kalerkantho


জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—সমীক্ষা ও সম্ভাবনা

মো. আনোয়ার হোসেন
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

১২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—সমীক্ষা ও সম্ভাবনা

কর্নেল তাহের

১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর স্বাধীনতা লাভের মাত্র সাড়ে ৯ মাসের মাথায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে চ্যালেঞ্জ করে নতুন দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) আত্মপ্রকাশ নিয়ে পরদিন ১ নভেম্বর ১৯৭২-এ।

ইত্তেফাক সংবাদ করেছে, “গতকাল (মঙ্গলবার) ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়। মেজর এম এ জলিল ও ডাকসুর প্রাক্তন সহসভাপতি আ স ম  আবদুর রব এই নতুন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক নিযুক্ত হইয়াছেন।”

নতুন এই দলের আত্মপ্রকাশকে যুগপত্ভাবে বিস্ময়, আশাবাদ ও অবিশ্বাসের চোখে দেখেছে দেশবাসী, বিপ্লবপ্রত্যাশী তারুণ্য, প্রচলিত ধ্যান-ধারণার রাজনীতিবিদ ও সাংস্কৃতিক বলয়ের মানুষ। কারণ বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা তখনো তুঙ্গে।

আমরা স্মরণ করব, ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর দেশে জরুরি অবস্থা এবং ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ, ন্যাপ এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়ে বাকশাল শাসন কায়েম হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু বাকশাল ব্যবস্থার যে লক্ষ্য ও রূপরেখা উপস্থাপন করেছিলেন, তা বাস্তবায়িত হলে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে বিদ্যমান রাষ্ট্রের স্থলে স্বাধীন দেশের উপযোগী বিকল্প রাজনৈতিক শাসন গড়ে উঠতে পারত।

একমাত্র বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই সম্ভব ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রটি গুঁড়িয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে জেগে ওঠা বিপুল শক্তিকে দিয়ে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। তার সেনাবাহিনী ও প্রশাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু সময়ের কাজ সময়ে না করা বা করতে না পারার ফলে একদিকে সাধারণ মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বিদ্যমান রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থাসহ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সব শাখায় নিজেদের সংগঠিত করেছে, ষড়যন্ত্র করেছে। এমন অবস্থায় সিরাজুল আলম খানের দিকনির্দেশনায় মুক্তিযুদ্ধের সামনের কাতারের যুবশক্তিকে নেমে পড়তে হয়েছে বঙ্গবন্ধুবিরোধী অবস্থানে। শুরুতে ছাত্রলীগের ভাঙনের মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হলেও দ্রুতই শ্রমিক লীগের মূল অংশ এবং গোটাগুটি কৃষক লীগ এই ধারায় যোগ দেয়। মূল আওয়ামী লীগ থেকে খুব সামান্যই জাসদে যোগ দিয়েছিল।

প্রতিষ্ঠার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে জাসদ বাংলাদেশে একটি সম্ভাবনাময় বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

বিপ্লবী গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য সামনে রেখে দেশব্যাপী গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে জাসদ প্রণয়ন করে ২৯ দফা।

সমাজবিপ্লব সাধনের স্বপ্নে জনগণকে শামিল করতে জাসদ দলীয় প্রতীক মশাল নিয়ে ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় এবং বেশির ভাগ আসনে প্রার্থী দেয়।

১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ দেশব্যাপী ঘেরাও আন্দোলনের অংশ হিসেবে মেজর জলিল ও আ স ম রবের নেতৃত্বে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাও করা হয়।

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও কর্মসূচির পরিণাম ভালো হয়নি। জাসদের দাবি অনুযায়ী অন্তত ৫০ জন নিহত হয় রক্ষীবাহিনীর গুলিতে। সারা দেশে রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করে ছয় মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হয়, জ্বালিয়ে দেওয়া হয় জাসদ, ছাত্রলীগ, দৈনিক গণকণ্ঠের কার্যালয়। কঠিন নিপীড়নের মুখে পড়ে জাসদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও কর্মসূচি নিয়ে জাসদের ভেতরে ও রাজনীতিসচেতন মহলে বহু আলোচনা হয়েছে। বেশির ভাগ মতামত ছিল—এটি একটি হঠকারী ঘটনা, যা আন্দোলন-সংগঠন বিকাশে তেমন কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনেনি। কঠিন নিপীড়নের মুখে জোরদার গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা যায়নি এবং কার্যত গণবিচ্ছিন্নতার কারণে প্রতিরোধ সংগ্রামে সাধারণ মানুষকে শামিল করা যায়নি।

