kalerkantho

তারুণ্য ও রাজনীতি

ফিরোজ আহমেদ
সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য, গণসংহতি আন্দোলন

১২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



তারুণ্য ও রাজনীতি

শাহবাগে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী প্রতিবাদ মিছিল। ছবি : শেখ হাসান

বাংলাদেশে বেশির ভাগ রাজনৈতিক পরিবর্তনে—ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, উনসত্তর ও একাত্তর পার হয়ে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানেও তরুণদের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে। কেন নব্বইয়ের দশক-পরবর্তী সময়টিতে সক্রিয় রাজনীতি নিয়ে তরুণদের আগ্রহ তেমন দৃশ্যমান নয়—এটি সংগত কারণেই গুরুতর একটা প্রশ্ন হিসেবে এসেছে আমাদের সমাজে।

ঠিক কী ঘটেছিল নব্বইয়ের দশকে? একক কোনো ঘটনা, নাকি অজস্র ঘটনার লব্ধিবল সবার অগোচরে এই মৌলিক বদলটি ঘটিয়েছে?

নব্বইয়ের দশকের শুরুটাই ছিল বিশ্বব্যাপী মানুষের মনস্তত্ত্বে আদর্শিক পতনের যুগ। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন যেভাবে প্রগতিশীল আন্দোলনের অস্তিত্ব ধরে আমূল ঝাঁকুনি দিয়েছে, তার ধাক্কা সামলানো দুনিয়াজুড়েই সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের কর্মী হিসেবেও দেখতাম, প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর তখনকার জোট গণতান্ত্রিক ছাত্রঐক্যের মিছিলে উপস্থিতির সংখ্যা প্রতিদিন কমে যাচ্ছে। নতুন কর্মীদের সরবরাহের অভাবে সংগঠনগুলো অচলাবস্থার শিকার হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন যে শুধু রাজনৈতিক কর্মীদের মাঝে হতাশার রাজত্ব সৃষ্টি করেছিল, তা-ই কিন্তু নয়। বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তো বটেই, রাজনীতি থেকে বহু দূরবর্তী বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিরাও বহু ক্ষেত্রে এই আদর্শিক পতনের আঁচ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেননি। ব্যক্তির চেয়ে বৃহত্তর, উচ্চতর আর মহত্তর কোনো কিছুর অনুপস্থিতির একটা বোধ তৈরি করেছিল গণমনস্তত্ত্বে। এঁদের অনেকেই বহুদিনের জন্য হতাশাগ্রস্ত হয়েছেন, অনেকেই খরচ করা তারুণ্যের ক্ষতি পূরণ করতে বহুগুণ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েছেন, মাদকাসক্তও হয়েছেন বহু। কিন্তু শুধু হতাশা আর দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হওয়াই যথেষ্ট ছিল না; তার জন্য একটা আদর্শিক বাতাবরণও দরকার ছিল। সোভিয়েত পতনের পরবর্তী ‘লিসেনিং টু দ্য উইন্ড অব চেঞ্জ’ যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক অনন্ত বিকাশের, অফুরন্ত সমৃদ্ধির আর পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, নব্বই-পরবর্তী তরুণদের বড় অংশ বিশ্বাস করেই সেই স্বপ্নে নিজেদের চালিত করেছিল। রাজনৈতিক দলমুক্ত সিভিল সমাজ আন্দোলনে তরুণদের অনেকেই আস্থা রেখেছিল। নতুন বিশ্বাসটা সুবিধাজনকও ছিল, কেননা তাতে সংগঠন করার মতো সময়-শ্রম-মেধা বিনিয়োগ করতে হয় না। অর্থোপার্জন হয়, অথচ সমাজ বদলাবে—এমন ভরসাও পাওয়া যায়। অনেক এনজিও অজস্র উদ্যমী রাজনৈতিক-সাস্কৃতিক কর্মীকে দেশজুড়ে সংগঠিত করেছিল সিভিল সমাজের আন্দোলনের নামে। সনাতন ধারার প্রগতিশীল আন্দোলনের ‘ব্যর্থতার’ প্রতি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোও ছিল গুরুতর একটা প্রতীক। তেমনি পাঠকপ্রিয় কোনো কোনো লেখক নিয়মিত বিরতিতে লিখে চলতেন ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার উপযোগিতা বিষয়ে।

