kalerkantho


উপকরণ-উপাদানে বদলে যাচ্ছে নির্মাণ

হাজার বছর ধরে মানুষ ঘর, দুর্গ ও রাস্তা নির্মাণ করে আসছে। শুরুর দিকে নির্মাণের উপাদান বলতে ছিল শুধু মাটি এবং মাধ্যম ছিল মানুষের শ্রম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছে অনেক উপাদান ও উপকরণ, নকশায় পেয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা। কঠিন কাজের জন্য যুক্ত হয়েছে বিশাল সব যন্ত্রপাতি, আধুনিক সব প্রযুক্তি। অতীত ও বর্তমানের উপাদান, সরঞ্জাম ও শৈলী নিয়েই সাজানো হয়েছে এবারের নির্মাণ

মিজানুর রহমান   

২১ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



উপকরণ-উপাদানে বদলে যাচ্ছে নির্মাণ

নানা প্রয়োজনে মানুষ নির্মাণ করেছে। থাকার তাগিদে নির্মাণ করেছে ঘর, বাণিজ্যের তাগিদে নির্মাণ করেছে বাজার আর চলাফেরার তাগিদে নির্মাণ করেছে রাস্তা ও সেতু। হাজার বছর পরও মানুষের প্রয়োজনটা একই আছে। শুধু বদলেছে উপাদান।

প্রাগৈতিহাসিক যুগের নির্মাণগুলো ছিল মূলত কাদামাটির। এরপর মানুষ পাথরের ব্যবহার করতে থাকে। যুগে যুগে বিবর্তন হতে হতে আজ এই উপকরণগুলোর রয়েছে অনেক বিকল্প। আজও যে মাটির বা পাথরের নির্মাণ হয় না তা নয়। তবে ভালো ও স্থায়ী কিছু নির্মাণ করতে হলে অনুসরণ করতে হয় আধুনিক উপায়গুলোর। এসব আধুনিক উপায়ই বর্তমান সময়ের নির্মাণকে আলাদা করে দেয় অতীতের কাঠামো থেকে।

 

বৈচিত্র্য আসছে নির্মাণ উপাদানে

সাধারণত একটি কাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বিবেচ্য হয় পরিবেশবান্ধব, স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাবহীন এবং দীর্ঘস্থায়ী উপকরণগুলো। কাঙ্ক্ষিত স্থায়িত্বের ওপরও নির্ভর করে কাঠামোতে কোন ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হবে। একটি বাড়িতে যে ধরনের ইট বা সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়, আকাশচুম্বী দালান বা বিশাল ড্যামে তা ব্যবহার করা হয় না।

হাজার ফুট উঁচু মিলাউ ভায়াডাকট থেকে শুরু করে থ্রি গর্জিয়াস ড্যাম, এমনকি বুর্জ খলিফা—এর কোনো কিছুই সম্ভব হতো না যদি এসব উপাদান না থাকত।

 

হারিয়ে যাচ্ছে ইট!

এখনো সাধারণ নির্মাণকাজে মাটি পুড়িয়ে তৈরি ইটের ব্যবহার হয়। তবে আড়ালে একটি বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে। তা হচ্ছে কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার। ইটের বিকল্প হিসেবে এটি জায়গা দখল করবে বলেই ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ এটি ইট থেকে হালকা, খরচে কম এবং দীর্ঘস্থায়ী। পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবের কারণে বিশ্বের নানা দেশে অনেক ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

 

সিমেন্টে কমছে পানির ব্যবহার

বলা হয়ে থাকে—সিমেন্ট একমাত্র উপাদান, যা মানুষ পানির চেয়েও বেশি ব্যবহার করে থাকে (আয়তনের দিক থেকে)। এটি এত বেশি ব্যবহার করা হয় যে বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের ৫ শতাংশই আসে এই নির্মাণসামগ্রীর কারখানা থেকে। উপাদানটি বালু থেকে শুরু করে পাথর পর্যন্ত একসঙ্গে জুড়ে দিতে পারে। রোমান সাম্রাজ্যের সময় ভলকানিক রক থেকে এই উপাদান সংগ্রহ করা হতো। বর্তমানে চুনাপাথর থেকে এটি তৈরি করা হয়ে থাকে। সিমেন্ট পানির সংস্পর্শে এলে বিক্রিয়া করে একধরনের শক্ত দলায় পরিণত হয়। তবে এই প্রযুক্তির পরিবর্তন হতে যাচ্ছে সহসাই। কার্বোনেটেড সিমেন্ট প্রযুক্তিতে পানির ব্যবহার খুব কম। এটি সিমেন্টশিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কার্বন নির্গমন কমাতেও সহায়তা করবে।

