kalerkantho


চৌকস

দৃষ্টিহীন হলেও তুখোড় দাবাড়ু

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



দৃষ্টিহীন হলেও তুখোড় দাবাড়ু

ছবি : ফারদিন রিয়াসাদ খান তাইসির

২০১৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব দাবা ফেডারেশন প্রকাশিত ফিদে রেটিংয়ে বাংলাদেশের দুজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর নাম ওঠে। তাদের মধ্যে একজন চট্টগ্রামের সুরত আলম। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি কোনো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দাবাড়ুর নাম ওঠার ঘটনা সেটাই প্রথম। তুখোড় এই দাবা খেলোয়াড়ের কথা জানাচ্ছেন আরাফাত বিন হাসান

 

২০১৬ সালেই বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশন আয়োজিত জাতীয় জুনিয়র দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে ২৫তম হয় সে। চারজন রেটেড খেলোয়াড়ের মুখোমুখি হয়ে হারায় তিনজনকেই। সে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও তার প্রতিপক্ষরা সবাই সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ। ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় আন্ত স্কুল ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় দাবায় অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়। একই বছর চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা আয়োজিত দাবা প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অর্জন করে। ২০১৭ সালে চট্টগ্রামের মুরাদপুর সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের ছয়জনের যে দলটি আন্ত স্কুল দাবা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়, সে দলের নেতা ছিল সুরত আলম।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা সাধারণত নিজেদের মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে পারলেও বেশির ভাগ সময় তাদের প্রতিপক্ষ থাকে স্বাভাবিক মানুষ। আর তাদের সঙ্গে খেলতে হলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের দুটি দাবা বোর্ড ছাড়াও একজন সহকারীর প্রয়োজন হয়। দুটি দাবা বোর্ডের মধ্যে একটি বিশেষভাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য তৈরি। এটি পরিচিত টেকটাইল বোর্ড নামে। হাতের স্পর্শের মাধ্যমে সাধারণত একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দাবাড়ু কাঠের এই বোর্ডের ঘরগুলোর অবস্থান বুঝতে পারে। ঘুঁটিগুলোও তৈরি করা হয় ব্যতিক্রমীভাবে। কাঠের তৈরি বোর্ডের সাদা ও কালো রঙের ঘুঁটিগুলোর মধ্যে পার্থক্য রাখা হয়। ঘুঁটিগুলো চেনার জন্য আলাদা আলাদা চিহ্ন দেওয়া থাকে। সাদা ঘুঁটির ওপর আলপিনের ডগার মতো একটি চিহ্ন থাকে, অন্যদিকে কালো ঘুঁটিগুলো থাকে মসৃণ। এই চিহ্নের সাহায্যে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দাবাড়ু সহজেই চিহ্নিত করতে পারে ঘুঁটিগুলো। বোর্ডের মধ্যে উঁচু ও নিচু দুই ভাগে ঘর থাকে। নিচু বোর্ডে সাদা ঘুুঁটি ও উঁচু বোর্ডে কালো ঘুঁটি বসানো হয়। দুটি বোর্ডের মধ্যে আরেকটি হলো সাধারণ দাবা বোর্ড। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দাবাড়ু তার চাল দেওয়ার সময় টেকটাইল বোর্ড ব্যবহার করে। তার সহকারী প্রতিপক্ষের চাল অনুযায়ী টেকটাইল বোর্ডে ঘুঁটি বসিয়ে দেয় এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দাবাড়ুর চাল অনুযায়ী সাধারণ দাবা বোর্ডে ঘুঁটি বসায়। এ ক্ষেত্রে দুজন দাবাড়ুর (দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং স্বাভাবিক) জন্যই সমান সময় বরাদ্দ থাকে।

শুধু দাবা নয়, সুরত ক্রিকেটও খেলে দারুণ। জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট টিমে। তবে দাবার প্রতিই তার আগ্রহটা বেশি। তবে চট্টগ্রাম নগরের হাজেরা তজু কলেজের একাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া সুরত জানিয়েছে, ইচ্ছা থাকার পরও সে অর্থাভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেনি বেশ কিছু আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতায়।

সুরত আলম বোঝে চোখে না দেখার কষ্ট। তার মতো অন্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিয়েও ভাবে সে। দাবা খেলার সুবাদে তার পরিচিতি কাজে লাগিয়ে সুযোগ পেলেই অন্ধ শিক্ষার্থীদের শ্রুতিলেখক খুঁজে দেয়। ভবিষ্যতে দক্ষ আইনজীবী হয়ে দেশের উন্নয়নের অংশীদার হতে চায় সে। আর স্বপ্ন দেখে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে দাবায় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার।


মন্তব্য