kalerkantho


প্রথম কিস্তি৩৮তম বিসিএস পরীক্ষা

লিখিত পরীক্ষায় টিকতে হলে

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



লিখিত পরীক্ষায় টিকতে হলে

৩৮তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। এবার লিখিত পরীক্ষার মহারণ। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ছয় কিস্তির ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র। লিখছেন ৩৬তম বিসিএসে অ্যাডমিন ক্যাডারে প্রথম ইসমাইল হোসেন

 

►       ৩৫তম বিসিএস থেকে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে নতুন সিলেবাসে। প্রথমেই সিলেবাসে চোখ বুলিয়ে নিন

 

►       সাহিত্য অংশটির পরিধি বেশ বড়। পিএসসি নির্ধারিত লেখক সম্পর্কে ভালো করে পড়বেন প্রথমে

 

►       কোনো বিষয় সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকলে নিজের মতো করে লিখতে পারবেন

 

তুমুল প্রতিযোগিতামূলক বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় যাঁরা উতরে গেছেন, তাঁদের অভিনন্দন। এবার লিখিত পরীক্ষার পালা। প্রিলির মতো লিখিত পরীক্ষা শুধু পাস-ফেলের পরীক্ষা নয়। ভালো নম্বর পেয়ে পাস করার পরীক্ষা। ভালো নম্বর না পেয়ে পাস করা আর ফেল করা প্রায় সমান কথা। ভালো নম্বর তুলতে না পারলে ভালো ক্যাডার পাওয়া যাবে না। বাদ পড়তে পারেন বিসিএস থেকেও। তাই প্রস্তুতিটাও হওয়া চাই যথাযথ।

 

বাংলাকে হেলাফেলা নয়

বাংলা প্রথম পত্রে বরাদ্দ ১০০ নম্বর। দ্বিতীয় পত্রে আরো ১০০। প্রথম পত্র সাধারণ ও টেকনিক্যাল উভয় ক্যাডারের প্রার্থীদের। বাংলা দ্বিতীয় পত্র শুধু সাধারণ ক্যাডারের জন্য। মায়ের ভাষা বলে অনেকেই বাংলাকে হেলাফেলা করেন। হেলাফেলা করলেই সর্বনাশ। বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় যেকোনো বিষয়ই গড়ে দিতে পারে বড় ব্যবধান। আর লিখিত পরীক্ষায় বাংলা তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। প্রিলিমিনারিতে যেহেতু টিকেছেন, মেধা নিশ্চয়ই আছে। একটুখানি কৌশল, বাকিটা পরিশ্রম এগিয়ে রাখবে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে।

 

নম্বর বণ্টন

বাংলা প্রথম পত্রে ব্যাকরণ অংশে বরাদ্দ ৩০ নম্বর। প্রশ্ন করা হবে শব্দগঠন, বানান বা বানানের নিয়ম, বাক্যশুদ্ধি বা প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ, প্রবাদ-প্রবচন ও বাক্যগঠন থেকে। লিখতে হবে ভাবসম্প্রসারণ ও সারমর্ম। প্রতিটিতে নম্বর বরাদ্দ ২০ করে। বাকি ৩০ নম্বর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। এ অংশে শর্ট টাইপের প্রশ্ন বেশি হতে পারে। দ্বিতীয় পত্রে ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ, কাল্পনিক সংলাপ লিখন, পত্রলিখন, গ্রন্থ সমালোচনা—প্রতিটিতে ১৫ নম্বর করে মোট ৬০ নম্বর বরাদ্দ। সবচেয়ে বেশি নম্বর রচনা লিখনে। এতে থাকবে ৪০ নম্বর।

 

সিলেবাস ও প্রশ্ন দেখে প্রস্তুতি

৩৫তম বিসিএস থেকে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে নতুন সিলেবাসে। প্রথমেই সিলেবাসে চোখ বুলিয়ে নিন। তারপর নজর দিন বিসিএসে আসা বিগত বছরের প্রশ্নগুলোর দিকে। এতে প্রশ্ন কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা পেয়ে যাবেন। দশম থেকে ৩৭তম বিসিএসের ব্যাকরণ ও সাহিত্য প্রশ্ন প্রস্তুতিতে কাজে আসবে। বিগত সালের পরীক্ষায় আসা ব্যাকরণ, শুদ্ধিকরণ, প্রবাদ-প্রবচন ও বাগধারা, বিভিন্ন ধরনের পত্র লেখার নিয়ম ভালো করে পড়ুন। দরখাস্ত, মানপত্র বা চিঠি ইত্যাদি লেখার নিয়ম আয়ত্ত করতে পারলে প্রশ্ন যে রকমই হোক না কেন, উত্তর লিখে আসতে পারবেন। বিগত সালে পরীক্ষায় আসা সারমর্ম বা সারাংশ ও ভাবসম্প্রসারণের উত্তর বানিয়ে লেখার অভ্যাস করুন। যত বেশি অনুশীলন করবেন, প্রস্তুতি তত ভালো হবে।

