kalerkantho

বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ

আহমদ রফিক
কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ভাষাসংগ্রামী ছাত্রছাত্রীদের ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রস্তুতি। ছবি : অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম

ভারত ভেঙে পাকিস্তান হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়েনি। এর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট সময় বিচারে বেশ দীর্ঘ, ঘটনা বিচারে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানি আমলের রাজনীতি ও তার পরিণামের আলোচনায় পূর্বপরিস্থিতির ধারাবাহিক চরিত্র সূত্রাকারে হলেও উল্লেখের দাবি রাখে। তবে তা নতুন কিছু নয়, বরং বহু আলোচিত, মূলত ইতিহাসের সত্য হিসেবে, সেই সঙ্গে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সত্য হিসেবে।

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন প্রায় দুই শ বছরের স্থায়িত্ব পেয়েছিল একাধিক কারণে। এর মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণ বহিরাগত ইংরেজ বণিকের চাতুর্য, সাম্রাজ্যস্পৃহা, স্থানীয় অনৈক্য ও বিদেশি বণিকের প্রতি রাজসিক উদারতা, আর ইংরেজ শাসনের দ্বিমুখী নীতি—‘ভাগ করো এবং শাসন করো’। এই বিভাজন ভারতের, বিশেষত বঙ্গের দুই প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায় হিন্দু-মুসলমানকে ঘিরে। শেষোক্ত কারণটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তাদের ধর্মাচরণগত ও সামাজিক-অর্থনৈতিক বিভেদ বিবেচনায়। এ ক্ষেত্রে বঙ্গের ভূমিকা সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটেও বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। ভোটের রাজনীতি বিচারে এই সত্য অনস্বীকার্য যে ভারত ভাগ ও পাকিস্তানের অভ্যুদয়ে বাঙালি মুসলমানের মতামতই প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৪৫-৪৬-এর নির্বাচন তার প্রমাণ।

তবে এর তাত্ত্বিক রাজনীতির দিকটি ছিল সর্বভারতীয় চরিত্রের।  এখানেও বিভাজননীতির গুরুত্ব সর্বাধিক। যেমন একদিকে হিন্দুপ্রধান কংগ্রেস রাজনীতিকে দুর্বল করতে শাসকশ্রেণির মদদে ১৯০৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ নামের রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠা, তেমনি অন্যদিকে শাসন সংস্কারের নামে একাধিক পর্বে হিন্দু-মুসলমানের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচন প্রথা প্রবর্তন, সব শেষে ১৯৩৫ সালে ভারত শাসনে ‘সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ’ (কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড) ব্যবস্থা প্রচলন। দুই সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক পথের যাত্রা এভাবে পৃথক করে দেয় ইংরেজ শাসকশ্রেণি।

বিভেদ ও বিভাজনে সাম্প্রদায়িক সংঘাত যেমন জ্বালানি যোগ করেছে দুই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিভেদ ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে, তেমনি তাতে বরাবর বাতাস দিয়েছে শাসকশ্রেণির কূটচাতুর্য। এতে উভয় সম্প্রদায়ের রক্ষণশীলতা যতটা দায়ী, ততটাই দায়ী তাদের সংগঠনগত রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা, যাকে বলে বিচক্ষণতা ও রাজনৈতিক ঔদার্যের অভাব। এ ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং বৃহত্তর সংগঠন হিসেবে জাতীয় কংগ্রেসের দায়িত্ব ও ভূমিকা অধিক, কথাটি বোধ হয় অযৌক্তিক নয়।

এমন এক অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারত ভাগ ও ভারতীয় মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে প্রস্তাব গ্রহণ ছিল দেশভাগের জন্য কফিন তৈরির আয়োজন। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে এই প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়, পরবর্তী সময়ে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামে পরিচিতি লাভ করে। গোটা বিষয়টিই ঘটে তৎকালীন মুসলিম লীগ সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চিন্তাভাবনা ও নেতৃত্বে। তবে বিস্ময়কর যে লাহোর মঞ্চে এই প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় বাংলায় সেক্যুলার মুসলিম রাজনীতির প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত এ কে ফজলুল হককে দিয়ে।

