kalerkantho


ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ধারা

রাশেদ খান মেনন
মন্ত্রী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ধারা

ছয় দফার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে শহর-বন্দর গ্রাম-গঞ্জ—সর্বত্র

Urdu and only urdu shall be the state language of Pakistan—মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর এই উক্তির যারা সর্বপ্রথম প্রতিবাদ করেছিল তারাই হচ্ছে এ দেশের ছাত্রসমাজ। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই রক্তস্নাত পললভূমিতে যারা মুক্তির বীজ বুনেছে, যারা উচ্চারণ করেছে ‘জীবন যেখানে দ্রোহের প্রতিশব্দ, মৃত্যুই সেখানে শেষ কথা নয়’, তারাই এ দেশের ছাত্রসমাজ। এ দেশের ছাত্রসমাজ জাতির সুস্থ বিবেকের প্রতিনিধি। শোষকের হাত থেকে শোষিতের অধিকার ছিনিয়ে আনার হাতিয়ার। বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনে ছাত্রসমাজ জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছে, পথের দিশা দেখিয়েছে।

যদিও উনিশ শতকের গোড়া থেকেই আধুনিক বাঙালির যাত্রা শুরু, তার পরও উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ছাত্ররা একটি শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে। তবে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ, বিশেষ করে নবোত্থিত বাংলার মুসলমান ছাত্রসমাজের জন্য ১৯২১ সাল একটি সোনার হরফে লেখা নাম। এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। আমাদের জাতিসত্তার জাগরণ ও সংস্কৃতির বিকাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা বিশাল, বিরাট ও ব্যাপক। এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পূর্ব বাংলা অঞ্চলের মুসলমান ছাত্রদের জন্য নয়, এ অঞ্চলের সমগ্র মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজের জন্যও তা একটি নতুন পথ নির্মাণ করে। সেদিন হয়তো কেউ ভাবতে পারেনি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজই একদিন বাঙালির স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রধান ভূমিকা পালন করবে। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে লালন, পালন ও ধারণের মাধ্যমে আমাদের মেধা, মনন, বোধ ও রুচির মহত্তম বিকাশ ঘটে ষাটের দশকে। মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্য থেকে উঠে আসা শিল্পী-সাহিত্যিক-পটুয়া ও সমালোচকরা পূর্ব বাংলার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে তাদের ভাবনার শৈল্পিক ও নান্দনিক প্রকাশ ঘটায় এবং এই প্রকাশের ধারাই ধীরে ধীরে কলকাতার পরিবর্তে ঢাকাকে বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতি বিকাশ ও চর্চার কেন্দ্রে পরিণত করে।

১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ছাত্র-আন্দোলনের সফল পরিণতি আসায় ছাত্রদের ঘরে ফিরে যাওয়ার কথা থাকলেও তারা যেতে পারেনি। ১৯৭৫ সালের পর দু-দুটি সামরিক শাসন ছাত্রদের আবার রাজপথে ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

এ কথা সত্য, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে ছাত্ররাজনীতির রূপ পাল্টেছে। ২০১৭ সালের ছাত্ররাজনীতি এবং ষাট-সত্তরের দশকের ছাত্ররাজনীতি এক নয়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের পর ছাত্ররাজনীতি এবং বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতার রাজনীতি একেবারেই ভিন্ন। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে ছাত্রসংখ্যা এবং বর্তমানের ছাত্রসংখ্যার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে একটা আকাঙ্ক্ষা কাজ করত—দেশকে স্বাধীন করতে হবে। কারণ এর মাধ্যমে বাংলাদেশের আলাদা একটা ভূখণ্ড হবে এবং বাংলাদেশ তার আত্মপরিচয় হিসেবে জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা পাবে। সর্বোপরি পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। ১৯৭১ সালে ছাত্ররা যুদ্ধ করেছে শোষণ, নিপীড়ন চালানো বর্বর একটি শক্তির বিরুদ্ধে। কিন্তু বর্তমানে ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের অভ্যন্তরে আরেকটি ছাত্রসংগঠন। এ সময়ে এসে আমরা লক্ষ করছি, বাংলাদেশের ভেতর এমন কিছু সংগঠন রয়েছে, যারা বাঙালি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে না এবং যারা ধারণ করে তাদের দমন করার চেষ্টা করে। বিশেষ করে পঁচাত্তরের রক্তাক্ত পটপরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসকচক্রের পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষাঙ্গনগুলোতে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এরা প্রতিনিয়ত মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির ওপর এবং প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

এখন বিশ্বায়নের যুগ। পুঁজিবাদ এই সময়ে বিশ্বমানবতার ওপর চেপে বসেছে। আর পুঁজি ভোগবাদকে প্রবলভাবে উসকে দিচ্ছে। এই ভোগবাদের নেশায় প্রায় সবাই যেখানে আচ্ছন্ন, ছাত্রসমাজও তার নীতি, আদর্শ, মূল্যবোধ হারিয়ে অন্ধগলিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ, যেখানে ন্যায় আর ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষ হবে মানুষের জন্য, দেশ হবে সবার জন্য।

আমরা আবার ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ধারা প্রতিষ্ঠার একটি চারাগাছ রোপণ করতে চাই, যে চারাগাছ আগামী দিনে বিশাল মহীরুহে পরিণত হবে। ফুল ফুটবে তার ডালে ডালে। পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হবে তার প্রাঙ্গণ।


মন্তব্য