kalerkantho

সোনার বাংলার ভাবনা

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন
সভাপতি, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

১২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সোনার বাংলার ভাবনা

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সদ্য স্বাধীন দেশে ফিরে এলেন বঙ্গবন্ধু। ছবি : সংগৃহীত

অত্যন্ত সম্ভাবনাপূর্ণ ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাস। জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও পুনরুত্থানের সূচনা নিশ্চিত হয় ৪৬ বছর আগে। তাই চলতি বছরটির তাৎপর্য বেশি।  কারণ অনেক, তবে যে অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য ১৯৬৬ সালের ছয় দফা এবং একাত্তরের ৭ই মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণায় জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’, তা বাস্তবায়নের লক্ষণ সুস্পষ্ট। ১৯৭২ সালে যে সামষ্টিক আয় ছিল ১ হাজার ৫০০ (মতান্তরে ৮০০) কোটি ডলার, তা এখন ২৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। জাতীয় বাজেটের পরিমাণ ৭৮৬ কোটি থেকে এখন চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকায়। রপ্তানির পরিমাণ সাত কোটি ডলার থেকে তিন হাজার ৬০০ কোটি ডলারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ছিল ৮১০ টাকা, এখন তা বৃদ্ধি পেয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার টাকায়। বছরে এক কোটি টন খাদ্যশস্য উৎপাদন দিয়ে শুরু করা বাংলাদেশে এখন উৎপাদিত হয় পৌনে চার কোটি টন। জাতিসংঘের এফএওর হিসাবে সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান দশম, সাড়ে পাঁচ কোটি টন। সুপেয় পানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ পৃথিবীতে চতুর্থ। গেল বছরের উৎপাদন  ৪১ লাখ টন, যা দেশটিকে এই খাতে স্বয়ম্ভর করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের সামগ্রিক আয়ের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি একমুখীভাবে বাড়ছে। ১৯৭২-৭৫ সময়ে ৪ শতাংশ (তার মধ্যে ১৯৭৪-৭৫ সালের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ শতাংশ), ১৯৭৬-৯০ সময়ে শতকরা সাড়ে তিন থেকে ৪ শতাংশ, নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ৫ শতাংশের ঊর্ধ্বে, ২০০১-০৮ সময়ে ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ আর ২০০৯ সাল থেকে একনাগাড়ে ৬ থেকে সাড়ে ৬, ৭ এবং সর্বশেষ সোয়া ৭ শতাংশ। তিনবার ছাড়া বার্ষিক মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে ওঠেনি। বর্তমানে বার্ষিক ৫ শতাংশের কিছু ওপরে। মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে ৪৩ (মতান্তরে ৪৭) থেকে ৭২ বছরে। শিশুমৃত্যুর হার প্রায় ২০০ থেকে ৩০-৩২। নারীর সার্বিক প্রজননক্ষমতা ৫ থেকে নেমেছে ২-এ। বার্ষিক জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার নেমেছে ৩.৩ থেকে ১.৫ শতাংশে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ ৩ থেকে এখন ৩৯ শতাংশ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতে, জেন্ডার প্যারিটি সূচক বাংলাদেশে এখন ৪৭, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ।

কী করে সম্ভব হলো এই সব দৃষ্টিনন্দন সফলতা অর্জন, কোন কোন ক্ষেত্রে নেতিবাচক ফলাফল আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, আগামী দিনে কোন দিকে কোন গতি কৌশলে অর্থনীতি পরিচালিত হলে ১৯৪১ সালে বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধিশালী দেশে উন্নীত হবে, কোন পথেই বা বাংলাদেশ দুই শতক পরে পৃথিবীর ২৩তম অর্থনীতি হয়ে ওঠার পথে তিনটি ছাড়া ইউরোপের দেশগুলো, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির পরিধি অতিক্রম করে যাবে, যে স্বপ্ন নিয়ে একাত্তরে যাত্রা শুরু, তার বাকি অংশ বাস্তবায়নে কোন কোন পথের কাঁটা দূর করতে হবে, তা-ও চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