মূল লাহোর প্রস্তাবে ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে দুটি স্বতন্ত্র স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে এই প্রস্তাবের রাজনৈতিক চরিত্র ছিল সম্প্রদায়বাদী। এতে বলা হয় এবং পরবর্তীকালে ব্যাপকভাবে প্রচারও করা হয় যে হিন্দু ও মুসলমান দুই ভিন্ন জাতি হিসেবে তাদের সর্ববিধ স্বার্থ ভিন্ন। তাই সংখ্যালঘু মুসলমানদের জন্য দরকার ভিন্ন রাজ্য। সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দাবি অর্থাৎ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে জাতি হিসেবে বিবেচনা যুক্তিসংগত নয়। জাতি ও সম্প্রদায় দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

১৯৪০ থেকে ১৯৪৭-এর আগস্ট। পাকিস্তানের প্রস্তাব এবং তা বাস্তবায়নের মধ্যবর্তী সাত বছরে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটেছে। যেমন—আগস্ট আন্দোলন (১৯৪২), বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে রাজনৈতিক পালাবদল, সারা ভারত শ্রমিক ধর্মঘট, আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার উপলক্ষে প্রবল শাসকবিরোধী আন্দোলন, হায়দরাবাদের তেলেঙ্গানায় কৃষক বিদ্রোহ এবং বঙ্গে ভাগচাষিদের তেভাগা আন্দোলন, করাচি ও বোম্বাই (মুম্বাই) নৌঘাঁটিতে ভারতীয় নাবিকদের বিদ্রোহ এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচারে সংলাপ-সমঝোতার মাধ্যমে ইংরেজ শাসকদের ক্ষমতা হস্তান্তর করে ভারত ত্যাগের পরিকল্পনা (ক্রিপস মিশন, ক্যাবিনেট মিশন)।

তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ব্যাপক সাম্প্রদায়িক প্রচার ও সম্প্রদায়বাদী বিভেদ-চেতনা, যা সংস্কৃতি অঙ্গনকেও দূষিত ও দ্বিভাজিত করে, বিশেষ করে বঙ্গে। সেই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নিয়মিত দুষ্টক্ষত ভারতজুড়ে। তবে দেশভাগের কফিনে গুরুত্বপূর্ণ শেষ পেরেকটি পোঁতা হয় জিন্নাহ ঘোষিত ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ উপলক্ষে ১৫ আগস্ট (১৯৪৬) কলকাতায় সংকুচিত বীভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রক্তস্রোতে। নিশ্চিত হয় ভারত ভাগ-বঙ্গ-পাঞ্জাব ভাগ।

 

দুই

সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে পাকিস্তান নামের স্বতন্ত্র ভুবনে বাঙালি মুসলমান মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল এবং তা শ্রেণি-নির্বিশেষে সবাই। ১৯৪৫-৪৬ সালের ভোটে এর প্রতিফলন ঘটে প্রধানত বঙ্গে, অংশত ভারতীয় পশ্চিমাঞ্চলে। শেষ পর্যন্ত লীগ-কংগ্রেসের দ্বন্দ্বে এবং শাসক ইংরেজের খেলায় উল্লিখিত দেশ বিভাগ বাস্তবায়িত হয় ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্টে। যথাক্রমে ১৪ ও ১৫ আগস্ট (১৯৪৭) জন্ম নেয় দুই ডমিনিয়ন পাকিস্তান ও ভারত। কিন্তু তাদের লেজ বাঁধা থাকে কমনওয়েলথের গোয়ালে এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক তহবিলে।

বড় আশা ছিল বাঙালি মুসলমানের পাকিস্তানকে ঘিরে। আশা সর্বমাত্রিক ও সর্বশ্রেণির উন্নতির। শিক্ষিত পেশাজীবী শ্রেণি থেকে কৃষক ও মেহনতি মানুষের। প্রচণ্ড বিশ্বাস ও আস্থা ছিল ত্রাতা হিসেবে তাদের ‘কায়েদে আজম’ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও ‘কায়েদে মিল্লাত’ লিয়াকত আলী খানের ওপর। প্রথমজন পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল, দ্বিতীয়জন প্রথম প্রধানমন্ত্রী। সর্বোপরি আস্থা মুসলিম লীগ সংগঠনের ওপর, যে সংগঠন পাকিস্তান গড়ার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।

একটি কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার যে মুসলিম লীগের সূচিত পাকিস্তান আন্দোলনের পেছনে সাম্প্রদায়িক বিভেদের প্রচার জিন্নাহর পরিকল্পনামাফিক ব্যাপক আকার ধারণ করে। পাকিস্তান চিহ্নিত হয় ভারতীয় মুসলমান তো বটেই, বিশেষভাবে বাঙালি মুসলমানের মুক্তির উপায় হিসেবে। দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রভাব সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে সংহত করে তোলে। মানসিক সাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটে যথেষ্ট মাত্রায়। একের পর এক সংঘটিত ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলো তার প্রমাণ। এককথায় পাল্টা হিসেবে বলা যায়, এদিক থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ও ব্যতিক্রম ছিল না। তবে ব্যতিক্রম প্রগতিবাদীরা।

