kalerkantho


নারীর দৃশ্যমানতা এবং রাজনীতিতে নারী

তাসলিমা আখতার
সভাপ্রধান, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি ও আলোকচিত্রী

১২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নারীর দৃশ্যমানতা এবং রাজনীতিতে নারী

মুক্তিযোদ্ধা রেহানা

১৯৭১-এর পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ভাঙাগড়া সময়ে নারীদের স্বীকৃত পেশায় যুক্ততা ছিল খুব অল্পই। পরে আশির দশক থেকে গত প্রায় ৩০ বছরে ধীরে ধীরে নতুনভাবে নারীদের উপস্থিতি দৃষ্টিগোচর হতে শুরু করে। দেশের অর্থনীতি এবং পরিবারের ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষিত কর্মজীবী ও শ্রমজীবী নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়; কৃষিক্ষেত্রেও এই পদচারণ দৃশ্যমান হতে থাকে আগের চেয়ে বেশি। অস্বীকৃত পেশার পাশাপাশি স্বীকৃত পেশায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। ঘরের বাইরের জগতে পা রেখে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে নারী। শুরু হয়েছে ‘নারী’ বিষয়ে আলোচনা, রাজনীতিতে তার অংশগ্রহণ প্রশ্নে উদ্বেগ, তর্ক-বিতর্ক ও সমালোচনা। পাশাপাশি অল্প মাত্রায় হলেও আছে নিজেদের হিসসার দাবিতে এবং জাতীয় ইস্যুতে নতুন কায়দায় সোচ্চার হওয়া নারী।

এই সময়ে স্বীকৃত পেশায় নারী যত যুক্ত হচ্ছে, তত বেশি তার অধিকার এবং রাজনীতিতে অংশগ্রহণের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনে প্রাথমিকভাবে নারীর অর্থনৈতিক কাজে যুক্ততা আবশ্যক। তেমনি প্রয়োজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র থেকে সুযোগ-সুবিধা পাওয়া। কিন্তু সেই সুযোগ বাংলাদেশের উদীয়মান পোশাক শ্রমিক থেকে শুরু করে আর সব শ্রমজীবী-মধ্যবিত্ত নারী কেউই ভোগ করতে পারছে না। তার পরও তার এত সব দৃশ্যমান অগ্রযাত্রা আমাদের মনে কিঞ্চিৎ সাহস জোগায় বটে। স্মরণ করিয়ে দেয় এই অগ্রযাত্রার পেছনে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকা এই অঞ্চলের সাহসী কিছু নাম। সেই সাহসী নারীরা হলেন রোকেয়া, ইলা মিত্র, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, জাহানারা ইমাম, তারামন বিবি প্রমুখ।

এই অঞ্চলে আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে নানা সময়ে এই নামগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিল। ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশি আন্দোলন থেকে শুরু করে কৃষক আন্দোলন, নারীমুক্তির আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই নারীদের দেখা গেছে। তাঁদের তৎপরতা এখনো নারী আন্দোলনে অনুপ্রেরণা হিসেবে আছে। স্বদেশি আন্দোলনে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্ত। আর তেভাগা আন্দোলনে সংগ্রামী ভূমিকা রেখে এবং জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে কৃষক আন্দোলন এবং নারীদের মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব রেখেছেন ইলা মিত্র। রোকেয়া উনিশ শতকে নারীমুক্তির লক্ষ্যে নারীবাদী ভাবনা-চিন্তার এক শক্তিশালী জাগরণ ঘটান তাঁর লেখায় এবং একই সঙ্গে নারীদের জন্য স্কুলসহ নানা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে নারীশিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। মূল ধারার গণমাধ্যম রোকেয়াকে শুধু মুসলিম নারীশিক্ষার অগ্রদূত এবং সমাজসংস্কারক হিসেবে পরিচিত করলেও নারী আন্দোলনের প্রকৃত সৈনিকরা জানেন তিনি শুধু একাডেমিক শিক্ষা নয়, বরং ছিলেন সমগ্র বাংলার নারীমুক্তির পথপ্রদর্শক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তারামন বিবি ১১ নম্বর সেক্টরে গেরিলাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পরবর্তী সময়ে বীরপ্রতীক উপাধি পান। অথচ স্বীকৃতির বদলে মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকাকে খাটো করে দেখানো হয় মূল ধারার প্রচারমাধ্যম ও পাঠ্যপুস্তকে। ইতিহাসের এই সংগ্রামী নারীরা এখন পর্যন্ত মধ্যবিত্তের মনোজগতে যতটুকু প্রভাব ফেলতে পেরেছেন, আপামর কৃষক-শ্রমিকের দোরগোড়া পর্যন্ত কতটা পৌঁছেছেন সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ।