 

রডের মানে ছাড় নেই

পৃথিবীতে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় একটি হুমকি হচ্ছে ভূমিকম্প। আর এই ভূমিকম্প থেকে কাঠামোকে রক্ষা করে রড। দালানের মধ্যে রডটি যদি ভালো মানের না হয়, তাহলে বড় ধরনের বিপর্যয় হতে পারে। তাই রডের কাঠামোও বদলে গেছে। বর্তমান সময়ের রডগুলো তৈরি করা হয়ে এই দিকটি মাথায় রেখে। সেই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়িত্বের বিবেচনাও থাকে।

 

সঙ্গী চাই যন্ত্রপাতি

সুরকি ও কাঠামোকে কখনো আকাশচুম্বী উচ্চতায় ওঠাতে হয়। কখনো বা নামাতে হয় ভূমির অনেক অভ্যন্তরে। এই যেমন বুর্জ খলিফা তৈরির জন্য কংক্রিটকে এক হাজার ৯০০ ফুট উঁচুতে তোলা হয়েছিল। এসব কাজ করার জন্য প্রয়োজন হয় শক্তিশালী মোটর, বিশাল সব ক্রেনসহ অনেক যন্ত্রপাতি। আধুনিক নির্মাণের সঙ্গে মেশিনারিগুলো অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত

 

এক্সকাভেটর

বড় নির্মাণ মানে বড় খোঁড়াখুঁড়ি। বিষয়টি ঢাকার মানুষ ছাড়া আর কে ভালো বুঝবে? বর্তমান সময়ে এসব খোঁড়াখুঁড়ির কোনো কাজেই আর মানুষকে হাত দিতে হয় না। বিশাল বিশাল সব রোবটের মতো দেখতে এক্সকাভেটর শুধু এ কাজের জন্যই তৈরি হয়েছে। বর্তমান সময়ের এক্সকাভেটরগুলো আরো অনেক বেশি কার্যকর এবং সহজ। তাই ব্যবহারের ব্যাপ্তিও বেড়েছে।

 

বুলডোজার

ধুলা ও মাটিকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যেতে বুলডোজার কাজে লাগে। বিশাল বিশাল ভারী বস্তু নিমেষেই এক স্থান থেকে আরেক স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায় এই মেশিনের মাধ্যমে।

 

ট্রেঞ্চার

বড়সড় খননকাজ দ্রুত ও সহজে করতে পারে ট্রেঞ্চার। আগে শাবল আর কোদাল দিয়ে শত শত মানুষ এ কাজগুলো করত।

 

ডাম্প ট্রাক

ট্রাককে এই টপিকে আপাতত সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে না হলেও বড় নির্মাণের ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। উঁচু-নিচু নির্মাণ এলাকায় বিশাল ওজনের মাটি বহন করতে এই ট্রাকের প্রয়োজন হয়।

 

ক্রেন

উঁচু নির্মাণের ক্ষেত্রে ক্রেনের সহায়তা আপনার লাগবেই। আগে আমাদের চারপাশে বড় ক্রেন খুব বেশি চোখে না পড়লেও এখন বেশ চোখে পড়ে।

 

হ্যামার

বড় কোনো নির্মাণের জন্য প্রয়োজন হয় শক্ত ভিত্তি। আর এসব ভিত্তি তৈরি হয় অনেকগুলো পাইলের ওপর। এসব পাইলকে মাটিতে গেঁথে দেওয়া হয় হ্যামারের সাহায্যে। যেমন—পদ্মা সেতুর পাইলিংয়ের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় হ্যামারগুলো কাজ করছে।

 

কেমন হবে ভবিষ্যতের নির্মাণ?

সাধারণ বাড়ির তুলনায় ভবিষ্যতে জায়গা করে নেবে স্মার্ট বাড়ি। এ ধরনের বাড়িগুলো হবে খোলামেলা। এসব বাড়িতে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের কমতি থাকবে না কোনো। পর্যাপ্ত দিনের আলো ও বাতাস নিশ্চিত করতে পারলে এসব দালানে বিদ্যুতের ব্যবহার অনেক কমে আসবে। সাশ্রয় হবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির। এতে জীবন হবে তুলনামূলক সহজ।

 

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ


মন্তব্য