নব্বইয়ের দশক ছিল একটা মিশ্র স্রোত, ষাট থেকে আশির দশকের মাঝে বেড়ে ওঠা মধ্যবিত্তের রুচি-নৈতিকতা-ধরনধারণের অনেক প্রভাব তার মাঝে বেশ খানিকটা টিকে ছিল। তেমনি ‘হঠাৎ সচ্ছলরাও’ একটা বর্গ হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকল সমাজে, এই নব্বইতেই। নতুন বেসরকারি শিল্প, সেবা ও আর্থিক খাতে কাজ করা পয়সাদার মধ্যবিত্ত চমকে দিল এর আগে প্রধানত সরকারি চাকরি আর জমিজমার ওপর নির্ভরশীল ‘শান্ত-নিস্তরঙ্গ’ সনাতনি মধ্যবিত্তকে। আসবাব-পরিবহন-জীবনযাত্রায় হঠাৎ বিপুল ফারাক সবাইকে বাধ্য করল যেকোনো উপায়ে আরো বেশি সম্পদ আহরণে নামতে। সম্পদের প্রতিযোগিতা সমাজের যে ভারসাম্যটি ধ্বংস করেছে, তার পরিণামে সমষ্টিকে নিয়ে ভাবার সুযোগ গেছে কমে, নব্বই-পরবর্তী তরুণদের একটা বড় অংশ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানোর চেয়ে তাই মন দিয়েছে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠায়।

রাজনীতিবিযুক্ত কি শুধু তরুণ শিক্ষার্থীরাই হয়েছে? আশির দশকেও আহমদ শরীফ কিংবা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীরা ছিলেন শিক্ষককুলের শিরোমণি। গণবিরোধী, জাতীয় স্বার্থবিরোধী অজস্র ঘটনায় তাঁদের নেতৃত্বে শিক্ষকসমাজ, বুদ্ধিজীবীরা রুখে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের যুগ অবসানের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় নানা ঘটনায় মতামত গঠন, বুদ্ধিজীবীসুলভ নেতৃত্ব প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সামান্যই ভূমিকা রাখছে। বরং শিক্ষকদেরও আরো বড় একটা অংশকে আগেরকার কনসালট্যান্সি, প্রজেক্ট ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি দেখা গেল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে শশব্যস্ত হয়ে যেতে। পুরনো শিক্ষককুল বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক চেতনা গঠন করার মতো প্রভাবশালী শিক্ষকরাও বিরল হয়ে পড়লেন।

আশির দশক পর্যন্ত দেশব্যাপী পুরনো বামপন্থী আন্দোলনের সহগামী একটা শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলনও ছিল। খেলাঘর, উদীচী, কচি-কাঁচার মেলা ইত্যাদি নাম এখনকার কিশোর-তরুণদের কাছে অচেনা হলেও বেশির ভাগ মফস্বলে এদের বেশ গোছানো তৎপরতা ছিল। খেলাধুলা-নাটক-গান-আবৃত্তিচর্চা শুধু নয়, নানা বার্ষিক উৎসব আর আয়োজনে সরগরম ছিল এই পাড়া। ছিল গ্রাম থিয়েটার আন্দোলন। সোভিয়েত ভর্তুকিতে বইয়ের প্রকাশ এ দেশের মধ্যবিত্তকে কতটা প্রভাবিত করেছিল, আশির দশকের বইপড়ুয়াদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই তা সম্যক টের পাওয়া যায়। নব্বইয়েও এর সামান্য কিছুটা রয়ে গেছে। প্রগতিশীলতার নিজস্ব একটা গণ্ডি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনও। সোভিয়েত ইউনিয়ন উধাও হওয়ামাত্র এদেরও হীনবীর্য হয়ে পড়াটা কিছুটা প্রমাণ করে, এদের প্রাণভোমরা স্বভূমির রসে যথেষ্ট পরিপুষ্ট ছিল না। ঠিক এই মুহূর্তের অর্থনীতিবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, নীতিনির্ধারক, শিল্পবোদ্ধা, ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদদের একটা বড় অংশ, যাকে বলা যায় দেশের শাসক ও সংস্কৃতিমান রুচির ননিস্বরূপ, অংশটিও এই ঘরানাতেই পুষ্ট হয়েছে, বৃত্তি নিয়ে সোভিয়েত দেশে পাঠ থেকে শুরু করে সোভিয়েত ভর্তুকিতে ‘উদয়ন’ পত্রিকার গ্রাহক হওয়া পর্যন্ত কোনো না কোনো মাত্রায়।

