kalerkantho


কৃষক সংগ্রাম : দমন-পীড়ন ও বর্বরতার দলিল

দীপংকর গৌতম
সাংবাদিক ও গবেষক

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কৃষক সংগ্রাম : দমন-পীড়ন ও বর্বরতার দলিল

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস এক দিনের নয়। বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত মানুষের গণসংগ্রামের একটি সংঘবদ্ধ রূপ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম। তেভাগা, টঙ্ক, নানকার, নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ—কোনো ঘটনাই মুক্তিসংগ্রামের থেকে ভিন্ন নয়। আমাদের এই অঞ্চল যেহেতু ভূমিকেন্দ্রিক সভ্যতার ফসল, সে জন্য এ অঞ্চলে কৃষিকাজ সবচেয়ে বেশির ভাগ মানুষের পেশায় পরিণত হয়। এ দেশের অর্থনীতিও হয়ে ওঠে কৃষিভিত্তিক। কৃষিজীবী দেশে কৃষকই হয়ে ওঠে প্রাণ। ফলে যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে বা দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য কৃষকরাই সংগ্রামে অগ্রগামী ছিল। ফলে ভারতবর্ষের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস অত্যন্ত উজ্জ্বল। কৃষকদের এসব আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের দল কমিউনিস্ট পার্টি।

১৯৪৬ সালে শুরু হয় তেভাগা আন্দোলন। ওই সময়কালে অবিভক্ত বাংলার ১৯টি জেলায় ৭০ লাখ কৃষক এই আন্দোলনে যোগ দেয়। শতাধিক কৃষক নেতা ও কর্মী শহীদ হন এই আন্দোলনে। তেভাগা নামে খ্যাত এই আন্দোলন তদানীন্তন বাংলার গ্রামাঞ্চলকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

দেশভাগের পর তেভাগার ইতি টানলেও বিভিন্ন অঞ্চলে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের নেতৃত্বে শুরু হয় কৃষক বিদ্রোহ। পূর্ব বাংলায় কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বে ভিন্ন ধারার কৃষক আন্দোলন গড়ে ওঠে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ তথা নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে টঙ্কপ্রথা চলে আসছিল। টঙ্ক বলতে খাজনা বোঝানো হতো। কৃষকদের উৎপাদিত শস্যের ওপর এই টঙ্ক দিতে হতো। কিন্তু এর পরিমাণ ছিল প্রচলিত খাজনার কয়েক গুণের বেশি, যা দরিদ্র কৃষকদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। শোষিত কৃষকরা এই প্রথার বিরুদ্ধে কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বে একত্র হয়। ১৯৩৭ সালের নভেম্বর মাসে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এখান থেকেই মূলত আন্দোলনের শুরু। এরপর কমরেড মণি সিংহ ছয় দফা দাবিনামা প্রস্তুত করেন। ১৯৪৬ সালের দিকে টঙ্কপ্রথা বিলোপের আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে জমিদারি প্রথা বিলোপ আন্দোলনও শুরু হয়ে যায়। তখন আন্দোলন ব্যাপক রূপ ধারণ করে। আন্দোলনকারীদের প্রতিহত করতে পুলিশ স্থানে স্থানে ক্যাম্প বসায়। ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু করে পুলিশ। এই আন্দোলনের আরেক নেতা ললিত সরকারের বাড়িতে আগুন দেয়। ওই বছরেরই ৩১ ডিসেম্বর দুর্গাপুরের বহেরাদলী গ্রামে পুলিশ ব্যাপক তল্লাশি চালায়। এরপর বিখ্যাত হাজং নেত্রী কুমুদিনী হাজংকে আটক করে পুলিশ। তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় রশিমণি হাজং তাঁকে ছাড়াতে গেলে পুলিশ গুলি করে। শহীদ হন হাজংমাতা রশিমণি, সুরেন্দ্র হাজংসহ অনেক আন্দোলনকর্মী। ক্ষিপ্ত কৃষক-জনতা পুলিশ বাহিনীর দিকে বল্লম ছুড়তে থাকে। এতে দুজন পুলিশ নিহত হয়। টঙ্ক দেওয়া বন্ধ করে দেয় সব কৃষক। অত্যাচারের খড়্গ নেমে আসে কৃষকদের ওপর। বিপ্লবী মঙ্গল সরকারের নেতৃত্বে একটি মিছিলে পুলিশ গুলি করলে ১৯ জন বিপ্লবী কৃষক নিহত হয়। গ্রেপ্তার হয় অনেকে। এর মধ্যে অশ্বমণি ও ভদ্রমণি হাজংয়ের ১২ বছর করে জেল হয়।

১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন সুসং দুর্গাপুর এলাকায় আসেন ভয়াবহ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য। কিন্তু টঙ্কপ্রথা তুলে না নেওয়ায় এই আন্দোলন চলতে থাকে। এই লড়াইয়ে ৬০ জন কৃষক যোদ্ধা শহীদ হয়। অবশেষে পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ পাস হলে এই নির্মম প্রথার বিলোপ সাধিত হয়। অন্যদিকে  বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে কমরেড অজয় ভট্টাচার্য ও বারীন দত্তের নেতৃত্বে ‘নানকার’ আন্দোলন ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

