধর্মীয়। ধর্ম এখানে বহিরাগত উপাদান হিসেবে আরোপিত হয়নি, বরং আন্দোলনের ভাষা ও শরীরে অবিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। অনেক ভাষ্যকার যেমন মনে করেন, তাঁদের নেতারা কুসংস্কারাচ্ছন্ন সাঁওতালদের প্রতিরোধে একত্র করতে ধর্মকে ব্যবহার করেছেন, তেমনটি আসলে সত্য নয়। তিতুমীরের আন্দোলন শুরু হয় একটা ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন হিসেবে। কিন্তু অচিরেই তা জমিদার-মহাজনদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে পরিণত হয়। জমিদাররা তিতুমীরের কৃষক বাহিনীর কাছে বারবার পরাজিত হয়। তিনি নদীয়া, চব্বিশ পরগনা, ফরিদপুর জেলাকে স্বাধীন ঘোষণা করে সেখানকার জমিদারদের তাঁকে করদানের আদেশ দেওয়ার পর এই লড়াই সরাসরি ইংরেজবিরোধী হয়ে দাঁড়ায়। ব্রিটিশদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের বিরুদ্ধে তিতুমীরের বাহিনী শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি। কিন্তু এই লড়াই, এই সাহস অবিস্মরণীয়। অনেকেই তিতুমীরকে হিন্দু জমিদারদের আক্রমণ ও জমিদার দেবনাথ রায়কে হত্যার কারণে সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে থাকেন। তবে ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে ও সুপ্রকাশ রায় জানিয়েছেন, তিতুমীরের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু যেমন হিন্দু জমিদার ছিল, তেমনি ধনী মুসলমানও ছিল, তেমনি তাঁর পক্ষে ছিল হিন্দু-মুসলিম-নির্বিশেষে সব কৃষক; যদিও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় যুদ্ধ আকারে জিহাদ ও ইসলাম প্রতিষ্ঠা তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল। একইভাবে ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ আসে ফকির ও সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে। তাদের জনসাধারণের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে জীবন নির্বাহকে ইংরেজরা গির্জার ট্যাক্স আরোপের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছিল।

আধুনিক রাজনৈতিক দল গঠিত হওয়ার পর এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় কৃষক আন্দোলন তেভাগা। তেভাগা আন্দোলন ঘটে ঠিক ব্রিটিশ রাজের বিদায়ের প্রাক্কালে। সাম্প্রদায়িক আবহাওয়ায় বিষাক্ত পরিবেশে এটা ছিল এক গৌরবদীপ্ত কৃষক সংগ্রাম। মূলত কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এই আন্দোলন সংগঠিত হয়। এই আন্দোলনই প্রথম বড় আকারে শিক্ষিত শ্রেণির সঙ্গে কৃষকদের সংযুক্তির সম্ভাবনা দেখিয়েছিল। কিন্তু সেই সম্পর্কে বেশ খানিকটা ফাঁক থেকে গিয়েছিল। প্রথমত, এর আগের আন্দোলনগুলোতেও আমরা দেখব শুধু তাত্ক্ষণিক দাবিদাওয়া নয়, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল জনগণের ভাবনার কেন্দ্রে। সময়টাও ছিল স্বাধীনতার ঠিক পূর্বমুহূর্ত। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মাধ্যমেই সেই স্বাধীনতা আসছিল। কিন্তু তেভাগা বা তার নেতা হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টি তার চেয়ে আলাদা কোনো রাষ্ট্র কল্পনা এই জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেনি। বরং সে প্রশ্ন অনেকটা এড়িয়ে গিয়েছিল বা জাতীয়তাবাদী দলগুলোর ওপরই ছেড়ে দিয়েছিল। তেমনিভাবে ‘দিনাজপুর অঞ্চলে তরুণ মৌলভীরা যখন কৃষকদের কাছে সুললিত ভাষায় জোতদারি ব্যবস্থাতে অধিক সুদ নেবার ব্যবস্থার সমালোচনা করছিল কোরানের আয়াত পাঠ করে, তার তাৎপর্যও তারা বুঝতে পারেননি।’ অর্থাৎ কৃষকদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক তথা চিন্তাজগতের সঙ্গে একটা বিচ্ছিন্নতা তাঁদের ছিল। ফলে তাঁরা কৃষকদের কৃষকসভার মিটিংয়ে আসাকে যেভাবে মুসলিম লীগের প্রতি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করে শ্লাঘা অনুভব করেছিলেন, তার বেশির ভাগটাই মিছে আশায় পরিণত হয়েছে। তেভাগার কর্মী পাকিস্তান আন্দোলনের কর্মীতে পরিণত হয়েছে।

এই আন্দোলনগুলো লক্ষ করলে দেখা যায়, শিক্ষিত ভদ্রলোকদের সঙ্গে কৃষক জনসাধারণের আন্দোলনের একটা বিচ্ছিন্নতা সব সময়ই ছিল। যখন সমর্থন দেখা গেছে, তখনো আন্দোলন যেমন আছে তাকে তেমনভাবে নিয়ে তার মূল সারকে তাঁরা গ্রহণ করতে পারেননি; বরং নিজেদের চিন্তাভাবনা, রুচি দিয়ে সেগুলো তাঁরা বিচার করেছেন। আবার এখানকার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ইংরেজ শাসকদের সঙ্গে সব সময়ই একটা বিশেষ সম্পর্ক রেখেছে এবং প্রায়ই তাদের ছক অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে। ব্রিটিশদের ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তারাও বিভক্তি ও বিভেদ বাড়িয়েছে। পক্ষান্তরে কৃষক ও জনসাধারণের আন্দোলনে সব সময়ই একটা মৈত্রীর তাগিদ ছিল, যা বিভিন্ন রূপ নিয়েছে। কিন্তু মৈত্রীর এই রূপ রাজনৈতিক ধারা আকারে বিকশিত হয়নি। মৈত্রীর একটা আকাঙ্ক্ষা কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যে থাকলেও তা জনসাধারণের ধর্মচেতনাকে ইউরোপীয় আলোকায়নের বাইরে খুব বেশি দেখতে পায়নি এবং মৌলিকভাবে শিক্ষিত ভদ্রলোকদের চেতনার চেয়ে তা আলাদা ছিল না। ইতিহাস রচনায়ও তাই জনগণ সক্রিয় সত্তা আকারে উপস্থিত হয়নি; বরং তা রাজরাজড়ার বা নেতাদের কীর্তির বিবরণী হয়ে উঠেছে। জনগণের ইতিহাস বিবেচিত হয়েছে প্রান্তিক ইতিহাস হিসেবে; মূলধারার ইতিহাস নয়। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গোড়ার গলদটা বোধ হয় সেখানেই।


মন্তব্য