বর্তমানে শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দৃশ্যমান উপস্থিতি নারীর সমাজ ও রাজনীতিতে ভূমিকার প্রসঙ্গটিকে গুরুত্বে এনেছে। প্রশ্ন তৈরি করেছে, বর্তমানে নারীর অগ্রযাত্রা যতটুকু দৃশ্যমান, ততটুকুই কি তার ওপর সামাজিক-লৈঙ্গিক বৈষম্য দূর হয়েছে? বদলেছে কি সমাজের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি? বন্ধ হয়েছে কি নারীকে যৌন পণ্য হিসেবে উপস্থাপন? খোদ রাজনীতির প্রধান দুটি আসন—প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের প্রধান নেতা নারী হওয়ায় কি নারী নাগরিক হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে? কর্মক্ষেত্রে কি এগিয়েছে নারী, না এখনো একটা পর্যায়ের পর উচ্চপর্যায়ে এবং নীতিনির্ধারণী স্থানগুলোতে পৌঁছানোর আগেই ছিটকে পড়ছে বড় অংশ? ‘নেতৃত্ব’ হিসেবে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কি বৃদ্ধি পেয়েছে? বলতে বাধা নেই, আমাদের দেশে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতৃত্বে নারী অবস্থান করলেও রাজনীতিতে নারীর অবস্থানের উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বদল হলে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অবস্থার পরিবর্তনই শুধু হতো না, একই সঙ্গে নারীর আপামর জীবনের গুণগত পরিবর্তনও ঘটত, যে পরিবর্তন নারীকে পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে মানুষ হিসেবে অধিকার পাওয়ার এবং জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্বদানকারী হিসেবে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ তৈরি করত। দেশীয় ও বৈশ্বিকভাবে এক রকম নারী নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে এটা ঠিক, তবে এর পরিমাণ এবং গুণগত অবস্থানের খুব পরিবর্তন হয়েছে বলা যাবে না। নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনে কিংবা সব রাজনৈতিক দলে সর্বস্তরে ৩৩ শতাংশ নারী রাখার নিয়ম করে বাকি ক্ষেত্রে বৈষম্য জারি রাখলে ‘নেতৃত্ব’ তৈরির সুযোগ হবে না, এটাই বাস্তব। ফলত আমরা জানি, মূল ধারাই শুধু নয়, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলেও কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর সংখ্যা নিতান্তই কম। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হলে ঘরে-বাইরে নারীর অধিকার এবং অবসর তৈরির সুযোগ রাষ্ট্রকে তৈরি করতে হবে। নারী নেতৃত্বের জায়গা মজবুত হলে তার অবস্থানের পরিবর্তন হবে এবং বৈশ্বিক রাজনীতির সব বিষয় নিয়েই নারীর নীতিনির্ধারণী স্বর আমরা শুনতে পাব সন্দেহ নেই, যে স্বর এখনো অনেক ক্ষীণ আকারেই ধ্বনিত হচ্ছে।

নারীর ‘নেতৃত্ব’ হিসেবে সামনে আসার পথ কী, এর বাধাই বা কী এবং নারীমুক্তির এজেন্ডা কী, সেটা নতুন করে ভাবা দরকার। ঊনবিংশ বা বিংশ শতাব্দীতে নারীমুক্তি সংগ্রামের এজেন্ডা আর একবিংশ শতাব্দীর এজেন্ডা এক হবে না, সেটাও উপলব্ধিতে আনা দরকার। ঊনবিংশ শতাব্দীতে, যখন নারী শ্রমশক্তি হিসেবে দৃশ্যমান নয়, তখন উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও নারীদের মধ্যে নারীশিক্ষা ও অধিকার নিয়ে অল্পবিস্তর আলোচনা ও সংগ্রাম দেখা যায়। ওই সময়ে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরসহ অনেকে তাঁদের কাজ ও লেখালেখির মধ্য দিয়ে সতীদাহ প্রথার বিরোধিতা, বিধবা বিবাহ প্রচলন এবং বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে ভূমিকা রেখে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ওই সময়ে সেই উদ্যোগকেই অগ্রণী ভূমিকা হিসেবে দেখা হতো। পরবর্তী সময়ে রোকেয়া নারীমুক্তির জন্য নারীর আত্মমর্যাদাবোধের শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। রোকেয়ার সাহসী অবস্থান, সমাজকে ব্যঙ্গ করে লেখা শক্তিশালী বক্তব্য নারী আন্দোলনের এক বড় রসদ হয়ে আছে। রোকেয়া তখন থেকেই বাংলার নারীর পরম বন্ধু হয়ে পাশে আছেন।

