kalerkantho

ছায়া হয়ে রব

এক পলকের দেখা, বছর দুয়েক পর আলাপ, তারও অনেক পরে পরিচয়। নিয়মিত দেখাও হয় না। একজন এখন চট্টগ্রামে, অন্যজন ফিনল্যান্ডে। তার পরও টিকে আছে সম্পর্ক। কিভাবে? বলছেন মীর মাইনুল ইসলাম

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ছায়া হয়ে রব

গ্রামের বাড়িতে খুব একটা যাওয়া হয় না, খেজুরের রসও খাওয়া হয় না। সেই লোভেই নানাবাড়িতে বেড়াতে গেলেন এইচএসসির ছাত্র বিপ্লব। পুরো নাম শেখ সাদী বিন ইমরান বিপ্লব। এক সকালে ফজরের নামাজ পড়ে বেরিয়ে গেলেন গ্রামের ভোর দেখতে। বেশ খানিকটা ঘুরে বাড়ি ফেরা শুরু করলেন। হঠাৎ এক কিশোরীর মুখ চোখে পড়ল। কিন্তু আপাদমস্তক চাদরে ঢাকা বলে মুখটি ছাড়া ভালো করে আর কিছুই চোখে পড়ল না। কেন যেন এই মুখটিই ভালো লেগে গেল। ফেরার পথে সমবয়সী এক বড় ভাইয়ের মুখে শুনলেন, মেয়েটিও তার মতোই দাদাবাড়িতে বেড়াতে এসেছে। নাম নূর-ই-জান্নাত। বাসায় ফিরে এইচএসসি পরীক্ষায় ব্যস্ত হয়ে গেলেন। ফলে সেই মুখের কথা মনে রইল না। তবে বছর দুয়েক পর হঠাৎ তাঁকে চমকে দিয়ে ফেসবুকে একটি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এলো—‘নূর-ই-জান্নাত’! অ্যাকসেপ্ট করলেন। জানলেন, সেদিন সকালে মেয়েটিরও তাঁকে ভালো লেগে গিয়েছিল। আর ভুলতে পারেনি। সেই শুরু।

একজন থাকেন টাঙ্গাইলে, পড়েন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। অন্যজন মা-বাবার সঙ্গে থাকেন চট্টগ্রামে। জান্নাতের মোবাইল ছিল না বলে শুরুর দিকে ফেসবুকে সামান্য কথা হতো। মায়ের মোবাইল চুরি করে ফেসবুকে প্রেমিকের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলতেন জান্নাত। তবে টুজির সেই আমলে নেটও বেশ স্লো-ই ছিল। মোবাইলের খরচ বেশি বলে ফোন দিতে পারতেন না। বিপ্লবও ছাত্র মানুষ, অত টাকা পাবেন কোথায়? কখন তাঁর হাতে ফোন থাকে তা-ও জানেন না। উঠতি বয়সী মেয়ে ফোনে আলাপ করে টের পেয়ে মা ফোন আগলে রাখেন। ফলে টানা দু-তিন দিন কোনো সাড়া নেই। চিন্তায় অস্থির হয়ে যান বিপ্লব। মাঝে হাতেনাতে ধরা খেয়ে মাসখানেক মেয়েকে মোবাইলের কাছেও ঘেঁষতে দেননি মা। সেই দিনগুলো বিপ্লবের কী যে কষ্টে গেছে! তার পরও তাঁদের পরস্পরের ওপর আস্থা কমেনি। সারা দিন লুকিয়েচুরিয়ে ফেসবুকে খোঁজখবর নেন, কোনো কোনো দিন মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে বিপ্লবকে ফোন দেন জান্নাত। রান্নাঘর বা বারান্দায় অল্প কয়েক মিনিট নিচু স্বরে কথা বলে আবার ফোন রেখে দেন। সারা দিন সেই ভালো লাগাগুলো নিয়ে ঘুরে বেড়ান। কখনো মা-বাবার গাঢ় ঘুমের সুযোগে বা তাঁরা আত্মীয়বাড়িতে গেলে সারা রাত আলাপ চলে। পরদিন ক্লাসে ঘুম চলে আসে। ফলে স্যার বকেন ভালো ছাত্র বিপ্লবকে। কখনো কখনো প্রেমিককে চিঠি দেন জান্নাত। কিন্তু ধরা পড়ে যাবেন বলে উত্তর দিতে পারেন না বিপ্লব।