আশির দশকের বামপন্থী রাজনীতি ছিল সোভিয়েত ভর্তুকিপ্রাপ্ত। ভর্তুকি উঠে যাওয়া মাত্র তাই শুধু সংগঠন উধাও হয়নি, সঙ্গে ভাবমানসটাও উধাও হয়েছিল নব্বইয়ে।

এই ভর্তুকি সোভিয়েতপন্থীরা প্রত্যক্ষভাবে পেত, সোভিয়েতকে সংশোধনবাদী ইত্যাদি মনে করারাও পেত পরোক্ষভাবে। আজ নিদেনপক্ষে মধ্যচল্লিশ, মধ্যবিত্তের এমন একটা অংশের পাঠ্যতালিকার দিকে তাকালে তা বোঝা যাবে।

সত্তর ও আশির দশকে দেশের প্রগতিশীল আন্দোলন যে সামান্যই দেশের মাটিতে প্রোথিত ছিল, তার মূল জোর ছিল সোভিয়েত ভর্তুকি, অথবা চীনের বিপ্লবকে বিকৃত অনুকরণের নিষ্ফল চেষ্টা, সেটাও নব্বই-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে ভালোভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা দুনিয়ার কোথাও খুব সহজে কাটানো যায়নি; কিন্তু বাংলাদেশে তা রাতারাতি ধসে গিয়েছিল। নব্বইয়ের দশক তাই বামপন্থীদের দ্রুত অপস্রিয়মাণ হওয়ার দশক। কিছুটা ক্ষীণভাবে তারা ঘুরতে শুরু করে নব্বইয়ের শেষ দিকে। কিন্তু আশির দশক পর্যন্ত টিকে থাকা তাদের প্রভাব এখনো ফিরে আসেনি, যদিও পৃথিবীর বহু দেশে তাদের পুনর্জাগরণ ঘটেছে। এটা সেই মাত্রায় সম্ভব হয়েছে, যে মাত্রায় তারা নিজ দেশের শিকড়ের বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

আশির দশক পর্যন্ত শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের জোশটা টিকে ছিল। পাটকল কিংবা চটকলের শ্রমিকদের আয় এবং গড় জীবনমান এখনকার বেশির ভাগ শ্রমজীবী মানুষের চেয়ে ভালো ছিল। এই শ্রমিকদের রাজনৈতিক চেতনার একটা প্রভাব সমাজে ভালোভাবেই ছিল, তাদের সন্তানরাও উচ্চশিক্ষার যথেষ্ট সুযোগ পেত। অন্যদিকে এই রাষ্ট্রীয় শিল্প শাসকদের জন্য লাভজনক ছিল না, কিন্তু বন্ধ করে দিতে পারলে নানা লুটপাটের সুযোগ মিলত। অথচ চাইলেই কারখানা বন্ধও করে দেওয়া যাচ্ছে না, বাধা সংগঠিত শ্রমিক। শ্রমিক আন্দোলনকে তাই খুব দ্রুতই দুর্বৃত্তায়িত করা হচ্ছিল রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে আর অর্থায়নে। রাজনীতির প্রতি অন্ধ বিদ্বেষ আশির দশকেই আদমজীসহ নানা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পক্ষেত্রে সংঘর্ষ, হত্যাকাণ্ড, মাদক আর অস্ত্রবাজির পরিণামে তৈরি হয়েছিল। এটার প্রয়োজন পড়েছিল কারখানাগুলো বন্ধের অজুহাত সৃষ্টিতে। অবশেষে সেগুলোর বৃহদংশ বিরাষ্ট্রীকরণের নামে বন্ধ হয়, সেই সঙ্গে বাংলাদেশে পঞ্চাশ-ষাটের দশক থেকে গড়ে ওঠা পুরনো শিল্পভিত্তিরও অবসান ঘটে। সংগঠিত প্রগতিশীল শ্রমিকশ্রেণির দুর্বলতা এবং মাফিয়া ত্রাসে পরিণত হওয়া শ্রমিক আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি—এই দুই মিলে নব্বইয়ের দশকে সামাজিক ভাবমানসে রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধা তৈরিতে বাড়তি ভূমিকাই রাখে।

