kalerkantho


মুক্তি ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ

নূহ-উল-আলম লেনিন
রাজনীতিবিদ

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মুক্তি ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ

১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তির পর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু। ছবি : সংগ্রহ

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে জাতিগত ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝতে পারেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হলেও পূর্ব পাকিস্তান এক নতুন ঔপনিবেশিক শাসনের কবলে পড়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালিদের জাতীয় স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা সম্ভব নয়। বাঙালিরা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজেদের রাজনৈতিক দল গঠনে উদ্যোগী হয়।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে নঈমউদ্দিন আহমদকে আহ্বায়ক করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করা হয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রথম ধর্মঘটে শেখ মুজিবুর রহমানসহ তৎকালীন ছাত্রনেতারা গ্রেপ্তার হন। এরপর ১৯ মার্চ পূর্ব বাংলা সফরে এসে জিন্নাহর ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণা। ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ ছাত্রনেতাদের এই ঘোষণার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ। এ বছর ১১ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিবুর রহমানকে আবার আটক করা হয়। ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্বদানের অভিযোগে ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। এপ্রিলে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করার কারণে শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হন।

১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার কে এম দাশ লেনে অবস্থিত হুমায়ূন সাহেবের বাসভবন রোজ গার্ডেন প্রাঙ্গণে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলনে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দলের আত্মপ্রকাশ। প্রথম সভাপতি মওলানা ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। জেলে থাকা অবস্থায় এই দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। জুন মাসের শেষের দিকে মুক্তি লাভ করেন। ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের পূর্ব পাকিস্তান আগমন উপলক্ষ করে আওয়ামী মুসলিম লীগ ঢাকায় দুর্ভিক্ষবিরোধী মিছিল বের করে। এই মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হন। এ সময় তাঁর দুই বছর জেল হয়েছিল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে ১৯৫১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে কারাবন্দি শেখ মুজিব নানা নির্দেশনা দেন। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সিদ্ধান্তে ছাত্রদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয়। রফিক, শফিক, বরকত, সালাম, জব্বার পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। ১৯৫২ সালের ডিসেম্বরে লাহোরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিনিধিদের যৌথ সম্মেলন। সম্মেলনে শর্ত সাপেক্ষে দুই দল একীভূত হয়ে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। ১৯৫৩ সালের জুলাই মাসে ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৫৩ সালের নভেম্বরে ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে যুক্তফ্রন্টে অংশগ্রহণ ও ২১ দফা অনুমোদন নিয়ে আলোচনা হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ২১ দফা প্রণয়ন করা হয় এবং নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পায় যুক্তফ্রন্ট। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। ৩ এপ্রিল আওয়ামী লীগকে বাদ রেখে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ। ১৫ মে আওয়ামী লীগসহ যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত। আদমজীতে দাঙ্গার অজুহাতে ৩০ মে ৯২(ক) ধারা জারি এবং যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করা হয়।

১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আত্মপ্রকাশ করে। পরের বছরের কাউন্সিল অধিবেশনে যথাসময়ে সাধারণ নির্বাচনের দাবি জানানো হয়। ১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পূর্ব বাংলায় আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। ১১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের কেন্দ্রে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও রিপাবলিকান পার্টির কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন।

১৯৫৭ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারীতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে দলে প্রকাশ্য মতবিরোধ। কাগমারী সম্মেলনের পর ১৯৫৭ সালের মার্চ মাসে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। জুন মাসে ঢাকায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে ভাসানীর পদত্যাগপত্র নিয়ে আলোচনা হয়; কিন্তু গৃহীত হয় না। দল থেকে পদত্যাগ করলেও কাউন্সিলে ভাসানীকেই সভাপতি করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

১৯৫৭ সালের ২৫-২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত গণতান্ত্রিক কনভেনশনে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন। ১৯৫৭ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানে মার্শাল ল জারি করে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়। শেখ মুজিবসহ নেতারা গ্রেপ্তার হন। ২৭ অক্টোবর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জাকে অপসারণ করে ক্ষমতায় আসেন জেনারেল আইয়ুব খান।

১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে গোপনে সহকর্মীদের কাছে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন শেখ মুজিব। ষাটের দশকের শুরুতেই বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে গঠিত হয় ছাত্রলীগ নেতাদের গোপন নিউক্লিয়াস। এতে শেখ মুজিব অনুমোদন দেন। পাকিস্তান সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনের উদ্যোগ নেন সংস্কৃতিকর্মী ও বুদ্ধিজীবীরা। রবীন্দ্রসংগীত প্রচারে সরকারের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ সংঘটিত হয়।

১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। কারাবন্দি সোহরাওয়ার্দী মুক্তি পান এবং সামরিক শাসন শিথিল হয়। ওই বছর সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক দলগুলোকে আলাদাভাবে পুনরুজ্জীবিত না করে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) নামে একটি ঐক্যবদ্ধ জোট গড়ে ওঠে। ১৯৬৩ সালে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে সোহরাওয়ার্দীর আকস্মিক মৃত্যুর পর এনডিএফ কার্যকারিতা হারায়।

১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় দলকে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত হয়। পুনরুজ্জীবিত দলে মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ ও শেখ মুজিবুর রহমান যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে বহাল থাকেন।

এনডিএফপন্থী নেতারা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন।

১৯৬৪ সালের মার্চে ঢাকার ইডেন হোটেল প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ ও শেখ মুজিবুর রহমান যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে বহাল থাকেন।