এমন পরিস্থিতিতে জাসদকে আত্মগোপনে থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে হয়। রক্ষীবাহিনীর আক্রমণ মোকাবেলা করতে গড়ে তুলতে হয় বিপ্লবী গণবাহিনী। জরুরি অবস্থা ও বাকশাল শাসন কায়েম হওয়ার কারণে একদিকে যেমন বাকশাল অনেকটাই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তেমনি জাসদও উন্মুক্ত রাজনীতি চর্চা না করতে পেরে অনেকাংশে গণভিত্তি হারাতে থাকে। এমন অবস্থায় লাভবান হয় ষড়যন্ত্রকারী শক্তি।

তারা আঘাত হানে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়, মিনি পাকিস্তানে পরিণত করে বাংলাদেশকে। পরে ৩ নভেম্বর কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করে ঘাতকরা। দেশের এই সংকটে জাসদ সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে খুনি মোশতাক চক্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং কঠিন নিপীড়ন ও হত্যার শিকার হয়। জাসদের এই অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছিল জাসদ; কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত শক্তির সঙ্গে হাত মেলানো বা তাদের কাছ থেকে কোনো রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার পথ নেয়নি।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি একটি তরল অবস্থায় পতিত হয়েছিল। রাষ্ট্রের শক্তিশালী স্তম্ভ সেনাবাহিনীতে ক্যু-পাল্টা ক্যুর ফলে বুর্জোয়া শ্রেণি বিশৃঙ্খল ও বিপর্যস্ত অবস্থায় পতিত হয়। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ক্যুদেতা সৈনিকদের বিভিন্ন অংশকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে জাসদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ও সহযোগিতায় কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে ৭ নভেম্বর সিপাহি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা নিরঙ্কুশভাবে দখল করে নেওয়া মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে এই অভ্যুত্থান ছিল এক মরিয়া প্রতিরোধ। তা সফল না হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী স্বৈরশাসকদের দীর্ঘমেয়াদি শাসনে নিপতিত হয় বাংলাদেশ।

জাসদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে ৭ নভেম্বর সিপাহি অভ্যুত্থান একটি যুগান্তকারী ঘটনা। স্বল্পপরিসরের আলোচনায় এ অভ্যুত্থানের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও পরাজয় নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছা যাবে না। তবে এতটুকু বলা যায়, রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লবের মডেলের সঙ্গে কিছু সামঞ্জস্য দেখা যায় ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থানের। লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি অক্টোবর বিপ্লবে জয়ী হয়ে পৃথিবীর বুকে প্রথম সমাজতান্ত্রিক সরকার কায়েম করতে পেরেছিল। তার কারণ পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক-সৈনিক-কৃষক সোভিয়েতের (নির্বাচিত সংস্থা) শক্তিশালী ঐক্য প্রতিবিপ্লবী শক্তির সব ষড়যন্ত্র সফলতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে পেরেছিল। কিন্তু নানা বাস্তব কারণে বাংলাদেশে ৭ নভেম্বরে অভ্যুত্থানকারী সিপাহিদের সঙ্গে ছাত্র-শ্রমিক-জনতাকে শামিল করতে পারেনি জাসদ। তাই সৈনিক-জনতার অভ্যুত্থান হয়ে উঠতে পারেনি নভেম্বরের সিপাহি অভ্যুত্থান। ফলে জেনারেল জিয়ার প্রতিবিপ্লব জয়ী হয়।

অভ্যুত্থানের নেতা কর্নেল তাহেরের ফাঁসি, জাসদের শীর্ষ নেতাদের দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড এবং সারা দেশে নেতাকর্মীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনে জাসদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়লেও জাসদ একটি সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে ছিল। ৭ নভেম্বরের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক কর্মকৌশল স্থির করার চেষ্টা করেছে জাসদ। কিন্তু ১৯৮০ সালে সিরাজুল আলম খানের পোশাক বদলের তত্ত্বের মোড়কে সামরিক স্বৈরাচারী জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে কারাগার থেকে নেতাদের মুক্তিলাভ এক আপসের খাদে ফেলে দেয় জাসদকে। এরই ধারাবাহিকতায় স্বৈরাচারী এরশাদের সঙ্গে আপসে জাসদ তার মৌলিক চরিত্র ‘আপসহীন সংগ্রামের ধারা’ হারিয়ে ফেলতে থাকে। এরই অনুষঙ্গ হিসেবে আসে একাধিক ভাঙনের অভিঘাত। ১৯৮০, ১৯৮৫, ১৯৮৬ সালে তিন দফা ভাঙনের পর ১৯৯৭ সালে জাসদ (আরেফ-ইনু), জাসদ (রব), বাসদের একাংশ (বাদল) একীভূত হয়ে জাসদ ঐক্যবদ্ধ ও পুনর্গঠিত হয়। কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। জাসদ (ইনু) ও জাসদ (রব) দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