পাকিস্তান নিয়ে এমন এক মুগ্ধতার মধ্যে বাঙালি স্বার্থের বিরুদ্ধে একের পর এক আঘাত পড়তে থাকে পাকিস্তান গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই এবং তা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু বৈষম্যের শুরু পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা পর্ব থেকে।

এক জাতি গঠনের চিন্তাটা ছিল ইউটোপিয়ান, স্বাপ্নিক। ভারত থেকে পাকিস্তানে আসা উর্দুভাষী সামন্ত-ভূস্বামী ও শিক্ষিত এলিট শ্রেণিই ছিল পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রধান শক্তি। ছিল প্রধানত পাঞ্জাবের স্থানীয় সামন্ত ভূস্বামী ও সামরিক-বেসামরিক এলিট শ্রেণির একচেটিয়া প্রভাব। সব মিলিয়ে ছিল পাঞ্জাবি এলিট শ্রেণির সর্বাধিক প্রভাব। সঙ্গে তাল মেলায় সিন্ধুর ভূস্বামী শ্রেণি।

এরাই পাকিস্তানি রাজনীতি অর্থাৎ কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। তাই গোটা পাকিস্তানি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পূর্ববঙ্গীয় বাঙালির সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও সিন্ধুর রাজধানী করাচি, জিন্নাহর প্রিয় শহর করাচি হয়ে ওঠে পাকিস্তানের প্রথম রাজধানী। পরে অবশ্য যথাক্রমে পিন্ডি ও ইসলামাবাদ। স্বদেশি-বিদেশি অর্থে যে উন্নয়ন পরিকল্পনা, তাতে প্রাধান্য পায় পাঞ্জাব ও সিন্ধু। করাচি সমুদ্রবন্দর উন্নয়নে খরচ হয় লাখো কোটি টাকা। শিল্প-কারখানার বিকাশ ঘটে একই ধারায় প্রধানত পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে।

এভাবে শিল্প-বাণিজ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে ও উন্নয়নে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য এতটা বাড়তে থাকে যে বাঙালি শিক্ষিত সমাজ আর চুপ করে থাকতে পারে না। শুরু হয় এক পাকিস্তানে দুই অর্থনীতি নিয়ে সমালোচনা, বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম এক পাকিস্তানের দুই অংশে দুই রকম, শিক্ষিত শ্রেণির সংখ্যাগত ভিন্নতা, বৈষম্য বেসামরিক উচ্চপদ ও মান-মর্যাদায়। এর নিকৃষ্ট রূপ সামরিক বিভাগে, বাঙালি সেখানে অবাঞ্ছিত, ব্রাত্য।

এ সবই কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ও সরকার পরিচালনায় একদেশদর্শিতার পরিণাম। অবাঙালি প্রভাবশালী রাজনীতির লক্ষ্য ছিল পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানকে নানা খাতে শোষণ-শাসনের মাধ্যমে নব্য উপনিবেশে পরিণত করা। উপনিবেশ মানেই তো সম্পদ শোষণ ও পাচার। সেই সম্পদ যেমন অর্থনৈতিক, তেমনি সাংস্কৃতিক খাতে। শেষোক্ত দিকটির লক্ষ্য বাঙালিকে একটি হীনম্মন্যতাদুষ্ট, প্রভুনির্ভর জাতিতে পরিণত করা।

পূর্ববঙ্গ ও সেখানকার বাঙালি জনগোষ্ঠীকে শাসন-শোষণই তাদের রাজনীতির শেষ কথা ছিল না। বাঙালির ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জাতিসত্তাকে অবজ্ঞা ও বিজাতীয় জ্ঞান করাও ছিল পাকিস্তানি রাজনীতির বিশেষ চরিত্র। বাঙালি মুসলমানকে আধাহিন্দু বিবেচনা করে মন্তব্য করার ধৃষ্টতাও দেখা গেছে দু-একজন শীর্ষস্থানীয় মুসলিম লীগ নেতার। এসবেও উপনিবেশবাদী, সুবিধাভোগী শাসকশ্রেণির চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে।

 