চার বছর এভাবে সম্পর্কের পর সিদ্ধান্ত হলো—উভয়ে দেখা করবেন। একা যেতে টেনশন হচ্ছিল বলে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন বন্ধু—সমরকান্তি রায়, রানা হোসেন ও আশিকুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় চলে এলেন বিপ্লব। তবে বিমানবন্দর স্টেশনে নেমে চট্টগ্রামের আন্তনগরের টিকিট কাটার পরই খবর পেলেন, কাল সারা দেশে হরতাল। তার পরও জান্নাতের মুখটি অন্তত ভালো করে একবার দেখার আশায় বন্ধুদের নিয়ে যাত্রা করলেন বিপ্লব। পরদিন খুব ভোরে পৌঁছলেন চট্টগ্রামে। স্যানমার শপিং কমপ্লেক্সে প্রেমিকার হাতে প্রেমিককে সঁপে দিয়ে চট্টগ্রাম ঘুরতে বেরোলেন অন্য বন্ধুরা। প্রথম দেখার ভালো লাগায় তাঁরা দুজনে নেভাল একাডেমি, নগরীর সিআরবিতে বেড়ালেন! অবশ্য রাতের বাসেই আবার ফিরতে হলো। তার পর থেকে বছরে এক কি দুবার টিউশনির টাকা জমিয়ে চট্টগ্রাম চলে যেতেন বিপ্লব। ফেসবুক আর মোবাইলে চলেছে তাঁদের প্রেম। ২০১৬ সালে পদার্থবিদ্যায় প্রথম শ্রেণিতে অনার্স পাস করলেন বিপ্লব।

আইইএলটিএস করে স্কলারশিপ নিয়ে ২০১৬ সালে চিকিৎসা পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স করতে চলে গেলেন ফিনল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ইস্টার্ন ফিনল্যান্ডে। যাওয়ার আগে বলেছিলেন, ‘আমি তো এখন আরো দূরে চলে যাব!’ উত্তরে জান্নাত জানিয়েছেন, ‘দূরে থেকেই তো এত দিন প্রেম করলাম। আরো কয়েকটি বছর না হয় তোমার সাফল্যের জন্য এটুকুও সহ্য করব।’

জান্নাত এখন চিটাগং ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল টেকনোলজিতে তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। পরিশ্রমী, মেধাবী বিপ্লবকে নিয়ে জান্নাতের পরিবারেরও আপত্তি নেই। তবে আগের মতোই রাগ-অভিমান নিয়মিতই হয় দুজনের। ফেসবুকে তখন একে-অন্যকে ব্লক করে দিয়ে রাগ দেখান। প্রেমিকার বন্ধু উম্মে আম্বারা মারিয়ার সাহায্যে তাঁকে ম্যানেজ করেন বিপ্লব। আগের মতো দুজনে কথাও বলতে পারেন না। বাংলাদেশের সময় আর ফিনল্যান্ডের সময় তো মেলে না। ফলে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে কেউ একজন ঘুমিয়ে পড়েন। লাজুক হেসে জান্নাত বললেন, ‘ও ফিরে আসার পর সব কিছু গুছিয়ে বছরদুয়েকের মধ্যে আমরা নতুন যাত্রা শুরু করব।’ কিভাবে এত দিন সম্পর্ক টিকে আছে? তিনি বললেন, ‘পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসের কারণে।’


মন্তব্য