kalerkantho


সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতাস্তম্ভ

খান মিজান   

১৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতাস্তম্ভ

ছবি : শেখ হাসান

শত বছরের সংগ্রামের পরম্পরায় ১৯৭১ সালে আমরাও পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এই অর্জনের আনন্দ-বেদনার ইতিহাস স্মরণে দেশের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে স্থাপত্য। তার কয়েকটি নিয়ে সাজানো হয়েছে আজকের নির্মাণ

 

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের সঙ্গে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যোগসূত্রতা একাকার হয়ে আছে। ১৯৭১-এর ৭ই মার্চ বাঙালি জাতির নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই তাঁর অবিস্মরণীয় সেই ভাষণটি দিয়েছিলেন। এখানেই যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানেই সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর প্রথম ভাষণ দিয়েছিলেন। এমন অজস্র ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।

এসব ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে সরকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতাস্তম্ভ  নির্মাণের পরিকল্পনা করে। স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম স্মারক ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মিত এই স্তম্ভ বাঙালির ইতিহাসে যোগ করেছে এক নতুন মাত্রা। উদ্যানের উত্তর পাশে শিখা চিরন্তন বরাবর দক্ষিণ দিকে এর অবস্থান। ভূমি থেকে কিছুটা উঁচুতে নির্মিত একটি প্রশস্ত চৌকো কংক্রিটের চাতালের দক্ষিণ পাশে। চাতালের পশ্চিম পাশে একটি কৃত্রিম জলাধার আর পূর্ব পাশে টেরাকোটায় আচ্ছাদিত একটি অনতি উচ্চ দেয়াল। পেছনেই ভূগর্ভস্থ স্বাধীনতা জাদুঘরে যাওয়ার সিঁড়ি। সন্ধ্যায় কাচনির্মিত স্তম্ভটি একটি আলোকস্তম্ভে পরিণত হয়।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উদ্যোগ নেয় স্বাধীনতাস্তম্ভ ও শিখা চিরন্তন নির্মাণের। স্বাধীনতাস্তম্ভ প্রকল্পের অন্যতম আকর্ষণ জনতার দেয়াল নামে ২৭৩ ফুট দীর্ঘ একটি দেয়ালচিত্র। ইতিহাসভিত্তিক টেরাকোটায় করা পৃথিবীর দীর্ঘতম ম্যুরাল। এর বিষয়বস্তু ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস। চাতাল ঘেঁষে উদ্যানে খনন করা হয়েছে একটি কৃত্রিম জলাশয়।

শিল্পীরা টেরাকোটা ম্যুরালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পুরো চিত্র তুলে ধরেছেন টেরাকোটা ম্যুরালের মধ্য দিয়ে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্লাজা চত্বরের পূর্ব পাশের দেয়ালে করা হয়েছে এ ম্যুরাল। ম্যুরালের প্রথম অংশে দৃশ্যমান বাঙালির চিরচেনা সেই বাক্য ‘ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’। এর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ। পর্যায়ক্রমে তেভাগা আন্দোলনের চিত্র। ১৯৪৮ সালের জিন্নাহর ভাষণ ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’।

ম্যুরালে আরো রয়েছে ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ভাষাশহীদ রফিক, জব্বারের গুলিবিদ্ধ লাশ, ’৫৬-র মওলানা ভাসানীর কাগমারী সম্মেলন, বঙ্গবন্ধুর কারাবরণ, ’৬৯-র গণ-অভ্যুত্থান, আইয়ুব খানের পতন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়—এসব ঘটনা। রয়েছে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণ, ২৫ মার্চে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কালো থাবা, সেক্টর কমান্ডারদের  প্রতিকৃতি, মুক্তিযুদ্ধ এবং সর্বশেষ পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের চিত্র। ম্যুরালের রূপকার পাঁচ বিখ্যাত শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস, মুকুল মকসুউদ্দীন, শিশির ভট্টাচার্য্য, ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ এবং শ্যামল চৌধুরী।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থানগত সংগতিতে দৃশ্যমান হচ্ছে স্তম্ভটি। আধুনিক যন্ত্রশিল্পের বিভিন্ন উপকরণ স্তম্ভ গঠনে সহায়ক হয়েছে। শিল্পীরা দর্শককে সজাগভাবে শিল্পকর্মের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে বিদ্যুতের সাহায্যে আলোর বিচ্ছুরণের মধ্যে বিভ্রম এনেছেন সজীবতা ও সচলতার। কাঠামোর ভাঁজে ভাঁজে আলোর খেলায় সেই চরিত্রগত বক্তব্য প্রকাশিত হয়। যে আকৃতি নির্মাণ করা হয়েছে তাতে উপাদানের নিজস্ব স্বভাব এবং প্রকাশ ক্ষমতার ওপর গুরুত্ব পড়েছে।

 

ভূগর্ভস্থ জাদুঘর

স্বাধীনতাস্তম্ভের সঙ্গে গৌরবময় মাত্রা যুক্ত করেছে ভূগর্ভস্থ জাদুঘর। প্লাজা চত্বরে টেরাকোটা ম্যুরালের নিচের অংশে এর অবস্থান। ওপর থেকে নিচের দিকে নেমে গেছে প্রবেশপথ। যাওয়ার সময় রঙিন কাচ ভেদ করে আসা হালকা সবুজ আলো দেখে গহিন সুড়ঙ্গ অনুভূত হয়। হলঘরে মিলবে অসংখ্য ছবি।

জাদুঘরের ছবিতে ’৬৬-র ছয় দফা আন্দোলন, ’৬৯-র গণ-আন্দোলন সব বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা যাবে। এখানেও রয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো’ নির্মলেন্দু গুণের সেই বিখ্যাত কবিতা আকীর্ণ দেয়ালের এ অংশে। এর পাশে কিছু ঐতিহাসিক দলিলসহ বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষরিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। তার কাছেই চোখে পড়বে গ্রানাইটে নির্মিত ব্ল্যাক জোনের দেয়ালে ছোট ছোট ৭৭টি ছবি।

এসব ছবিতে ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের কালরাত ও পাকবাহিনীর নির্মম কর্মকাণ্ডের গল্প। ব্ল্যাক জোনের বাম পাশে একটি জলধারা। এই জলধারা যেন একাত্তরে সন্তান হারানো মায়ের কান্নার প্রতীক। এরপর দেখা মিলবে নিয়াজির আত্মসমর্পণের দলিলের অনুলিপি। শেষ অংশে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরার ছবি। জাদুঘরের মধ্যে অডিও ভিজ্যুয়াল কক্ষে শুধু স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন আলোকচিত্র দেখানোর জন্য ১৫৬টি আসনের অডিটরিয়াম।

 


মন্তব্য