kalerkantho


প্রেরণার কত ইচ্ছা!

বিতর্ক, আবৃত্তি, কারাতে, উপস্থাপনা—সব বিষয়েই প্রেরণার তুলনা মেলা ভার। তার নাড়ি-নক্ষত্রের খবর জানাচ্ছেন আরাফাত-বিন-হাসান

১৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



প্রেরণার কত ইচ্ছা!

প্রেরণা তখন খুব ছোট। মাত্র স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। ওই বয়সে চারপাশটা তাকে জানিয়ে দেয় বড় হয়ে ডাক্তার, নয়তো ইঞ্জিনিয়ার হতেই হবে। ‘ডাক্তার’ শব্দটি ‘ইঞ্জিনিয়ার’ শব্দের চেয়ে উচ্চারণ করা সহজ। তা ছাড়া তার ইচ্ছা বড় হয়ে মানুষের সেবা করবে। এদিকে তাকে বড়রা বোঝালো ডাক্তার হতে পারলে খুব সহজে মানুষের সেবা করা যাবে। অতএব সে ঠিক করল ডাক্তারই হবে। আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে সে। একদিন টিভিতে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম দেখে ভালো লেগে যায় তার। এবার তার ইচ্ছা হলো বড় হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার। ঝোঁকটা আসে সেনা সদস্যদের পোশাক, চলন-বলন, শৃঙ্খলাবদ্ধ কার্যক্রম এসব দেখে। ওর পুরো নাম প্রযুক্তা প্রেরণা চৌধুরী। চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছে এবার। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছাটা এখনো আছে মনে। স্কুলে থাকতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিত এমন সব সহশিক্ষা কার্যক্রমে ছিল তার সরব উপস্থিতি। স্কুলের প্যারেড দলের কমান্ডার ছিল দুইবার। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় নাম লেখায় স্কুলের রেড ক্রিসেন্ট দলে। নবম শ্রেণিতে পেয়েছিল রেড ক্রিসেন্ট স্কুল ইউনিটের যুব প্রধানের দায়িত্ব। এ ছাড়া পঞ্চম বিভাগীয় যুব রেড ক্রিসেন্ট ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করে সর্বোচ্চ পদ পাইলটের জন্য নির্বাচিত হয়। নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা, কমান্ড দেওয়া, প্যারেডের ধরন ইত্যাদি দেখে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে থেকে দুজন ছেলে ও দুজন মেয়েকে পাইলট হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এদিকে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে গার্ল গাইডসের আটজনের একটি দল স্কুলের হয়ে অংশ নিয়েছিল। ওই দলের একজন ছিল প্রেরণা। সেইবার তাদের দল জেলাপর্যায়ে প্রথম হয়েছিল।

যুক্তি দিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে তার, ভালোবাসে যুক্তি নিয়ে খেলতে। যুক্তির প্রতি এই ভালোবাসা তাকে পরিণত করেছে একজন দক্ষ বিতার্কিকে। এনে দিয়েছে অনেক সম্মাননা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিডিএফ এমআরডিআইবিডি ও ইউনিসেফ আয়োজিত জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা (স্কুলভিত্তিক)-২০১৬ এর চ্যাম্পিয়ন (দলীয়), রয়াল সিমেন্ট দৃষ্টি ডিবেট জিনিয়াস ২০১৫-এর প্রথম রানার-আপ, মুক্তিযুদ্ধ গবেষণাকেন্দ্র চট্টগ্রাম আয়োজিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক আন্ত স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন (দলীয়) হওয়া। বিতর্কে অংশ নিতে গিয়ে ঘটেছে বিভিন্ন মজার ঘটনা। একবার ঢাকায় একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতা ছিল। তাদের টিমের তিনজন তিন ক্লাসের হলেও দারুণ বোঝাপড়া ছিল। ঢাকায় তাদের থাকার জায়গা হয় একটি রেস্ট হাউসে। রাতে ঘুমানোর আগে বেশ কিছুক্ষণ দরজা বন্ধ করে বিতর্ক নিয়ে শলাপরামর্শ করে নিত তিনজনে। কিন্তু অন্য যে বিতার্কিকরা একই রেস্ট হাউসে ছিল তাদের সামনে এমন ভান করত যেন সারাটা সময় অলস কাটিয়েছে। আবার বিতর্কে হেরে গেলেও ইচ্ছা করেই দেরি করত যেন লাঞ্চটা মিস না যায়। এসব ভেবে এখনো হাসি পায় তার।

