kalerkantho

ছাত্র আন্দোলনের দুই অধ্যায়

১২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ছাত্র আন্দোলনের দুই অধ্যায়

গণজাগরণ মঞ্চ। ছবি : শেখ হাসান

পাকিস্তানি পরাধীনতার ২৪ বছরে জাতির নানা ঐতিহাসিক বাঁকে ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতো তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনায় ছাত্ররা সামনে থেকে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছে। অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার তুলনায় গত ৪৬ বছরে রাজনীতিতে ছাত্রসমাজের ভূমিকা অনেকটাই ম্লান। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্রসমাজ দুটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জনে অনন্য ভূমিকা রেখেছে। একটি নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং অন্যটি যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চ। দুটি অর্জনেই ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে, জাতির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে সাহসিকতার সঙ্গে নিজেদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে। এই অর্জন দুটি নিয়েই লিখেছেন ডাকসুর সাবেক সহসভাপতি আমানউল্লাহ আমান, নব্বইয়ের দশকে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক অসীম কুমার উকিল এবং গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক, ছাত্রমৈত্রীর সাবেক সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু

 

সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য ছাত্র নেতৃত্বের বাস্তবমুখী চিন্তার ফল

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বন্দুকের জোরে গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসীন হন। সেই সময়ই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ছাত্রসমাজ রাজপথে নামে। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জয়নাল, জাফর, দীপালি সাহা, সেলিম, দেলোয়ার, রাউফুন বসুনিয়া, নূর হোসেনসহ অনেকেই শহীদ হয়েছিলেন। ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর ছাত্রনেতা নাজিরউদ্দীন জেহাদ শহীদ হন। জেহাদের লাশ অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে রেখে ডাকসুর নেতৃত্বে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য গঠন করার মধ্য দিয়ে আমরা শপথ গ্রহণ করি—‘স্বৈরাচার এরশাদের পতন ছাড়া আমরা রাজপথ থেকে ঘরে ফিরব না।’ সেদিন ডাকসুর ভিপি হিসেবে আমি শপথ নিয়েছিলাম। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২৭ নভেম্বর ডা. মিলন শহীদ হন। ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হয় এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়।

সেদিন শহীদ জেহাদের লাশ সামনে রেখে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য গঠিত হয়। এটি ছিল সময়ের বাস্তবতা এবং নেতৃত্বের বাস্তবমুখিতা। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সফল করে ইতিহাস অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছিলাম। সেখানে ডাকসু ও ছাত্রসংগঠনগুলো আন্তরিক ও সক্রিয় ভূমিকা রাখে। আজকে ছাত্র নেতৃত্ব কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে। নেতৃত্বের বিকাশে এবং জাতীয় নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যে ডাকসুসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল ভয় পায়, ছাত্র নেতৃত্বের বিকাশ চায় না। ছাত্রসংসদ নির্বাচন না হওয়ার মূল কারণ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর ছাত্রাবাস ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলোর জবরদখল করে রাখা। সেখানে ভিন্ন মত ও পথের কোনো ছাত্রসংগঠন অবস্থান করতে পারছে না। সহাবস্থান না থাকার কারণেই ছাত্রসংসদ নির্বাচন হচ্ছে না। সরকার আন্তরিক হলেই সব ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হতে পারে।

আমরা যেসব উদ্দেশ্য সামনে রেখে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য গঠন করেছিলাম, তার অনেকটাই বাস্তবায়িত হয়েছে। সে সময় ছাত্রসমাজের ১০ দফা দাবি অনুযায়ী সরকারি চাকরির বয়সসীমা ২৭ থেকে ৩০ বছর করা হয়। সেদিন ছাত্রসমাজ যাদের দুর্নীতিবাজ হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল, তাদের নাম আংশিক প্রকাশিত হয়েছিল এবং তাদের অনেকেই আইনের আওতায় এসেছিল।

এ জন্যই ছাত্রসমাজের ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। ছাত্রসংগঠনগুলোরও নিজেদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা উচিত। আমি মনে করি, এখনো সময়ের দাবিতে এবং বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রসংগঠনগুলো এক মঞ্চে আসতে পারে, যদি ছাত্রনেতারা আন্তরিক হন। তবে ছাত্রসংগঠনগুলো বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকারের লেজুড়বৃত্তি করছে। এ দেশে ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সামনে রেখে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে বলে আমার বিশ্বাস। ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন শেষ হয়নি এবং কোনো দিন শেষ হবে না। ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়েই এ দেশের ভবিষ্যৎ যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। ছাত্ররাজনীতিই নেতৃত্ব তৈরির সূতিকাগার।