আশির দশকের তুলনায়, এমনকি নব্বইয়ের দশকের তুলনায় শিক্ষাঙ্গনগুলোতে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এখন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমেছে। কারণ স্বৈরতন্ত্রী আমলের মতো সবাই মিলে লুটের মালের ভাগ-বাটোয়ারা নয়, গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া, সব কিছুতে কায়েম হয়েছে একক দখলদারি। আজকে ছাত্রদল-ছাত্রলীগের সংঘর্ষ বিরল, বরং খুনাখুনি হয় একই সংগঠনের বিবদমান অংশের মাঝে। ঠিকাদারি, চাঁদাবাজি প্রভৃতি প্রক্রিয়ায় উন্নয়ন বরাদ্দের বড় অংশ মফস্বল পর্যন্ত স্থানীয় পর্যায়ে লাঠিয়াল তরুণেরই পেটে যাচ্ছে। এই আধিপত্য এতই একচ্ছত্র যে বিশ্ববিদ্যলয় থেকে প্রত্যন্ত এলাকার প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত, সর্বত্র শিক্ষার্থীরা বাস করে রাজনৈতিক বড় ভাইদের রাজত্বে। সালাম না দেওয়ার অপরাধে ছাত্রাবাস থেকে পিটিয়ে বের করে দেওয়ার ঘটনা অজস্র আছে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতেই। জাতীয় নির্বাচনী বন্দোবস্তেই যদি দখল কার্যক্রম সম্পন্ন করা যায়, তো আলাদা করে আর ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন কেন? ফলে ডাকসু, চাকসু, জাকসু, রাকসুসমেত সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো নির্বাচনের ধারা নেই দুই যুগের বেশি    সময় ধরে।

 কিন্তু এই ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো স্রেফ কতকগুলো প্রতিনিধি নির্বাচন করাই তো নয়, এইভাবেই বিকশিত হওয়ার কথা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশের। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝেও রাজনৈতিক চেতনা বিস্তৃত হওয়ার কথা। শিক্ষাঙ্গনে তার নিজস্ব দাবিদাওয়া এবং পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে যেমন বিতর্ক হবে এই নির্বাচনে, তেমনি বিতর্ক হওয়ার কথা রাষ্ট্রের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি নিয়ে, খনিজ সম্পদ নিয়ে, শিল্পায়ন নিয়ে, পদ্মা-তিস্তার পানি পাওয়া না পাওয়া নিয়ে, নারীর অধিকার নিয়ে। সাংস্কৃতিক তৎপরতার আখড়া হওয়ার কথা এই ছাত্র সংসদগুলোর। এগুলোকে অকার্যকর করে রাখা তাই একেবারেই কাকতালীয় নয়। বরং মুফতে পাওয়া শাসকদলের নিয়ন্ত্রণটা যেমন হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে, তেমনি শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক মাফিয়াতন্ত্রের শাসনে রাখাটাও অসম্ভব হবে তাদের চেতনা বৃদ্ধি কিংবা সংগঠিত হওয়ার সংস্কৃতিতে। বাধ্য না হলে নির্বাচন দেওয়াটা লুটেরাদের স্বভাবে নেই। কাজেই ছাত্র সংসদ যেমন নেই, তেমনি নেই সাংস্কৃতিক কোনো আয়োজন, নেই সর্বজনীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝেও নেই কোনো যৌথ চর্চার অনুশীলন।

পরিবর্তনের ভাবনা সুদূরপরাহত ঠেকলে তার যৌক্তিকতা উপলব্ধির সব ধরনের সাংস্কৃতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে শতহাত দূরে ঠেলে দেওয়া হলে বাকি থাকে যে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আদিম প্রতিযোগিতা, আমাদের তরুণদের বড় অংশ বর্তমানে তাতেই নিয়োজিত এবং এর জন্য যদি কাউকে দোষারোপ করতেই হয়, এই তরুণদের তা করা যাবে সবচেয়ে কম।

কেননা এই পরিস্থিতি আজকের তরুণরা সৃষ্টি করেনি। তারা প্রধানত এই পরিস্থিতির শিকার। বরং এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ভালো যেটা করা যায়, সেটাই তারা করছে, সেটা আত্মরক্ষা। আমরা যেটাকে তাদের সচেতন রাজনীতিবিমুখতা বলে ভাবছি, ঘনিষ্ঠতর ভাবনায় সেটিকেই রাজনীতির নামে ক্ষমতাসীনরা বর্তমান যা কিছু দিয়েছে, তার প্রত্যাখ্যান বলেই চেনা যায়। স্বদেশের শিকড়ে পরিপুষ্ট নয়, এমন প্রগতিশীল রাজনীতি দেশের ক্রান্তির সময়েই ভেঙেচুরে গেছে, তরুণকে পথ দেখাতে সক্ষম হয়নি। অথবা হয়তো সময়টা বড় বেশিই বিরূপ ছিল, কোনো রাজনীতির সাধ্য ছিল না তার মোকাবেলা করে। বাকি লুটেরাদের রাজনীতিও চেতনার দিক থেকে গ্রহণ করা তরুণের পক্ষে সম্ভব হয়নি। সামষ্টিক আত্মপরতার আর কী ব্যাখ্যা হতে পারে?

