kalerkantho


ত্রিকালদর্শী রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদ

বিলু কবীর
প্রাবন্ধিক ও গবেষক

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ত্রিকালদর্শী রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদ

অঙ্কন : বিপ্লব

বইয়ের অছিলায় তার লেখককে অথবা লেখকের অছিলায় তাঁর বইকে নিয়ে মূল্যায়নধর্মী কোনো গদ্য লেখার ক্ষেত্রে বাংলা লেখক এবং গদ্যের একটা আটপৌরে ঢং আছে, বিশেষ করে লেখাটা যদি হয় লেখককে আলোকিত করার উদ্দেশ্যপ্রসূত। এমনকি বাঙালির লেখ্য অভ্যাসে রচনার সেই ঢংটি প্রায় অলঙ্ঘনীয়। যেমন আমরা ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’-এর অছিলা ধরে তার লেখক আবুল মনসুর আহমদকে (১৮৯৮-১৯৭৯) এখানে মূল্যায়ন করতে প্রয়াস পাচ্ছি। এটা করতে গিয়ে কখনো লেখক ‘পঞ্চাশ বছর’, কখনো তাঁর অন্যান্য বই আর পারিপার্শ্বিক কিংবা বলা যেতে পারে সম্পূরক অনুষঙ্গ হিসেবে না এসেই পারবে না ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ এবং সেই সঙ্গে অবশ্যই তত্সংশ্লিষ্ট সরকার, রাজনীতি, নেতা-নেত্রী।

আবুল মনসুর আহমদ ১৮৯৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তারিখে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের ধানিখোলা গ্রামে এক সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন ১৯১৭ সালে, নাসিরাবাদ মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালয় থেকে। ঢাকা জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯১৯ সালে আইএ পাস করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন এবং বিএ বা ব্যাচেলর অব আর্টস পাস করেন। তারপর কলকাতা রিপন ল কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে বিএল বা ব্যাচেলর অব ল উত্তীর্ণ হন। তিনি কলকাতায় আইন পড়তে এসে সাংবাদিকতায় যোগদান করেন। এই তিনি ঝুঁকলেন লেখালেখির দিকে। ১৯২৯ সালে তিনি ময়মনসিংহ জজকোর্টে যোগদান করেন এবং টানা ৯ বছর আইন পেশায় নিবেদিত থাকেন, মানে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত। এই ১৯৩৮ সালেই দৈনিক কৃষক পত্রিকায় সম্পাদকের পদে নিযুক্ত হন।

১৯২০ সালে তিনি কলকাতা রিপন আইন মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং বিভিন্ন কাগজে কাজ করার অভিজ্ঞতায় উজ্জ্বল হয়ে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ফজলুল হকের নবযুগ এবং সোহরাওয়ার্দীর দৈনিক ইত্তেহাদে সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন, খেয়াল করতে হবে যে এই সময় বা কালপর্বটি কখন। এই ২৮ বছর সময়টি দক্ষিণ এশিয়ার তথা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি শাসিত অবিভক্ত ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন বিষয়ে চেতনার চাষ ও প্রস্তুতিপর্ব মাত্র জনে জনে সংক্রমিত করার বা হওয়ার জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সময় এটি। অতএব বলাই বাহুল্য, সংবাদপত্রে কাজ করা মানুষ, আইন শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষ হিসেবে আবুল মনসুর আহমদ যে ইত্যবসরে অধিকার, স্বাধীনতা, ব্রিটিশ খেদাও এবং এতত্সংক্রান্ত স্বরাজ আন্দোলনের একজন বুঝমান কর্মী বা কুশীলব হয়ে উঠেছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এসব মনন নির্মাণের ঢের আগে ১৯২৩ সালে তিনি বিশেষ করে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের (১৮৭০-১৯২৫) স্বরাজ দলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে নিজেকে আলোকিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরপরই তিনি কংগ্রেসের আন্দোলনে যোগদান করেন, যখন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭-১৯৪৫) ওই আন্দোলনকে পরিচালনা করছিলেন। চুয়াল্লিশে এসে রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে সুস্পষ্ট ও সক্রিয় ভূমিকায় নিজেকে নিবেদন করেন। তিনি কৃষক প্রজা পার্টির অন্যতম নেতা, মুসলিম লীগের প্রচার সম্পাদক এবং আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা নেতা বটেন। সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন পাঁচ বছর, ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত। এ কথা তো পাঠকের জানা যে ১৯৫৪ সালে তিনি যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছিলেন এবং ভোটে জিতে পূর্ববঙ্গ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কর্মসূচি, যাকে বলা যেতে পারে আসলে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার, সেই ২১ দফার অন্যতম প্রণেতা ছিলেন আলোচ্য মনসুর আহমদ। পরের বছর, মানে ১৯৫৫ সালে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গ সদস্যদের ভোটে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। শুধু তা-ই নয়, যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিপরিষদে (১৯৫৪) তিনি ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, আর ১৯৫৩ সালে আতাউর রহমানের (১৯০৭-১৯৯১) নেতৃত্বে পরিচালিত মন্ত্রিসভার শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী। এই মন্ত্রিত্বের কাল ছিল এক বছর, ১৯৫৬-১৯৫৭ পর্যন্ত। এখনকার মতো সে আমলেও রাজনীতিতে নোংরামি, শঠতা, দুর্নীতিদোষ—এসব ছিল তো বটেই। কম আর বেশি, তফাত মনে হয় এটুকুই। এই মন্ত্রিত্বের পরে আবুল মনসুর আহমদ রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ করেন। তিনি ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত চার বছর কারারুদ্ধ ছিলেন।

