kalerkantho

কৃষক-শ্রমিকের নেতা শেরেবাংলা

১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কৃষক-শ্রমিকের নেতা শেরেবাংলা

অঙ্কন : মাসুম

শেরেবাংলা ১৯১৬ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি এবং এর মধ্যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা প্রায় সার্বক্ষণিকভাবে বাংলার দরিদ্র কৃষকসমাজকে ঘিরে আবর্তিত হতো। সে কারণেই তিনি ভারতীয় কংগ্রেস কিংবা মুসলিম লীগের রাজনীতি ছেড়ে শেষ পর্যন্ত গঠন করেছিলেন কৃষক প্রজা পার্টি। এরও বেশ পরে এটিকে আবার নাম পরিবর্তন করেছিলেন কৃষক শ্রমিক পার্টি হিসেবে

 

ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমের মুসলমানপ্রধান অঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয়সহ তৎকালীন মুসলিম লীগ প্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৪০ সালে ঐতিহাসিক ‘লাহোর প্রস্তাব’ উপস্থাপন করেছিলেন জনপ্রিয় বাঙালি রাজনীতিক শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতা কিংবা পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে সেই ফজলুল হককেই বৃদ্ধ বয়সে দুইবার গৃহবন্দি হতে হয়েছিল। হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ের পর পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রীর (চিফ মিনিস্টার) দায়িত্ব নিয়েছিলেন হক সাহেব। কিন্তু তার পরবর্তী দুই মাসের মধ্যেই সেই সরকার ভেঙে দিয়ে পূর্ব বাংলায় গভর্নর জেনারেলের কেন্দ্রীয় শাসন জারি করা হয়েছিল এবং প্রথমবারের মতো হক সাহেবকে গৃহবন্দি করা হয়েছিল। তখন এক ঝটিকা সফরে সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ পাকিস্তানে এসে তাঁর বিশেষ বিমানটি পাঠিয়েছিলেন হক সাহেবকে এক বিশেষ আলোচনার উদ্দেশ্যে করাচি নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাঁদের মধ্যে তখন কী আলোচনা হয়েছিল, তা বিস্তারিতভাবে জানা না গেলেও ঢাকায় ফিরে নিজ গৃহে অন্তরিন হতে হয়েছিল আপাদমস্তক বাঙালি রাজনীতিক হক সাহেবকে। তারপর ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তানে হক সাহেবের কৃষক-শ্রমিক পার্টি (কেএসপি) এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম লীগের নেতৃত্বে এক সম্মিলিত সরকার গঠন করা হয়েছিল, যার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে। পরে ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়েছিল শেরেবাংলাকে। সেই দায়িত্বে তিনি দুই বছর কাজ করার পর ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের লৌহমানব আইয়ুব খানের নেতৃত্বে যে সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, তাতে আবার দায়িত্বচ্যুত করে দ্বিতীয়বারের মতো গৃহবন্দি করা হয়েছিল বাংলার এই বর্ষীয়ান নেতাকে। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৮৫ বছর। শেরেবাংলা ১৮৭৩ সালের ২৭ এপ্রিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার বাকেরগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