নানকার আন্দোলনের সংগঠক কমরেড অজয় ভট্টাচার্যের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সে সময় বৃহত্তর সিলেটের ৩০ লাখ জনসংখ্যার ১০ শতাংশ ছিল নানকার এবং নানকার প্রথা মূলত বাংলাদেশের উত্তর থেকে পূর্বাঞ্চলে অর্থাৎ বৃহত্তর সিলেটে চালু ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতির সহযোগিতায় বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বড়লেখা, কুলাউড়া, বালাগঞ্জ, ধর্মপাশা থানায় নানকার আন্দোলন গড়ে ওঠে। আন্দোলন থামাতে সরকার দমন-পীড়ন শুরু করে ব্যাপকভাবে। আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়।

১৯৪৯ সালের ১৭ আগস্ট ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শ্রাবণী সংক্রান্তি।  ১৮ আগস্ট ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের ইপিআর ও জমিদারের পেটোয়া বাহিনী আক্রমণ করে সানেশ্বরে। উলুউরি গ্রামে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন নানকার আন্দোলনের নেত্রী অপর্ণা পাল, সুষমা দে, অসিতা পাল ও সুরথ পাল। তাঁদের নেতৃত্বে উলুউরি ও সানেশ্বর গ্রামের কৃষক নারী-পুরুষ সুনাই নদীর তীরে সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হয় সরকারি ও জমিদার বাহিনীর সঙ্গে। কিন্তু ইপিআরের আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে লাঠিসোঁটা নিয়ে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি কৃষকরা। ঘটনাস্থলেই ঝরে পড়ে পাঁচটি তাজা প্রাণ। এ ঘটনার পর আন্দোলন উত্তাল হয় সারা দেশে। অবশেষে ১৯৫০ সালে প্রবল আন্দোলনের মুখে জমিদারি প্রথা বাতিল এবং নানকার প্রথা রদ করে কৃষকদের জমির মালিকানা দিতে বাধ্য হয় সরকার।

কৃষকদের এই ঘটনার পর যে আন্দোলনটি সারা দেশের কৃষকদের ব্যাপকভাবে আন্দোলিত করে সেটি হলো নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ। তেভাগা শেষে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় ও জঙ্গি কৃষক বিদ্রোহ, যার নেতৃত্বে ছিলেন কৃষকদের রানিমা ইলা মিত্র ও রমেন মিত্র। আন্দোলনের মূল জায়গা ছিল নাচোল থানার চণ্ডীপুর গ্রাম। এই গ্রামেই সাঁওতাল নেতা মাতলা সরদারের বাড়ি। নাচোল কৃষক বিদ্রোহে মাতলা সরদার একটি উল্লেখযোগ্য নাম। মাতলা সরদারের সঙ্গে কমরেড রমেন মিত্রের ছিল বিশেষ সম্পর্ক। এ অঞ্চলের ভাগচাষিরা, বিশেষ করে সাঁওতাল কৃষকরা রমেন ও তাঁর সহকর্মীদের একান্ত আপনজন হিসেবে ভাবত।

রমেন মিত্রের স্ত্রী ছিলেন ইলা মিত্র। তিনি শুধু রমেন মিত্রের জীবনসঙ্গিনী ছিলেন না, ছিলেন একই আদর্শে দীক্ষিত, একই সংগ্রামের সাথি। এই আন্দোলন যখন শুরু হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল ২৪। পাশাপাশি এক শিশুপুত্রের জননী। জমিদারবাড়ির সংসার ও পুত্রের মায়া কাটিয়ে আন্দোলনের প্রয়োজনে তিনি চলে আসেন সরলপ্রাণ সাঁওতাল চাষিদের মাঝে। ইলা মিত্রকে পেয়ে সাঁওতাল কৃষকরা নতুন শক্তিতে শক্তিমান হয়ে ওঠে। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ—সবাই তাঁকে ‘রানিমা’ নামেই ডাকত। তিনি অল্প সময়ের মধ্যে সাঁওতাল ভাষা আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন। সাঁওতাল কৃষকরা নিজের মাতৃভাষায় তাঁর সঙ্গে মন খুলে কথা বলত। ফলে ইলা মিত্র হয়ে ওঠেন সাঁওতাল কৃষকদের নয়নমণি। এই আন্দোলনের পেছনে ছিল ভূমিহারা চাষিদের বহুদিনের সঞ্চিত বিক্ষোভ এবং জমির জন্য অদম্য ক্ষুধা, যে জমি তাদের হাত থেকে বিভিন্ন সময়ে ছলে-বলে-কৌশলে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। একপর্যায়ে নাচোল ও নবাবগঞ্জ থানার বেশ কিছু জায়গায় তেভাগার বিধান কার্যকর হয় এবং কৃষক সমিতির আওতায় চলে আসে।