 

গৌরব ও অহংকারের সব কিছুতেই আছে ছাত্রসমাজের অবদান

হঠাৎ করে সব কিছুই পাল্টে গেল। যেন জাদুকরী কোনো কিছু! রাজনীতিশাস্ত্রের কোনো কিছুর সঙ্গেই এর মিল খুঁজে বেড়ানো নিষ্ফল। ঘটনাগুলো ঘটে যায় একের পর এক। হতবিহ্বল গোটা জাতি, স্তম্ভিত পুরো দেশ। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হারানোর মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতি সামরিক হিংস্র থাবায় বিক্ষত হতে শুরু করে। সামরিক স্বৈরাচাররা চারদিকে স্বৈরতন্ত্র কায়েমের চেষ্টা করে। তবে ছাত্রসমাজ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করতে সময় নেয়নি।

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই আমরা এর বিরোধিতা করেছি। ভাষা আন্দোলন দিয়ে যার যাত্রা শুরু হয়ে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের আখরে লেখা স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে এর সফল পরিসমাপ্তি। অতঃপর স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক শক্তির সংগ্রামে এগিয়ে চলা। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর কাজটি করে যখন এগিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ, তখনই ঘটানো হয় পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ড। ক্ষমতাসীন সামরিক শাসকদের অশুভ তৎপরতায় গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো বন্দি হয় সেনাছাউনিতে। স্বাধীন বাংলাদেশে আইয়ুব-ইয়াহিয়া-মোনেমের উত্তরাধিকাররা চালু করে ‘কারফিউ গণতন্ত্র’। তারা ক্ষমতার হালুয়া-রুটি বিলিয়ে দল গঠন করে, প্রতিষ্ঠা করে লুটপাটের অর্থনীতি, চালু করে ধর্মীয় রাজনীতি।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সামরিক শাসনের প্রথম প্রহর থেকেই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় এ দেশের সংগ্রামী ছাত্রসমাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা একদিকে যেমন বঙ্গবন্ধু হত্যা-জেলহত্যার প্রতিবাদ করতে সংগঠিত হতে থাকে, অন্যদিকে শিক্ষানীতিসহ জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়। শিক্ষাঙ্গনগুলোতে তখন অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ ছিল ভয়ংকর রকমের। প্রতিমুহূর্তে ছাত্রসমাজকে এই অবৈধ অস্ত্রের মোকাবেলা করতে হয়েছে। সেই দিনগুলোতে প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে সরকারের মদদপ্রাপ্ত অস্ত্রধারীদের মোকাবেলা করাই ছিল ছাত্ররাজনীতির মূল চ্যালেঞ্জ। ছাত্ররা সাহসিকতার সঙ্গে কখনো দলগতভাবে, কখনো জোটগতভাবে এই অবৈধ অস্ত্রধারীদের মোকাবেলা করেছে। আবার ছাত্রনেতা-কর্মীসহ অনেককে জীবনও দিতে হয়েছে এসব আন্দোলনে। শহীদ নূর হোসেন, ডা. শামসুল আলম খান মিলন, মনিরুজ্জামান বাদল, রাউফুন বসুনিয়া, শাজাহান সিরাজের মতো অসংখ্য তরুণ-যুবকের রক্তে রঞ্জিত ছাত্রসমাজের এই আন্দোলন। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের ১০ অক্টোবর গড়ে তোলা হয় সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য। শহীদ জেহাদের লাশ ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সেদিনকার ক্রিয়াশীল সব কটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য। এই জোটের মূল চেতনাই ছিল স্বৈরশাসনের চির অবসান। ছাত্রদের শপথ ছিল—স্বৈরশাসনের অবসান না ঘটিয়ে ঘরে   ফেরা নয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সামরিক শাসকরা বাংলাদেশে যে রাজনীতি শুরু করে, তার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের দৃঢ়চেতা অবস্থানই আজকে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক কাঠামোর শক্তিশালী দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে উন্নতির ধারায়। সামরিক জান্তা শাসকদের চোখ-রাঙানি, অর্থের প্রলোভন বাংলাদেশের রাজনীতির গুণগত অবনমন ঘটায়। নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ হয় ভূলুণ্ঠিত। ভোগ করো, লুটপাট করো, আখের গোছাও—এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে সামরিক বাহিনীর আবরণে দেশের রাজনীতি এগিয়ে যায়। নির্বাচন মানেই হয়ে দাঁড়ায় হোন্ডা-গুণ্ডা-ডাণ্ডা। নির্বাচনের নামে এ দেশের মানুষ পরিচিত হয় হ্যাঁ-না মার্কা নির্বাচনের সঙ্গে। মিডিয়া ক্যু একটি জনপ্রিয় শব্দ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় নির্বাচনের মাঠে। আর এ দেশের রাজনীতিতে জেনারেল জিয়ার হাত ধরে নতুন করে মাঠে সক্রিয় হয় ধর্মান্ধতার রাজনীতি। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বিষয়টি ছিল মীমাংসিত। কিন্তু পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে আবারও দেশে চালু হয় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। প্রতিটি শিক্ষাঙ্গন হয় রক্তাক্ত। সাম্প্রদায়িকতার হিংস্র ছোবলে দেশের রাজনীতি হয় উত্তপ্ত।

এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজনীতিতে অপরাজনীতির বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে এ দেশের ছাত্ররাজনীতি ছিল রাজনীতিসচেতন সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। গণবিরোধী শিক্ষানীতি থেকে শুরু করে প্রতিটি গণবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সাম্প্রদায়িকতার হিংস্র ছোবল থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার জন্য গড়ে তোলে ছাত্র আন্দোলন। দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি সফল আন্দোলন গড়ে তোলার নামই নব্বইয়ের সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য। এ দেশের যা কিছু গৌরবের, দেশের যা কিছু অহংকারের, সব কিছুতেই আছে ছাত্রসমাজের অবদান।


 

দুর্ভাগা শাহবাগ’

এক বিপুল সম্ভাবনার কি অপমৃত্যু ঘটল? প্রত্যাশার সৌধকে বালির বাঁধে পরিণত করে সব স্বপ্নের কি অবসান হলো? এসব প্রশ্ন এখনো শাহবাগকে কেন্দ্র করে। স্বাভাবিক। কারণ ছাত্র আন্দোলনের দীর্ঘ বন্ধ্যত্বের অবসান ঘটিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে তারুণ্যের অভূতপূর্ব বিপুল উন্মেষ হয়েছিল সেই দিনগুলোতে! ফলে একটা প্রত্যাশা, একটা স্বপ্ন, একটা চাওয়া তো তৈরি হয়েছিলই। সেই জাতীয় ঐক্য শেষ পর্যন্ত ভাঙন আর অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বে এভাবে চুরমার হয়ে গেল!

সেদিন কসাই কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বদলে মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করেই মানুষ শাহবাগে গিয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়ার ফলে মানুষের মনে সঞ্চারিত ক্ষোভের অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছিল শাহবাগে, ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু শাহবাগ তথা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন কোনো একক ব্যক্তি বা একক সংগঠনের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়নি, কোনো ব্যক্তিবিশেষের ডাকেও নয়। কিন্তু তখন কিংবা আজও কেউ কেউ শাহবাগের মোড়ল সেজেছেন। এসব দেখে বাইরের মানুষ হেসেছে আর সমবেত জনতা চোখের জল ফেলেছে, যে ভিক্ষুক তার ভিক্ষার ঝুলি থেকে টাকা তুলে দিয়েছিল তারুণ্যের সেবায়, তার দুঃখবোধকে আরো গাঢ় করেছে।

কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষণার পর টিএসসি থেকে প্রথম মিছিলটি বের করেছিল ছাত্রসংগঠনগুলোই—ছাত্রমৈত্রী, জাসদ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সন্ধ্যায় মশাল মিছিল বের করে। ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক তাদের ফেসবুক পেজ থেকে ইভেন্ট খুলে বিকেলে শাহবাগে মানববন্ধন আহ্বান করে। এসব সংগঠন ও অন্য অনেক মানুষের স্রোতোধারা মিলে শাহবাগের মূল রাস্তার ওপর অবস্থান গ্রহণ করে। এই মানুষদের বেশির ভাগই কেউ কাউকে চিনত না। রাস্তায়ই পারস্পরিক পরিচয়। সন্ধ্যার পরপরই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ (ছাত্রলীগ, ছাত্রমৈত্রী, জাসদ ছাত্রলীগসহ সাত সংগঠনের জোট) মিছিল নিয়ে এই গণজমায়েতে শামিল হয়। ৮ ফেব্রুয়ারি মহাসমাবেশের দিন থেকে আরো কিছু বামপন্থী ছাত্রসংগঠন এই আন্দোলনে শামিল হয়। আন্দোলনকে নির্দলীয় রাখার স্বার্থেই ব্লগারদের প্রতিনিধি ডা. ইমরান এইচ সরকারকে আন্দোলনের মুখপাত্র মনোনীত করা হয়। শুরু থেকেই সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি গ্রহণ করতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অসহনীয় মাত্রার অগণতান্ত্রিক ‘আমিত্ব’ চর্চা শুরু হলো এবং তা নিয়ে সবার মধ্যেই অসন্তোষ জাগ্রত হলো। এ নিয়ে বারবার আলোচনা হলো, কিন্তু কার্যত কোনো ফল আসেনি। তার অনিবার্য পরিণতি বিভক্তি।

নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। এই সময়কালকে ছাত্র আন্দোলনের বন্ধ্যত্বের যুগ বলেই ধরে নেওয়া হয়। ব্যতিক্রম ছিল ২০০৭ সালের আগস্টে ছাত্র অভ্যুত্থান। তীব্র প্রতিকূল পরিবেশেও ওই ছাত্র অভ্যুত্থান অসাংবিধানিক সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তারই পথ ধরে নানা ঘটনাপরিক্রমায় দেশে গণতন্ত্রের শাসন ফিরে এসেছিল। কিন্তু ঐক্যের সংকট সেই অর্জনকেও বেশিদূর এগোতে দেয়নি। দলকানা মনোবৃত্তি আর ছাত্রনেতাদের মাথা বন্ধকের প্রবৃত্তিই এর মূল কারণ। এর সুদূরপ্রসারী ফল হিসেবে সাধারণ ছাত্রসমাজ ‘আই হেট পলিটিকস’ মার্কা মনোবৃত্তিতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে লাভবান হয় ‘বিরাজনৈতিকীকরণের রাজনীতি’। এই চিত্র বদলে দিতে পারত শাহবাগ। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে যে শাহবাগে গর্জে উঠেছিল লাখো তরুণের কণ্ঠ, সেখানেই ছাত্র আন্দোলনের নতুন মহিরুহের অঙ্কুরোদ্গম হতে পারত। কিন্তু দুর্ভাগ্য—ছাত্র আন্দোলনের সেই অনাবশ্যক দলকানা মনোবৃত্তি আবারও এই সম্ভাবনাকে ধুলিসাৎ করে দিল। দুর্ভাগা শাহবাগের বিভক্তিময় পরিণতির জন্য ছাত্র আন্দোলনের এই অনৈক্যের দায় অন্যতম।

এদিকে শাহবাগ যেহেতু সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তাই একে দমাতে এক মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োজন ছিল শত্রুদের। বরাবরের মতোই তারা ‘ধর্মাস্ত্র’কেই এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে। শাহবাগকে দমাতে ‘হেফাজতে ইসলাম’ নামের এক নব্য ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী অপশক্তির জন্ম হয়েছে। শুরুতে তাকে সযত্নে লালন করে শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কঠোর শক্তি প্রয়োগের জায়গাতেই যেতে হয়েছে সরকারকে। আবার শাহবাগের অবসানে এখন আবার ক্ষমতার রাজনীতির স্বার্থে সেই হেফাজতিদেরই আশকারা দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রের মূলনীতিগত জায়গায় এ ধরনের আপসের ফলে ভবিষ্যতে আরো বড় ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে নিঃসন্দেহে।

আমরা যারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম কিংবা কোনো না কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য শাহবাগে এসেছিলাম, তাদের হয়তো ভিন্ন ভিন্ন স্বপ্ন ছিল। কিন্তু যে আপামর মানুষ শাহবাগে এসেছিল, তারা চেয়েছিল কাদের মোল্লার ফাঁসি, পেয়েছে। তারা চেয়েছিল আইনের সংশোধন, পেয়েছে। তাত্ক্ষণিক সেই দাবির সঙ্গে আরো কয়েকটি দাবি যুক্ত হয়েছিল। সেগুলোও লেগে পড়ে থেকে আন্দোলন করে গেলে জানি একদিন আদায় হবেই, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবেই।


মন্তব্য