কারামুক্তির পর রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি পরলোকগমন করেছিলেন ১৯৭৯ সালে আর জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৯৮ সালে। অর্থাৎ তাঁর বয়স যখন ঠিক ৬৪ বছর, তখন তিনি রাজনৈতিক জীবন থেকে সরে আসেন। এর পরও ১৭ বছর জীবিত ছিলেন। ৮১ বছরের জীবনে তিনি ৫১ বছরই রাজনীতির জন্য সময় দিয়েছেন। এই রাজনৈতিক জীবন ও সাংবাদিকজীবনে তিনি নানা দেশি-বিদেশি নেতার সংস্পর্শে এসেছেন। লেখালেখির প্রয়োজনে তো বটেই, রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ ও যথাযথ ভূমিকা পালনের স্বার্থে তাঁকে রাজনীতিবিষয়ক লেখাপড়ায় যেমন মনোনিবেশী থাকতে হয়েছে, তেমনি অতীত ও চলতি রাজনৈতিক ইস্যু, বিষয়, বক্তব্য, ধারাকে গভীরভাবে পরিবীক্ষণ ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে হয়েছে। ওই সময় রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক বাস্তবতার অগ্রাহ্য যোগ্যতা ছিল না। ফলে লক্ষ করা যায়, ভারত স্বাধীনতার নামে ভারত বিভাগ হয়েছিল এবং সেই বিভাজন কোনো প্রশাসনিক বা উন্নত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ ছিল না। হিন্দু ও মুসলিম অধ্যুষিত তথাকথিত ‘আধুনিক’ চেতনার নোংরা অগণমুখী প্রেক্ষাপটকে মূল ধরে জমি ভাগের মতো করে ভারত এবং হাজারাধিক মাইলের দূরত্বে দুই টুকরো জমি মিলিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছিল আজব পাকিস্তান।

তিনি যখন রাজনীতি থেকে অবসর নেন, তখন প্রাতিষ্ঠানিক বা দাপ্তরিকভাবে আর কোনো রাজনৈতিক দলের তত্পরতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না সত্য, কিন্তু তাই বলে সমাজের নানা উত্থান-পতন, মুভমেন্ট ইত্যাদিতে সামাজিক প্রভাবক হিসেবে তাঁর সংলগ্নতা, তা সেটা পরোক্ষভাবেই হোক আর প্রত্যক্ষভাবেই হোক, সত্যিকার অর্থে বন্ধ ছিল না। এই সময় ইত্তেফাক, দ্য পিপলস ও অবজারভার পত্রিকা যদ্দুর সম্ভব এক অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি চর্চার আবহ নির্মাণে দায়িত্ব পালন করেছিল। কিন্তু ওই রকম সংস্কৃতির চর্চা বা নির্মাণের পরিবর্তে আবুল মনসুর আহমদ পূর্ববাংলার মুসলিম সংস্কৃতিকে স্বতন্ত্রভাবে তুলে ধরা ও চর্চা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। যাকে তিনি ‘পাক-বাংলার কালচার’ নামে অভিহিত করেন।

 

যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার ২১ দফার অন্যতম প্রণেতা ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ

 