১৮৮০ সালে জন্ম নিয়ে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত রোকেয়া নারীমুক্তির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হাজির করেন। নারীর প্রচলিত সামাজিক-সাহিত্যিক সংজ্ঞায়ন, কাজের সীমানা নির্ধারণ ইত্যাদিকে উল্টে পুরুষের নির্মিত নারীর চিত্রায়ণকে ভেঙেছেন রোকেয়া। ‘সুলতানার স্বপ্ন’ রচনায় বিদ্রূপ করে পুরুষের জায়গায় নারীকে বসিয়ে দেখিয়েছেন নারীর অবস্থানকে। নারীর পরিচয় সেখানে বিজ্ঞানমনস্ক, সেখানে নারীরা সাম্রাজ্য পরিচালনা করে, রাজনীতি করে, চর্চা করে বিজ্ঞানের, তৈরি করে প্রকৃতিবান্ধব উদ্যান এবং জলধর বেলুন আর সূর্যতাপ সংগ্রহ যন্ত্র। ওই রাজ্যে পুরুষরা থাকে অন্দরমহলে আর নারীরা বাইরের কাজে। শুধু পেশি নয়, মস্তিষ্ক চালনার মাধ্যমেও যে যুদ্ধে জয় লাভ করা যায়, ওই দেশের নারীকে দেখে বোঝা যায়।

বর্তমানে নারীকে রাজনীতি চর্চা, তত্ত্ব চর্চা ও নির্মাণ করতে হলে তার অধিকারহীনতার জায়গা দূর করার আন্দোলন নতুনভাবে করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যক্তিসত্তা এবং নাগরিক হিসেবে নারীর বিকাশের প্রশ্নটিকে নতুন করে ভাবতে হবে। উপার্জনকারী নারী যদি নিজের জীবনযাপন এবং বদলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন না হয় তাহলে নারীমুক্তির লড়াই হবে দিশাহীন। এই লড়াইয়ের পথ খুব মসৃণ হবে না, এটা কঠিন সত্য। পরিবার-পরিজন, সমাজ, কর্মস্থল—সব জায়গায় লড়াই হবে, ভাঙাগড়া হবে। ভাঙাগড়া হবে রক্তক্ষরণের মতো। এই প্রস্তুতি আজকের সময়ে নারীর নেওয়া ছাড়া কোনো পথ নেই।

আজ থেকে শত বছরেরও আগে রোকেয়া নারীর আত্মমর্যাদার প্রশ্নকে সামনে এনে নারীর কর্তাসত্তা প্রতিষ্ঠার আভাস দিয়েছিলেন তাঁর লেখায়। সেই সত্তার বিকাশ ঘটাতে এই সময়ে নারী আন্দোলনকে প্রচলিত ধারার বাইরে নতুনভাবে লক্ষ্য ও কর্মসূচি নির্ধারণ করতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন আমাদের আশপাশে নানা মাত্রায় জীবনসংগ্রামে লিপ্ত চেনা-অচেনা নারীদের নিজেদের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি। নারীর সমস্যাকে নতুন করে চিহ্নিত করে নতুন পরিবার-সম্পর্ক-রাষ্ট্র-আইন তৈরিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। এই লড়াই শুধু মধ্যবিত্ত শিক্ষিত নারীর তাত্ত্বিক গণ্ডিতে আটকে রাখার নয়, বরং দেশের বেশির ভাগ শ্রমজীবী মেহনতি নারীর। ফলে এই মুহূর্তে শ্রমজীবী নারীর মজুরি বৃদ্ধির দাবিও নারীবাদী লড়াইয়ের অন্যতম অংশ, যাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সবার জানা, রাজনীতিতে নারী ‘নেতৃত্ব’ প্রতিষ্ঠা এবং নারীমুক্তির সংগ্রামে নারীরাই অগ্রণী ভূমিকা রাখবে; কিন্তু এটা শুধু নারীর নয়, পুরুষেরও লড়াই। কারণ সমাজের অর্ধেক অংশ নারী পিছিয়ে থাকলে সমাজ কখনো অগ্রসর হতে পারে না। সমাজকে এগিয়ে নিতেই নারী-পুরুষ উভয় নেতৃত্ব দরকার, দরকার এককাতারে সংগ্রাম।


মন্তব্য