 

সহায়ক বই

হুমায়ুন আজাদের ‘লাল নীল দীপাবলী বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী’ বইটি পড়তে পারেন। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনকাল থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত ইতিহাস খুব সুন্দরভাবে সহজ-সরল ভাষায় লেখা আছে এতে। মাহবুবুল আলমের ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ বইটিও পড়তে পারেন। ব্যাকরণ অংশের জন্য হুমায়ুন আজাদের ‘কতো নদী সরোবর অথবা বাঙলা ভাষার জীবনী’ বইটি সহায়ক হবে। এ ছাড়া নবম-দশম শ্রেণির বোর্ডের বাংলা ব্যাকরণ বই তো আছেই। বাংলা বানান, শুদ্ধিকরণ প্রভৃতির জন্য বাংলা একাডেমি প্রণীত ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের শেষে ‘প্রমিত বাংলা বানান’ নামে একটি অধ্যায় আছে। মনোযোগ দিয়ে এই অংশটা দেখলে বানান বিষয়ে ভালো ধারণা পাবেন।

 

প্রস্তুতি নেবেন যেভাবে        

ব্যাকরণ অংশে কিছু টপিকস নির্দিষ্ট আছে। যেমন শব্দগঠন, বানান ও বানানের নিয়ম, বাক্যশুদ্ধি ও প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ, প্রবাদের নিহিতার্থ ব্যাখ্যা ও বাক্যগঠন মনোযোগ দিয়ে পড়লে অল্প সময়ে এর জন্য ভালো প্রস্তুতি নেওয়া যায়। ব্যাকরণ অংশের জন্য কতো নদী সরোবর অথবা বাঙলা ভাষার জীবনী, বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, ভাষা-শিক্ষা, দর্পণ বুঝে বুঝে পড়তে হবে।

ভাবসম্প্রসারণের জন্য দেখতে পারেন সৌমিত্র শেখরের বাংলা দর্পণ ও ভালোমানের আরো দু-একটি বই। সহজ-সুন্দর ভাষায় ২০টি প্রাসঙ্গিক বাক্য লিখলেই চলে ভাবসম্প্রসারণে। উদাহরণ আর উদ্ধৃতি দিলে মান বাড়বে। সারমর্ম লিখতে হবে তিন-চারটি সহজ-সুন্দর বাক্যে।

সাহিত্য অংশটির পরিধি বেশ বড়। পিএসসি নির্ধারিত লেখক সম্পর্কে ভালো করে পড়বেন প্রথমে। তারপর বাছাই করে অন্য লেখকদের সাহিত্যকর্ম দেখবেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যবিষয়ক প্রশ্নের উত্তর লাল নীল দীপাবলী, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস—বইগুলো থেকে পড়তে পারেন, অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো বাদ দিয়ে। উদ্ধৃতি দিলে এতে নম্বর বেশি পাবেন। গ্রন্থ সম্পর্কে না জানলে বা বইটি না পড়ে থাকলে গ্রন্থ সমালোচনা লিখতে পারবেন না। তাই এই অংশে সময় দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিখ্যাত বইগুলোই পড়বেন।

 

রচনায় সবচেয়ে বেশি নম্বর

বাংলায় সবচেয়ে বেশি নম্বর বরাদ্দ রচনা লিখনে। এতে থাকবে ৪০ নম্বর। রচনা আসতে পারে সমসাময়িক কোনো ইস্যু, জাতীয় সমস্যা ও সমাধান, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে। বাংলা রচনা কতটুকু লিখবেন—এ নিয়ে অনেকের চিন্তার শেষ নেই। অনেকেরই ধারণা, যত বেশি লেখা যায় নম্বর তত বেশি। এটা মোটেই ঠিক নয়। প্রাসঙ্গিক তথ্য-উপাত্ত ছাড়া যদি অযথাই পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরাট করে যান, তাতে লাভ হবে না। বরং এটা পরীক্ষকের বিরক্তির উদ্রেক ঘটাতে পারে। রচনা যত বেশি তথ্য-উপাত্তসমৃদ্ধ করতে পারবেন, ততই ভালো। রচনায় ভালো করার জন্য দৈনিক পত্রিকাগুলোর সম্পাদকীয় পাতা নিয়মিত পড়লে কাজে দেবে। টপিক ধরে ধরে ফ্রিহ্যান্ড লেখার অভ্যাসও এগিয়ে রাখতে পারে।