জাসদের নানা ভাঙনের মধ্য দিয়ে মূল জাসদের রাজনীতি থেকে যাঁরা সরে গেছেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিণতি ভালো হয়নি। জাসদের একসময়ের কিংবদন্তি নেতা সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ আপসের চোরাগলিতে পড়ে জনমন থেকে হারিয়ে গেছেন।

সমাজ বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে জাসদ মস্কো বা পিকিং পন্থা নয়, বরং বাংলাদেশের ‘বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ’কে মার্ক্সবাদের যথার্থ প্রয়োগ বলে বিবেচনা করেছে। এই রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল জাসদের মৌলিক শক্তি। এটিই জাসদীয় ধারা। এই ধারার বাইরে গিয়ে সমাজতন্ত্র কায়েমের ‘বিশুদ্ধ’ ধারা সৃষ্টির জন্য যারা আন্দোলন-সংগ্রাম করছে, তারাও একাধিক ভাঙনের প্রক্রিয়ায় নিজেদের শক্তিবৃদ্ধির বদলে ক্রমাগত ছোট শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ ২০১৬ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে একটি বিকল্প রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু শরীফ নূরুল আম্বিয়া ও মইন উদ্দীন খান বাদলের নেতৃত্বে একটি অংশের জাসদ ত্যাগ এই দল সম্পর্কে জনমনে নিরাশার জন্ম দেয় এবং জাসদের ভাবমূর্তি মলিন হয়ে পড়ে।

কোনো পরিষ্কার এবং উচ্চ আদর্শগত অবস্থান না থাকায় তাঁদের দলত্যাগ যে কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। অন্যদিকে হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ ‘বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ’-এর জাসদীয় ঐতিহ্য অনুসরণ করে বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তাতে সফলতার মুখ দেখতে হলে জাসদকে সত্যিকার অর্থেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দল হয়ে উঠতে হবে। ভাঙনের পর গত দেড় বছরে দেশব্যাপী জাসদের পরিকল্পিত রাজনৈতিক তৎপরতায় ধীরে ধীরে সংগঠনের বিস্তৃতি এই আশাবাদ সৃষ্টি করছে যে আগামী জাতীয় নির্বাচন এবং তার পরের সময়ে জাসদ সমাজতন্ত্র ও সামাজিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে একটি সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাসদ নানা ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের রূপরেখা প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। একসময় শাসক আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন করার পরও আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তির জোট গঠনে হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদের মূলধারা সামনেই থেকেছে।

১৯৭২ থেকে ২০১৭—এই ৪৫ বছরে জাসদের নানা পরাজয় আছে। অগুনতি নেতাকর্মীর জীবন দেওয়ার ইতিহাস আছে। ভাঙনের অভিঘাত আছে। তার পরও জাসদ টিকে আছে শুধু নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাসদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। তার মধ্যে রয়েছে জোটবদ্ধ সংগ্রামে সামরিক জান্তা এরশাদের উচ্ছেদ ঘটিয়ে গণতন্ত্র উদ্ধার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং ধর্মীয় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম।

বর্তমান ১৪ দলীয় জোট ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শরিক হয়ে জাসদ জঙ্গিবাদমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত ও দুঃশাসনমুক্ত শান্তির বাংলাদেশ অর্জনে কাজ করছে। একবার মুক্তিযোদ্ধাদের সরকার, একবার রাজাকারের সরকার—এমন ভবিতব্য থেকে মুক্তির কথা বলে জাসদ। সরকারে মুক্তিযুদ্ধের শক্তি, বিরোধী দলেও মুক্তিযুদ্ধের শক্তি—এমনটাই চায় জাসদ। তার জন্য শুধু জামায়াত ও জঙ্গিরা নয়, তাদের লালনকারী ও সহায়তাকারী শক্তিকে রাজনীতির বাইরে রাখার পক্ষে জাসদ। তেমন বাংলাদেশ কায়েম হলে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির অধীনতায় পুনরায় পতিত হওয়ার অভিশাপ থেকে চিরতরে মুক্ত হবে বাংলাদেশ।

প্রধানত ডান বলয়ের রাজনীতিতে ঘুরপাক খাওয়া বাংলাদেশে সামাজিক গণতন্ত্র ও বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি মধ্য-বাম দল হিসেবে জাসদের পুনরুত্থান বর্তমান সময়ের চাওয়া। জাসদ তা পূরণ করতে পারবে কি না তা নির্ভর করে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে এই ধারার সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে শামিল করতে পারার ওপর। সে কাজ দুরূহ হলেও দুঃসাধ্য নয়। জয়-পরাজয়ের বিরল অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ জাসদ কি তা পারবে না?


মন্তব্য