১৯৬৪ সালে শিক্ষা কমিশন রিপোর্টবিরোধী আন্দোলন শুরু হয় ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখা দেয়। দাঙ্গার বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ব্যাপক গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। ইত্তেফাকে ১৬ জানুয়ারি ১৯৬৪ ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ এবং দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে একই শিরোনামে একটি লিফলেট বিতরণ করা হয়, যা সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে ব্যাপক মানবিক আবেদন সৃষ্টি করে।

১৯৬৪ সালে বুনিয়াদি গণতন্ত্রের নামে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে গঠিত হয় কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি বা সম্মিলিত বিরোধী দল ‘কপ’। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহকে ‘কপ’-এর প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়। প্রতিনিধি পদে নির্বাচনে ‘কপ’ প্রার্থীরা জয়লাভ করলেও প্রেসিডেন্ট পদে পরোক্ষ নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহর পরাজয় ঘটে। এরপর সর্বজনীন ভোটাধিকারের দাবি জোরদার হয়।

১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তি সনদ ছয় দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন। ছয় দফার বিরোধিতা করে মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন। ওই বছরের মার্চে ইডেন হোটেলে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে ছয় দফা অনুমোদিত হয়। এ কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক হন।

১৯৬৭ সালের আগস্টে ঢাকায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে নতুন কমিটি গঠিত হয়। ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব গং’ তথা আগরতলা মামলা দায়ের করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগার থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে স্থানান্তর করে বিচার শুরু হয়। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রাম পরিষদ ছয় দফাভিত্তিক ১১ দফা দাবিনামা প্রণয়ন করে। সংগ্রাম পরিষদে ছিল ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), এনএসএফের একাংশ ও ডাকসু।

১৯৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারি ১১ দফা দাবিতে ছাত্র গণ-আন্দোলনের শুরু। ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থান হয়। গণজাগরণের ব্যাপকতায় ২২ ফেব্রুয়ারি নিঃশর্তভাবে কারাগার থেকে শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি লাভ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ আইয়ুবের পতনের পর ইয়াহিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করে পুনরায় মার্শাল ল জারি করেন। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সামরিক শাসনের মধ্যেই পাকিস্তানে নির্বাচনের ঘোষণা আসে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু নির্বাচনকে ছয় দফার পক্ষে ‘গণভোট’ বলে ঘোষণা করেন। ওই বছরের জুনে দলের কাউন্সিলে আসন্ন সাধারণ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয় এবং ছয় দফা আদায়ের লক্ষ্যে নির্বাচনকে একটি গণভোট হিসেবে গ্রহণ করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানান। কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদে নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ৩১০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ২৮৭টি। সংরক্ষিত ১০টি মহিলা আসনও পায় আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচিত। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি জনসভায় তিনি আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথবাক্য পাঠ করান।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া কর্তৃক অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদ সভা স্থগিত ঘোষণা। প্রতিবাদে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’—এই এক দফা দাবিতে উত্তাল বাংলাদেশ। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ওড়ানো হয় লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টনের জনসভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি জাতীয় সংগীত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ৫ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সারা বাংলাদেশে পাঁচ দিনব্যাপী হরতাল পালন।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এ ভাষণেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির দিকনির্দেশনা ও অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন। এদিনের পর থেকে পূর্ব বাংলার প্রশাসনিক কাঠামোর নেতৃত্ব মূলত চলে যায় বঙ্গবন্ধুর হাতে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রশাসন হাতে নিয়ে অসহযোগ আন্দোলন পরিচালনার জন্য ৩৫টি নির্দেশ জারি করেন। তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে নির্দেশাবলি প্রণয়ন করেন এবং বঙ্গবন্ধু তা অনুমোদন করেন।

১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পূর্ব বাংলার সর্বত্র স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়। এমনকি এই সময় ঢাকায় অবস্থানকারী পশ্চিমা নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো যে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে (বর্তমানে শেরাটন) উঠেছিলেন, তার শীর্ষদেশেও উড়তে থাকে বাংলাদেশের পতাকা। ঢাকায় অবস্থিত বিদেশি দূতাবাসের ভবনের শীর্ষেও নতুন পতাকা উড়তে দেখা যায়। এদিন ভোর ৫টায় বিদ্রোহী বাংলার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ হাতে তাঁর বাসভবনে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে দেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনা ভেঙে যায়। ওই দিন রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের শুরু। সারা দেশে বাঙালির প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনাও সেই সঙ্গে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে গ্রেপ্তার হওয়ার আগমুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ইপিআরের ওয়্যারলেস মারফত গোপনে ওই ঘোষণা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধের নির্দেশ দেন। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এক সভায় মিলিত হয়ে বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননকে ‘মুজিবনগর’ (অস্থায়ী রাজধানী) ঘোষণা করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়। জাতীয় সংগীত হিসেবে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ প্রণয়ন করে ও ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে অনুমোদন দেয়। গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী, বঙ্গবন্ধু সর্বাধিনায়ক।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর ৯৩ হাজার সদস্য আত্মসমর্পণ করে। ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান এবং তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে সূচিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় এসে মুজিবনগর সরকারের সদস্যরা দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন স্বদেশভূমিতে ফিরে আসেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। ১৯৭২ সালের ৭ ও ৮ এপ্রিল স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে সর্বসম্মতিক্রমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন জিল্লুর রহমান।

এভাবেই প্রতিষ্ঠার পর আওয়ামী লীগ একটি গণমানুষের দলে পরিণত হয় এবং বাঙালিকে বহু শতাব্দীর পরাধীনতা থেকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল, আর এখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গঠনে কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি।


মন্তব্য