এই লেখার প্রথম নিশানা ছিল আবুল মনসুর আহমদের ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইটিকে প্রতিপাদ্য করে লেখকের সমগ্রতাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে মূল্যায়ন করার প্রয়াস পাওয়া। কিন্তু কাজটি যত সোজা অনুমান করেছিলাম, বাস্তবে তত সোজা নয়। এর একাধিক কারণ রয়েছে। যেমন তাঁর নানামুখী জীবনকর্ম ও কর্মজীবন এত ব্যাপক যে একটি মোটামুটি আঁটসাঁট গদ্যে তাঁকে ধারণ করা সম্ভব নয়। তাঁর লেখালেখির বিস্তীর্ণ জগৎ, রাজনীতির বর্ণাঢ্য পৃথিবী, তাঁর ব্যক্তিযোগাযোগ সংগত কারণেই মহীরুহ সব নেতার সঙ্গে জাতিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংস্পর্শতা সব মিলিয়ে এক বিস্তীর্ণ জগৎ। তাঁর লেখালেখি শুধু তাঁর মূল্যবোধ অনুযায়ীই মানসম্পন্ন নয়, মানের পাশাপাশি পরিমাণের দিক দিয়েও কম নয়।

আমরা যদি এই বৃহৎ কলেবরের...‘পঞ্চাশ বছর’-এর দিকে লক্ষ করি, তহলে সহজেই অনুমান করা যাবে যে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কী ব্যাপক এবং গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা তাঁর নখদর্পণে ছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশ, পাকিস্তান, অবিভক্ত ভারত আমল এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অতীত ও পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বিষয়ে কী বিপুল ও চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। এবং এই অভিজ্ঞতার মেধাকে আরো শাণিত করতে দক্ষিণ এশিয়া তথা দক্ষিণ এশিয়াসংশ্লিষ্ট বৈশ্বিক প্রভাবক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বলয়কে তিনি তাঁর জ্ঞানের মধ্যে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বইটিতে মোট ৩০টি অধ্যায় এবং ১০টি উপ-অধ্যায়ে ব্যাপকভিত্তিক স্যোসিও-পলিটিক্যাল বিষয় স্পর্শিত হয়েছে। একদিকে যেমন সংজ্ঞায়নের ধাঁচে এসেছে আত্মমর্যাদাবোধ, সাম্প্রদায়িক চেতনা, খিলাফত, পল্লীসংগঠন, মুসলিম সংহতি ও প্রজাসংহতি, জমিদার, বাঙালি জাতীয়তা, ভারতীয় জাতীয়তা, কৃষক-প্রজা, রেনেসাঁ, ইংরেজ, মাইনরিটি, জতীয়করণ ধারণা, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, পাকিস্তান-জাতীয়তাবাদ, ভুট্টো-ইয়াহিয়ার ষড়যন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদির মতো বিষয়বস্তু। আবার বিশ্লেষণধর্মী আলোচনার জন্য উঠে এসেছে বিচিত্র এবং জাতিক স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও বড় বড় নেতার সাহচার্যসংক্রান্ত কথাবার্তা।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এবং তার জন্মপূর্বের দুই শাসক পর্বের যে পরাধীনকাল, সে বিষয়ে স্যোসিও-ইকোনো-পলিটিক্যাল প্রেক্ষাপটসহ জানতে-বুঝতে হলে এই বইটিকে পাঠ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া চলে না। এই বিবেচনায় অন্যান্য গুণাগুণসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক মননশীল গ্রন্থকার হিসেবে এই মানুষটিকে গুরুত্বের বাইরে রাখা যায় না।

 শেষে এসে আবুল মনসুর আহমদ বিষয়ে এ কথা বলা যায় যে শুধু স্মৃতিধর রাজনৈতিক মানুষ হিসেবেই নয়, তাঁর বহুমুখী লেখনীর মাধ্যমে তিনি আমাদের জাতীয় উত্থান-বাঁক-বিজয়-গৌরব-বেদনা ইত্যাদির যে প্রামাণ্যীকরণ ঘটিয়েছেন, তার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। তাঁর সব দৃষ্টিভঙ্গি বা মূল্যায়ন-বক্তব্যের সঙ্গে সবাইকে একমত হতেই হবে সেই দাবি অবশ্যই নয়; কিন্তু দাবি হচ্ছে, পঠন-পাঠনের মাধ্যমে তাঁকে জানা ও জানানোর দরকার এবং সেই সুযোগ থেকে আমরা যেন নিজেদের বঞ্চিত না করি।

 

 

 


মন্তব্য