আবুল কাশেম ফজলুল হক ১৯১৩ সালে প্রথমবার বেঙ্গল আইন কাউন্সিলের নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত সেখানে কাজ করেছিলেন। কেন্দ্রীয় আইন পরিষদেও তিনি ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত দুই বছরের জন্য নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তারপর ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত একটানা ১০ বছর বেঙ্গল আইন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। সে সময় ছয় বছরকাল শেরেবাংলা একটানা অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেছিলেন। তারপর পূর্ব বাংলায়ও তিনি যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯১৩ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সেক্রেটারি পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯২৯ সালে তিনি নিখিল বাংলা প্রজা সমিতি (অল বেঙ্গল টেন্যান্টস অ্যাসোসিয়েশন) গঠন করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে কৃষকসমাজের একটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত হয়েছিল। শেরেবাংলা ১৯১৬ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি এবং এর মধ্যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা প্রায় সার্বক্ষণিকভাবে বাংলার দরিদ্র কৃষকসমাজকে ঘিরে আবর্তিত হতো। তাঁর বদ্ধমূল ধারণা ছিল, দরিদ্র কৃষকসমাজের অবস্থার উন্নতি না হলে এ দেশে কোনো দিনই মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে না। সে কারণেই তিনি ভারতীয় কংগ্রেস কিংবা মুসলিম লীগের রাজনীতি ছেড়ে শেষ পর্যন্ত গঠন করেছিলেন কৃষক-প্রজা পার্টি। নিখিল বঙ্গ প্রজা (টেন্যান্টস) সমিতিকেই তিনি রূপান্তর করেছিলেন কৃষক-প্রজা পার্টি হিসেবে। এরও বেশ পরে এটিকে আবার নাম পরিবর্তন করেছিলেন কৃষক-শ্রমিক পার্টি হিসেবে।  ব্রিটিশরাজ ১৯৩৫ সালে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন চালু করে ১৯৩৭ সালেই প্রথম সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করলে বাংলার কৃষকসমাজের দীর্ঘদিনের দাবি ও স্বার্থ আদায়ের জন্য হক সাহেব তাঁর নবগঠিত কৃষক-প্রজা পার্টিকে নিয়ে মাঠে নামেন। এ সময় তিনি কৃষকের স্বার্থে ব্যাপক ভূমি সংস্কার ও জমিদারদের প্রভাব কমিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। তা ছাড়া গ্রামগঞ্জে উচ্চ সুদে অর্থ লগ্নিকারকদের অমানবিক শোষণ থেকে দরিদ্র ঋণগ্রস্ত কৃষককুলকে বাঁচানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন হক সাহেব। সেসব কারণেই ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত ভারতীয় প্রাদেশিক নির্বাচনে তাঁর নবগঠিত দলটি একাই ৩৫টি আসন লাভ করেছিল। সেই নির্বাচনে বেঙ্গল কংগ্রেস ও বেঙ্গল প্রাদেশিক মুসলিম লীগের পরই স্থান পেয়েছিল হক সাহেবের কৃষক-প্রজা পার্টি। তা ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে তিনি নিজে ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় একজন বাঙালি নেতা। ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর একটি দলীয় রাজনৈতিক কারণে কংগ্রেস সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে অস্বীকার করলে শেরেবাংলা বেঙ্গল প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সঙ্গে মিলিত হয়ে সরকার গঠন করেন। তাতে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন যুক্ত বাংলার প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। তাঁর মন্ত্রিসভায় অন্যদের মধ্যে ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দীন, খাজা হাবিব উল্লাহ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও নবাব মোশাররফ হোসেন।

ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই তিনি প্রশাসনিক ও আইনি অধিকারবলে কৃষকদের ঋণের বোঝা লাঘব করার জন্য ব্যবস্থা নেন। তিনি বেঙ্গল কৃষিঋণ আইন ১৯৩৮ প্রণয়ন করেন। এ ছাড়া সমগ্র বাংলায় তিনি ঋণ সালিসি বোর্ড গঠন করেছিলেন। অর্থ লগ্নিকারকদের ব্যাপারেও তিনি একটি নির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করেন। এর সঙ্গে আরেকটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল বেঙ্গল প্রজা (টেন্যাসিস) সংশোধিত আইন ১৯৩৮। এসব আইনের কারণে কৃষকের অর্থনৈতিক অবস্থায় যথেষ্ট উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছিল। এ ছাড়া রায়তের ওপর জমিদারদের সেলামি নেওয়ার বিষয়টিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে সারা বাংলায় কৃষককুলে হক সাহেবের সরকারের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল। সে কারণে ১৯৪১ সালে গঠিত দ্বিতীয় সম্মিলিত সরকারেও শেরেবাংলা মুসলিম লীগ ছাড়া অন্যদের সমর্থন লাভে সমর্থ হয়েছিলেন। সে সময় হিন্দু মহাসভা প্রধান শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি শেরেবাংলার মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। এ ছাড়া নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু গঠিত ফরোয়ার্ড ব্লকও হক সাহেবের সম্মিলিত সরকারে যোগ দিয়েছিল। শেরেবাংলা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ একজন রাজনীতিক। তিনি হিন্দু-মুসলিম-নির্বিশেষে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায় ও স্বার্থ উদ্ধারের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন।