চণ্ডীপুর ছিল কৃষক সমিতির মূল কেন্দ্র। সেখানে প্রতিদিন চার-পাঁচ শ কৃষক পাহারারত ছিল। সেখানকার রিপোর্ট পেয়ে সরকারি মহল হকচকিত হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা জানত না কৃষকদের সংঘবদ্ধ শক্তির ক্ষিপ্রতা কতটুকু। সেখানকার অবস্থা সামাল দিতে একজন দারোগা ও পাঁচজন সশস্ত্র পুলিশকে পাঠানো হলো। প্রত্যেকের হাতে ছিল রাইফেল। এই সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীকে আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসতে দেখে সাঁওতাল কৃষকরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। কৌশলে প্রথমে কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে পথ করে দিল তারা। পুলিশের দল পেছন ফিরে দেখল, তাদের চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে সাঁওতাল কৃষকরা। ফলে শুরু হয় সংঘর্ষ। পুলিশ মরিয়া হয়ে গুলি করতে লাগল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। সেই সংঘর্ষে পাঁচজন পুলিশ আর একজন দারোগার সবাই মারা পড়ল। এই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বতন সরকারি মহল তত্পর আর সক্রিয় হয়ে উঠল। বহু সশস্ত্র সৈন্য নাচোল থেকে আট মাইল দূরে আমনুরা স্টেশনে এসে পৌঁছে। তারা দলে দলে বিভক্ত হয়ে গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিতে লাগল, যাকে সামনে পেল তাকেই মারল। সাঁওতাল কৃষকরা বর্শা, বল্লম ও তীর-ধনুক দিয়ে তাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। সৈন্যদের আক্রমণটা ছিল বিশেষভাবে সাঁওতাল কৃষকদের ওপর। চণ্ডীপুর গ্রামের ওপর তাদের আক্রোশ ছিল সবচেয়ে বেশি। সৈন্যদের অতর্কিত আক্রমণে খুব কম লোকই সেখান থেকে পালিয়ে আসতে পারল।

সে সময় কমরেড রমেন আর ইলা মিত্র বিভিন্ন এলাকায় ছিলেন। কয়েক শ জঙ্গি সাঁওতালসহ রমেন আর মাতলা সরদার নিরাপদে সীমান্তের ওপাশে চলে গেলেন। কিন্তু ধরা পড়তে হলো ইলা মিত্রকে। ইলা মিত্র তিন-চার শ সাঁওতাল নিয়ে সীমান্ত পার হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে পথ দেখিয়ে নেওয়ার মতো লোক ছিল না। ফলে ভুল পথে চলতে চলতে রহনপুর স্টেশনের কাছে এসে ইলা মিত্রকে ধরা পড়তে হলো। ইলা মিত্রের বিরুদ্ধে আগেই হুলিয়া জারি করা ছিল। ফলে তাঁর ওপর চালানো হয় নিদারুণ অত্যাচার। সেই অত্যাচারের ভয়াবহতা আজও মানুষকে শিহরিত করে। অত্যাচার আর নির্যাতনের মধ্যেও আদর্শের প্রতি অবিচল ছিলেন ইলা মিত্র। এর পরের ইতিহাস হচ্ছে জেল-জুলুম আর বিচারের প্রহসন। বহু সাঁওতাল ও অন্যান্য কৃষক বন্দি হয়। অনেকেই পালিয়ে যায় ভারতে। তবে কৃষক আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করেছিল।

পাকিস্তান সরকারের কৃষক দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাসংগ্রাম গতিশীল হয়েছিল। এবং প্রতিটি কৃষক আন্দোলন ছিল স্বাধীনতাসংগ্রামের একেকটি অধ্যায়। কৃষক আন্দোলনের কারণে জমিদারি শাসন উঠে গেছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু কৃষকের সেই আত্মদানের ইতিহাসে ধীরে ধীরে ধুলা পড়ে যাচ্ছে। কৃষকের সংকট আগের মতোই আছে, শুধু নেতা নেই।

এ সময় পার্টি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিসংখ্যান দেখলে গা শিউরে ওঠে। কমিউনিস্টদের ওপর কী প্রচণ্ড নির্যাতন চালিয়েছিল পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি! ১৩ হাজার পার্টি সদস্যের মাত্র ১৫০ জন এ দেশে টিকতে পেরেছিলেন! পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হাতে খুন হয়েছিলেন শত শত পার্টি সদস্য, কর্মী ও সমর্থক। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপরা ওয়ার্ডে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল সাতজন প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতাকে। আহত হয়েছিলেন শতাধিক। ইতিহাসে উপেক্ষিত থেকেছে ত্যাগী কমিউনিস্টরা। শ্রমিক-কৃষকরা আজও মুক্তি পায়নি। কবে পাবে, কেউ কি জানে?


মন্তব্য