১৯৯০ সালের শেষ দিকেই ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগরে ইতিহাস সৃষ্টিকারী ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন ও যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে। গত দুই দশকে বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়ন ও বেতন ফি বৃদ্ধিবিরোধী আন্দোলন হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধানতম আন্দোলনের বিষয়। প্রগতিশীল রাজনীতিতে নব্বইয়ের অতি দ্রুতগতিতে ক্রমহ্রাসমান কর্মীর তুলনায় খুব ধীরগতিতে হলেও আনাগোনা বেড়েছে পরবর্তী দশকে। এই হার এখন কিছুটা বলার মতো গতিই অর্জন করেছে। বই কেনার হার এর সমানুপাতে সামান্য কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও আশির দশকের মধ্যবিত্তের আকৃতির সঙ্গে আনুপাতিক তুলনায় মাত্রাটি এখনো মর্মান্তিক। কিন্তু নব্বইয়ের হতাশার তুলনায় তা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেশি।

সাংস্কৃতিক সংগঠন, ছাত্র সংসদ প্রভৃতির যা করার কথা ছিল, সেই রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির আর মতামত আদান-প্রদানের কাজটি বর্তমানে কিছুটা ত্বরান্বিত করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। রাজনৈতিক বক্তব্য ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতি যে উদাসীনতা ও প্রত্যাখ্যান নব্বইয়ের দশকের উঠতি তরুণের বৈশিষ্ট্য ছিল, তা-ও আর ততটা কেতাদুরস্ত নেই। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, তাদের বড় অংশটিই আজও যৌথতার মাঝে নিজের বিকাশের সম্ভাবনা খুঁজে পায়নি। সেই অর্থে তারা রাজনৈতিকভাবে একা।

তরুণরা প্রত্যাখ্যান করেছে, এটা অবিমিশ্র ইতিবাচক নয়। কেননা অসংগঠিত আর বিচ্ছিন্ন মানুষের প্রতিরোধ অতি সহজে ভেঙে দেওয়া যায়। সংগঠন থেকে নিজেদের বেশ খানিকটা গুটিয়ে নিয়েও তারা যে সম্পূর্ণ আত্মকেন্দ্রিক নয়, তাদের অহমে ঘা লাগলে তার পরিণতি কী হতে পারে, তা টের পাওয়া গেছে ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী সংঘর্ষগুলোতে। প্রতারিত হওয়ার বোধে আক্রান্ত হলে তারা যে অযুতে-নিযুতে নেমে আসতে জানে, তার প্রমাণ তারা রেখেছে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া সমঝোতার রায়ের বিরুদ্ধে অগুনতি সংখ্যায় রাস্তায় নেমে এসে। মফস্বলি তরুণদেরই আরেকটা অংশ, নগর যাদের সাংস্কৃতিকভাবে প্রায় বর্জন কিংবা পরিত্যাগ করেছে; স্থানীয় পর্যায়ে কৃষক বা শ্রমিক আন্দোলনের অনুপস্থিতি, মাদরাসার প্রভাব আর প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক তৎপরতার অভাব তাদের আপাতদৃষ্টে ঠেলে দিয়েছে মৌলবাদী শক্তির পেছনে। সামনের দিনে যদি শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলন গড়ে ওঠে, জাতীয় সম্পদ রক্ষার চেতনা শক্তিশালী হয়, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা আর জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষার বিকাশ ঘটে, নগর কিংবা মফস্বলের সব তরুণ তাতে যুক্ত না হয়ে পারবে না, কিংবা উল্টো দিক থেকে সামনের দিনের বাস্তব সংকটগুলোর কারণে তরুণরা এই রাজনৈতিক সংগ্রামগুলো নিজেদের স্বার্থেই গড়ে না তুলে পারবে না।


মন্তব্য