তার ধারণা, আইনজীবীরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মাধ্যমে বিতর্কে শাণ দেওয়ার মোক্ষম সুযোগ পেয়ে থাকেন। তাই বিতর্কের টানে মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে আইনজীবী হওয়ার। আবার দেশের কর্মক্ষম যুবকদের অনেকেই বেকার। তার মতে, নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হলে এই বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তাই উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছাটাও জমা হয়েছে মনের কোণে।

তবে সে যেটাই হোক না কেন, তার চাই সবচেয়ে সফল ও পারদর্শী হওয়া। এ ছাড়া তার মা-বাবা চান সে এমন কিছু করুক যেন তার কাজের মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হয়। মা-বাবার কথায় পূর্ণ সমর্থন আছে তার। সে নিজেও চায় কাজের মাধ্যমে মানুষের সেবা করতে।

প্রেরণার অর্জনের ঝুলিটাও বৈচিত্র্যময়। রয়াল সিমেন্টের পৃষ্ঠপোষকতায় দৃষ্টি চট্টগ্রামের আয়োজনে ‘সপ্তম রয়াল সিমেন্ট দৃষ্টি বিজনেস আইডিয়া কনটেস্ট’-এর রানার-আপ সে। প্রেরণা জানায়, এই প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন বিজনেস রিলেটেড কেস দেওয়া হতো তাদের। কারাতেও দক্ষ সে। চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থায় কারাতে প্রশিক্ষণে ভর্তি হয়। প্রথমবারেই ডাবল প্রমোশন পেয়ে সাদা বেল্ট থেকে সরাসরি কমলা বেল্টে উত্তীর্ণ হয়। পরে গ্রিন বেল্ট অর্জন করে শোতোকান কারাতে ষষ্ঠ কিউতে উত্তীর্ণ হয়। সে সুবাদে জাপান কারাতে অ্যাসোসিয়েশনের ব্ল্যাক বেল্টধারী বিখ্যাত কারাতেকা ড. ডেভ হুপরের কাছে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ হয়েছে তার।

প্রেরণা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের হয়েও কাজ করে। আন্তর্জাতিক শিশু দিবসে কাজ করেছে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে। আমেরিকান সেন্টার ঢাকার সহায়তায় সাউথ এশিয়ান ইয়ুথ সোসাইটি (ঝঅণঝ) আয়োজিত ‘গার্লস ফর গ্লোবাল গোলস’-এর অল্পসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবকের মধ্যে সে একজন।

এর বাইরে উপস্থিত বত্তৃদ্ধতা, রচনা, চিত্রাঙ্কন, সুন্দর হাতের লেখা—এসবেও দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে বারবার। ২০১৩ সালে দৈনিক পূর্বকোণ আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম, তথ্য অধিকার দিবস উপলক্ষে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি আয়োজিত আন্ত বিদ্যালয় রচনা প্রতিযোগিতায় তৃতীয়, পিকেএসএফের সহায়তায় আইডিএফ আয়োজিত উপস্থিত বক্তৃতায় দ্বিতীয় স্থান লাভসহ এই চারটি বিষয়ে তার ঝুলিতে রয়েছে দুই ডজনেরও বেশি পুরস্কার।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বাজেট পরিকল্পনায় শিশু বাজেটবিষয়ক বৈঠকে নির্বাচিত শিশুদের মধ্যে একজন ছিল সে। আর ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি। প্রেরণা কথা বলেছিল প্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে, যা অতিথিদের মনে খুব নাড়া দিয়েছিল। কারণ অন্য সব শিশু প্রতিনিধি যেসব বিষয় তুলে ধরেছিল, সেগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল প্রেরণার প্রস্তাব।

আবৃত্তি আর উপস্থাপনায়ও কম যায় না। ‘দৃষ্টি চট্টগ্রাম’-এর হয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন জায়গায় দলীয় ও একক আবৃত্তি পরিবেশনে ডাক আসে তার। আবার বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রে বিতর্ক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক সে। অবসর কাটে ছবি এঁকে, অরিগ্যামি করে কিংবা বই পড়ে।

এসএসসিতে তার সহপাঠীদের মধ্যে অনেকে গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেলেও প্রেরণা পায়নি। কিন্তু এতে তার আক্ষেপ নেই। আক্ষেপ নেই তার মা-বাবারও। মেয়ে যে নানা বিষয়ে পারদর্শী হয়ে উঠেছে এতেই তাঁরা খুশি।

ছবি : প্রমুগ্ধা লিয়েনা চৌধুরী


মন্তব্য