তিন

পাকিস্তানি আমলের এ রাজনৈতিক শাসন চরিত্র শুরু থেকেই সর্বাধিক গুরুত্বে প্রকাশ পেয়েছিল পূর্ববঙ্গীয় বাঙালির ভাষা ও ভাষিক সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে। উপলক্ষ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। পাকিস্তানের জন্মের কয়েক মাস আগে থেকেই মুসলিম লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কেউ কেউ তাঁদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে বলতে থাকেন যে হবু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।

এই দাবির পেছনে যুক্তি ছিল না। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের কোনো একটিরও জাতিভিত্তিক মাতৃভাষা উর্দু নয়; বরং ছিল পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচ ও পশতু। উর্দু ছিল ভারত থেকে আগতদের ভাষা। তবে সেখানে উর্দুর সাধারণ জলচল ছিল। উর্দুকে কেন্দ্র করে ভাষিক পাকিস্তানি জাতীয়তা গড়ে তোলার গূঢ় উদ্দেশ্য কেন্দ্রীয় শাসকশ্রেণির ছিল। তাই উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ও আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে উর্দু সংস্কৃতির মাধ্যমে বাংলা ও বাঙালিকে পিছে ঠেলে দেওয়ার এই চক্রান্তের পেছনে ছিল দূরপ্রসারী রাজনৈতিক চিন্তা।

সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার একটি প্রদেশ ও জনগোষ্ঠীকে পিছে হটানোর এই চেষ্টা একক রাষ্ট্রভাষা উর্দুর মাধ্যমে শুরু হয় ১৯৪৭-এর শেষ দিক থেকে। কিন্তু পাকিস্তান নিয়ে মুগ্ধতার মধ্যেই ঢাকার সচেতন ছাত্রসমাজ এবং কিছুসংখ্যক শিক্ষিত বাঙালি এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাজপথে নামে। বাদ যায় না বেশ কিছুসংখ্যক তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারী। শুরুটা ১৯৪৭-এর নভেম্বরে সদ্য মুদ্রিত এনভেলাপ, পোস্টকার্ড, মানি অর্ডার ফরম ইত্যাদিতে ইংরেজি-উর্দুর পাশে বাংলা না থাকা। ঘটনাটি ছোট, কিন্তু অতীব তাত্পর্যপূর্ণ।

শাসকশ্রেণির বাংলাবিরোধী ভূমিকার ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮-এর মার্চ থেকে সংগঠিত পূর্ববঙ্গে রাষ্ট্রভাষা বাংলার অধিকার ভাষা আন্দোলনের জন্ম। এর সফল সার্বিক প্রকাশ ১৯৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আন্দোলনে। সে আন্দোলনের দুটি প্রতীক শহীদ দিবস ও শহীদ মিনার এখনো বাঙালির জাতীয় জীবনে তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে, বিশেষ করে সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে।

একুশের সাংস্কৃতিক সুফল সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিবাদী চেতনার, যা প্রকাশ পেয়েছে সৃজনশীল-মননশীল সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চায়, বিশেষ করে সাহিত্য সম্মেলনগুলোতে। যেখানে লোকসংস্কৃতিরও পরিশীলিত, আধুনিক প্রকাশ যেমন লোকসংগীতে, তেমনি কবিগানে ও সমাজসচেতন মঞ্চনাটকে। মাঠে-ময়দানে ছড়িয়ে পড়েছে চল্লিশের গণসংগীতের উত্তরাধিকার চর্চায়।

আর রাজনীতিতে এর প্রকাশ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চরিত্র নিয়ে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক একুশ দফার নির্বাচনী বিজয়ে। শিকড় কাটা পড়ে পূর্ববঙ্গে মুসলিম লীগ দলের দুঃশাসনের। একুশ দফা যেমন জাতীয়তাবাদী চেতনার বীজতলা তৈরি করেছে, তেমনি জনগণের মৌলিক দাবিগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। এসেছে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি। এভাবে পঞ্চাশের দশকের মধ্যপ্রহর থেকে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী চেতনার পায়ে হাঁটা শুরু।

এর অন্তর্নিহিত একটি দুর্বল বিন্দু ছিল, স্বশাসনের দাবি তুলতে গিয়ে মুসলিম লীগ বিরোধী সব কটি দলই ঘুরেফিরে মূল লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করেছে, যে প্রস্তাবের ভিত্তি ছিল সাম্প্রদায়িক চেতনার দ্বিজাতি তত্ত্ব, নেপথ্যে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদ। স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের দাবি জানাতে গিয়ে রাজনৈতিক নেতারা এই স্ববিরোধিতার কথা ভাবেননি। ‘ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব’ নিয়ে তাঁরা অন্ধ মুগ্ধতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