পূর্ব বাংলার সুদিন ছিল—গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু, মুখে হাসি বুকে বল নিয়ে বাংলার মানুষ দুধে-ভাতে বাঙালি—সুখে-শান্তিতেই ছিল। তারপর তুর্কি, মোঙ্গল, মোগল, পাঠান, পালসেনস আর ইংরেজরা শাসন, শোষণ, নির্যাতন আর সম্পদ দেশান্তর করে পূর্ব বাংলাকে করে দেয় নিঃস্ব পশ্চাত্ভূমি। আর সবচেয়ে বিশ্রী ও ভয়ংকর রূপে শোষণ আর বঞ্চনা ও সম্পদ লুণ্ঠন করে নিয়ে যায় পাকিস্তানিরা তাদের ২৪ বছরের ঘৃণ্যতম শাসনামলে।

সৌভাগ্যের সূর্যকিরণ হয়ে এলেন মুকুটহীন সম্রাট সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিব। মানুষ বিশ্বাসে বুক বাঁধল, দিল অকুণ্ঠ হৃদয় উষ্ণ করা সমর্থন। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী গৌরবে উজ্জ্বল স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম—ত্রিশ লক্ষ নারী পুরুষ ছাত্র জনতা আর দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম—অনেক মহার্ঘ দিয়ে জয় করতে হলো বাংলার স্বাধীনতা একটি মহতী জনযুদ্ধের বিজয়মাল্যে।

বীরের বেশে দেশে ফিরেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুরু করলেন বাঙালির বেঁচে থাকার লড়াই থেকে কল্যাণ রাষ্ট্রে আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির ধারা। রাষ্ট্রপতির শাসন থেকে সংসদীয় গণতন্ত্র। সংবিধান, পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, শিক্ষানীতি, নারী পুনর্বাসন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্থাপন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালুকরণ, পলায়নপর পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত ব্যাংক, বীমা, শিল্প-কলকারখানা জাতীয় করতেই হলো জনকল্যাণের কথা ভেবে। পরিষ্কার করা হলো হীনম্মন্য পাকিস্তানিদের পুঁতে যাওয়া অসংখ্য মাইন, মেরামত করে চালু করা হলো বন্দর, রেল সেতু, কালভার্ট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জাতির পিতা আদায় করলেন জাতিসংঘের সদস্য পদ। শুরু হলো ‘সবার সাথে সখ্য, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ পররাষ্ট্রনীতি। কানাডা ও সুইডেন দিল নগদ বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চালু করার জন্য। রাশিয়ার সাহায্যে মাইন সাফ করা হয়, সূচনা করা হয় সার কারখানা। ভারত থেকে আসে খাদ্যশস্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, জিডিআর ব্যবস্থা নেয় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার। রাশিয়া দেয় মেধাবৃত্তি। ১৯৭৪ সালেই জাতির পিতা সমুদ্র রক্ষা আইন করলেন, জাতিসংঘকে জানালেন সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারত ও বার্মার সঙ্গে বিরোধের কথা। বার্মার সঙ্গে শুরু করা হয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সন্ধান। অনুরূপ কথাবার্তা শুরু হওয়ার কথা ছিল ভারতের সঙ্গে স্থলসীমা নির্ধারণের চুক্তির পরপরই। তেল-গ্যাসসহ প্রাকৃতিক সম্পদ জাতীয় করলেন বঙ্গবন্ধু। জনসাধারণের তাত্ক্ষণিকভাবে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে গণখাতে স্থাপিত হয় ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ—টিসিবি। এর মাধ্যমে চাল, ডাল, তেল, চিনি, কেরোসিন আমদানি করে সারা দেশে সুলভ মূল্যে বিক্রি করার মানসে সৃষ্টি করা হয় কনজ্যুমারস সাপ্লাইজ করপোরেশন—কসকর। শুরু হয় রেশনিং ব্যবস্থা। সেভাবে অন্যান্য যুদ্ধ-পরবর্তী স্বাধীন দেশের মতো অনাহারে মৃত্যু থেকে দেশবাসীকে বাঁচাতে সক্ষম হন জাতির পিতা।

ছয় দফা ও ৭ই মার্চের ঘোষণার পথ ধরেই প্রণীত হয় প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা।