আবুল কাশেম ফজলুল হক পরিচ্ছন্ন রাজনীতি ছাড়া কখনোই অর্থবিত্ত কিংবা পদ-পদবির ধার ধারেননি। তিনি ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন নামকরা খেতাব এবং এমনকি নাইটহুডও (উপাধি) হাসিমুখে ফিরিয়ে দিয়েছেন। শুধু একটি খেতাব—‘শেরেবাংলা’, এটির প্রতি তাঁর অনুরাগ পরিলক্ষিত হয়েছিল। এই উপাধি অনেকটা বাংলার জনগণেরই দেওয়া। এটি কোনো সরকার তাঁর নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে প্রদান করেনি। ফজলুল হক কলকাতা নগরীর মেয়র (১৯৩৫) থেকে শুরু করে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রীর (দুইবার) পদ পর্যন্ত অনেক দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে কখনো কোনো গণবিরোধী ভূমিকা তাঁকে পালন করতে দেখা যায়নি। তিনি একজন আইনজীবী, আইন প্রণেতা ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অত্যন্ত সুনাম, যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। সে কারণে বিংশ শতাব্দীর একজন সফল রাজনীতিক হিসেবে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারত এবং পরে স্বাধীন পাকিস্তানে তিনি তাঁর যোগ্যতার ছাপ রাখতে পেরেছিলেন। তিনি ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পর পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী এবং পরে গভর্নর হওয়া ছাড়াও কেন্দ্রীয় সরকারের (পাকিস্তান) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ভারত (কলকাতা) থেকে স্বাধীনতার পর পূর্ব পাকিস্তানে এসেই তিনি অ্যাডভোকেট জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত। এ ছাড়া বাংলা প্রদেশে দিল্লির সরাসরি শাসনের সময় (প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের আগে) তিনি শিক্ষামন্ত্রী হিসেবেও কাজ করেছেন। কলকাতা হাইকোর্টের সঙ্গে একজন আইনজীবী হিসেবে ফজলুল হক প্রায় ৪০ বছর জড়িত ছিলেন।

স্বাধীনতার পর, অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের শেষের দিকে ঢাকায় ফিরে এসেছিলেন ফজলুল হক। তবে এসেই পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রের রাজনীতির সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি। তাই ১৯৫২ সাল, অর্থাৎ ভাষা আন্দোলনের আগ পর্যন্ত ঢাকার উচ্চ আদালতের আঙিনার বাইরে বিশেষ একটা যাননি। তবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন হক সাহেব। সেই পথ ধরেই আসে ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন। আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মুসলিম লীগ সরকারের পতনের জন্য হাত মেলান শেরেবাংলা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন বয়সে অনেক তরুণ, তবে সাংগঠনিক কাজে অত্যন্ত তৎপর। আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, গণতন্ত্রী দল ও নেজামে ইসলামকে নিয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্বে ছিলেন তিন নেতা—শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই নেতারা পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের কবর রচনা করেছিলেন। শেরেবাংলা নিজে পরাজিত করেছিলেন তাঁর আজন্ম প্রতিদ্বন্দ্বী স্যার খাজা নাজিমুদ্দীনকে।

১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ৮৯ বছর বয়সে জনপ্রিয় রাজনীতিক, আইন প্রণেতা ও রাষ্ট্রনায়ক এ কে ফজলুল হক ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকার হাইকোর্টের পশ্চিম প্রান্তে ‘তিন নেতার’ কবরের একটিতে চিরশয্যায় শায়িত আছেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। শেরেবাংলার স্মৃতি আমাদের জাতীয় জীবনে চিরজীবী হয়ে থাকুক।


মন্তব্য