 

চার

পঞ্চাশের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক বীজ এই দশকের শেষ দিক থেকে অঙ্কুরিত ও বর্ধিত হতে থাকে। উদাহরণ ১৯৫৭ সালে ভাসানীর পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য দাবিদাওয়াভিত্তিক ঘোষণায় পশ্চিম পাকিস্তানকে ঐতিহাসিক ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানানো, যা নিয়ে তুমুল হট্টগোল। বিশেষ করে ডানপন্থী মহলে।

এই ধারায় দুই পাকিস্তান, দুই অর্থনীতির রাজনৈতিক প্রকাশ ঘটিয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি তখনো বঙ্গবন্ধু হননি। বিদেশে তাঁর নেতা সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ প্রধান হওয়ার সুযোগে দলীয় রাজনীতিতে তাঁর হাত ধরেই বাঙালি জাতীয়তাবাদী আদর্শের বিকাশ এবং পূর্ববঙ্গের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার প্রকাশ ঐতিহাসিক ছয় দফার ভিত্তিতে।

প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে প্রধানত পূর্ববঙ্গীয় ন্যায্য দাবিদাওয়ার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তা মাথায় রেখে ছয় দফা রচিত। নেপথ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতাদর্শ। কিন্তু আশ্চর্য যে এই জাতীয়তাবাদী ছয় দফার বয়ানেও শুরুতে রয়েছে লাহোর প্রস্তাবের আদর্শিক উল্লেখ। এ রাজনৈতিক চেতনা কেন জানি না, কি জাতীয়তাবাদী, কি শোষিত জনতার উদ্ধারের দাবিতে (ভাসানী) আদর্শিক প্রভাব রেখেছে।

তবে কি পঞ্চাশে, কি ষাটের দশকে সমাজতন্ত্রী রাজনীতি এই প্রভাব থেকে মুক্ত। এদের সংস্কৃতিচর্চা সম্পর্কেও একই কথা খাটে। যেমন ষাটের দশকে বিভাজিত রুশি ধারায়, তেমনি চীনা ধারায়। এদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শক্তির সর্বাধিক প্রকাশ যেমন ষাটের দশকের গণসংগীতে, তেমনি উনসত্তরের গণ-আন্দোলনে। তবে এই জোয়ারি আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সর্বোচ্চ প্রকাশ আগরতলা মামলা বিরোধী ব্যাপক গণ-আন্দোলনে। এই সময়ে বাঙালি শিক্ষিত শ্রেণি, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী শ্রেণি ব্যাপক হারে শ্রেণিস্বার্থের টানে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে শরিক। আওয়ামী লীগ তখন এদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন।

এই জোয়ারের টানে ১৯৭০-এর নির্বাচনে কেন্দ্রে ও প্রদেশে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়। অন্যদিকে ভাসানীর ন্যাপসহ বামপন্থীরা জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের মূল দাবিটি প্রধান ইস্যু হিসেবে গ্রহণ না করায় শিক্ষিত শ্রেণিসহ জনসমর্থন জাতীয়তাবাদের পক্ষে দাঁড়ায়; এমনকি কোনো কোনো শ্রমিক সংস্থাও সেদিকে।

পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় রাজনীতির বাঙালি বিরূপতা ও বিরোধিতা জাতীয়তাবাদী জোয়ারের মূল কারণ। শেখ সাহেব হয়ে ওঠেন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল ঘটক এবং সত্তরে এসে জনবন্দিত রাজনৈতিক নেতা।

এভাবেই সাতচল্লিশ-উত্তর সময়ে পাকিস্তানি রাজনীতির হঠকারী ও সম্প্রদায়বাদী রাজনীতির বিপরীতে ভাষার অধিকার ও জাতীয় স্বার্থনির্ভর রাজনীতির দাবিতে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চর্চা বিকশিত হয়েছে। এর প্রধান শক্তি প্রকাশ পেয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আবেগধৃত আদর্শিক প্রেরণায়। সত্তর-একাত্তর ওই ধারারই পরিণাম, যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে প্রতিফলিত। শেষ কথা হচ্ছে, পূর্ববঙ্গে পঞ্চাশের দশক যদি প্রগতিপ্রধান ভাষিক সংস্কৃতি-রাজনীতির দশক হয়ে থাকে, ষাটের দশক একই চরিত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দশক।


মন্তব্য