দারিদ্র্য নিরসন, বৈষম্য রোধ, কিষান-কিষানির পুনর্জাগরণ, গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পসহ শিল্পায়ন, আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষায় একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা, পরীক্ষামূলকভাবে পরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি নীতি ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে সব শিক্ষককে জাতীয় করা হলো। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হলো, বৈষম্য দূর করতে হবে, কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে, শুরু করা হবে উৎপাদন ও বিপণন সমবায় ব্যবস্থা, প্রয়োজনবোধে মূল্য সমর্থন দিয়ে কৃষিপণ্যের দামে ন্যায্যতা আনা হবে। সুস্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয় যে প্রয়োজনে বিত্তবানদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায় করে কম ভাগ্যবানদের চিকিৎসা ও শিক্ষাসেবার ব্যবস্থা করতে হবে। গরিবের আয়ে যেন তুলনামূলকভাবে বেশি প্রবৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হয়।

বাংলাদেশের দৃষ্টিনন্দন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও হৃদয় উষ্ণ করা সামাজিক অগ্রগতির মাঝেও ভুরু কুঁচকে দেওয়ার মতো অপূর্ণতা রয়েছে। ধনী-গরিবের বৈষম্য বাড়ছে, যদিও বিগত দিনের দরিদ্রদের তুলনায় আজকের দিনে সবচেয়ে কম ভাগ্যবানরা অনেক ভালো আছেন। পঁচাত্তরের ঘৃণ্যতম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাঙালি জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হারায়। ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ তথা বাঙালির আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির পথকে বিনাশ করে সাময়িকভাবে সফল হয় বটে। জাতি তার কাঙ্ক্ষিত পথ ফিরে পেয়েছে। তবে চলার পথে বাজার অর্থনীতির ধারা চালু করতেই হয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তবতায়। এর একটা স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে বেড়েছে বৈষম্য—ব্যক্তিক ও আঞ্চলিক। একে রোধ করার জন্য গ্রোথ উইথ ইকুইটি নীতি, যা ১৯৯৬-২০০১ সালে সফলভাবে প্রচলিত করা হয়, তা আবারও জোরেশোরে শুরু করতে হবে। প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের মডেল পরিবর্তন করা জরুরি। শিল্পায়ন-কর্মসংস্থান-আয়রোজগার সৃষ্টি-বৈষম্য নিরসন হতে পারে একটি উপযুক্ত উন্নয়ন কৌশল। বাড়বে বৃহৎ শিল্পের পরিধি, কিন্তু গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে যাবে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মধ্যম শিল্প—এতে কোনো বাড়তি প্রযুক্তি লাগে না, দরকার হয় অল্প পুঁজি, দেশীয় কাঁচামাল; প্রকল্পের উৎপাদন পেতে লাগে খুবই কম সময়, এর কর্মসংস্থানক্ষমতা অসীম। শিল্পে বস্ত্র উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিলে আমদানি প্রতিস্থাপন যেমন সম্ভব হবে, তেমনি তৈরি পোশাক শিল্পে বাড়বে দক্ষতা, বাঁচবে সময়—রুলস অব অরিজিন বেড়ে যাবে এক থেকে চারে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার জরুরি—নতুন উন্নয়ন প্রবৃদ্ধি মডেল হবে গ্রোথ উইথ ইকুইটির নবরূপ, সেখানে দেশীয় জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা আনবে ব্যাপক শিক্ষা সংস্কার। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ, সমাপ্তিকরণ ও মূল্যায়ন। পরিকল্পনা কমিশনকে শক্তিমান করা এর একটি বিকল্প হতে পারে। সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে এক লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র আয়তন, ২০০ নটিক্যাল মাইলের সমুদ্র অধিকার আর মহিসোপান পাহারা দেওয়া হচ্ছে—এই বিশাল সম্ভাবনাময় ব্লু ইকোনমির পরিকল্পনা ও সুফল ঘরে তোলার আরো কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ আজ উচ্চ ভাগ্যের দোরগোড়ায়। পদ্মা সেতু দৃশ্যমান, রেলের ব্রডগেজীকরণ ও ডাবল লাইনিং অচিরেই হবে, ২০১৮ সালেই ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের হাতছানি, খোদ দি ইকোনমিস্টের মতে, মাথাপিছু আয়সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অন্যতম শক্তি নেতৃত্বের জাদু জনবন্ধু শেখ হাসিনার পরীক্ষিত উদ্ভাবনী সাহসী ও সামনে থেকে এগিয়ে নেওয়ার বিশ্বস্বীকৃত ক্যারিসমা প্রযুক্তিনির্ভর সোনার বাংলা গড়ে তোলার সমীকরণে বিশাল উপাদান।


মন্তব্য