 

ভালো নম্বর পাওয়ার কৌশল

সাহিত্যের প্রশ্নগুলোর উত্তর এককথায় না লিখে তিন বা চারটি বাক্যে লিখুন। প্রথমে সূচনামূলক একটি বাক্য, মাঝে মূল কথা শেষে এককথায় মন্তব্য, এভাবে লিখতে পারেন। ব্যাকরণের প্রশ্নগুলো সামঞ্জস্য বজায় রেখে লিখুন। অতিরিক্ত লিখবেন না। ভাবসম্প্রসারণে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইংরেজি কোটেশন দেওয়া যায়। সারাংশ, সারমর্ম দুর্বোধ্য শব্দে না লিখে সহজ অথচ সাহিত্যরসসমৃদ্ধ শব্দে লিখুন। অনুবাদের ক্ষেত্রে আক্ষরিক অনুবাদ না করে ভাবানুবাদ করুন। ইংরেজি ও বাংলা দৈনিক পত্রিকার আর্টিকল ও সম্পাদকীয় থেকে বাংলা থেকে ইংরেজি আর ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদের চর্চা করলে কাজে আসবে।

গ্রন্থ সমালোচনার ক্ষেত্রে প্রথমেই গ্রন্থ সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য দিন। লেখকের পরিচয়, গ্রন্থ সম্পর্কে আলোচনা বা সমালোচনা, চরিত্রের বর্ণনা, নামকরণের সার্থকতা, গ্রন্থ সম্পর্কে অন্য লেখকদের মন্তব্য, সমাপ্তিসূচক মন্তব্য, এভাবে লিখতে পারেন। কাল্পনিক সংলাপের জন্য পত্রিকার গোলটেবিল বৈঠকগুলোর মিনিটস্, টক শো, গাইড বই থেকে বিভিন্ন টপিক সম্পর্কে ধারণা নিন। চরিত্র নির্দিষ্ট না করে দিলে তিন-চারটি চরিত্রে সংলাপ লিখুন। গতিশীল সংলাপ লিখুন। এবং সংলাপের শেষে অবশ্যই সমাধানে আসুন।

পত্র, দরখাস্ত, মানপত্র, প্রতিবেদন ইত্যাদির ক্ষেত্রে নিয়মগুলো ঠিক রেখে নিজের ভাষায় লিখুন।

প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে তথ্যবহুল লেখা লিখুন। অল্প কথায় কাজ হলে বেশি লেখার প্রয়োজন কী? লেখার পরিধি গুরুত্বপূর্ণ নয়। উপস্থাপনা ও তথ্যবহুল সামঞ্জস্যপূর্ণ লেখা বেশি গ্রহণযোগ্য। গুরুত্বপূর্ণ অংশ (তথ্য, উপাত্ত, কবিতার লাইন, বাংলা ও ইংরেজি কোটেশন) রঙিন কালির কলম দিয়ে লিখতে পারেন।

 

লিখতে হবে নিজের ভাষায়

লিখিত পরীক্ষায় দুই ধরনের প্রশ্ন থাকে। একটি ব্যাখ্যামূলক, যাতে পূর্ণ নম্বর পাওয়া যায় না। যেমন রচনা, ভাবসম্প্রসারণ। আর অন্যটি হলো সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন, মানে ব্যাকরণ। এতে পূর্ণ নম্বর পাওয়া যায়। ২০০ নম্বরের মধ্যে ১৪০ নম্বরেই মুখস্থবিদ্যার বালাই নেই। ভাবসম্প্রসারণ, সারমর্ম, বাংলা অনুবাদ, কাল্পনিক সংলাপ লিখন, পত্র লিখন, গ্রন্থ সমালোচনা, রচনা লিখন সাধারণত কমন পড়ে না। এতে লিখতে হবে নিজের ভাষায় কিংবা বুঝেশুনে। এগুলো লেখার সাধারণ নিয়মগুলো জানতে হবে। মাথায় রাখতে হবে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত। কোনো বিষয়ে ভালো ধারণা থাকলে নিজের মতো করে লিখতে পারবেন।

 

উপস্থাপনায় জোর দিন

অনেকের উত্তরপত্রে তথ্য কম, একই কথার পুনরাবৃত্তি ও ভুল তথ্য থাকে। এগুলো নম্বর কমিয়ে দেয়। লেখায় থাকতে হবে প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় সব তথ্য। ভুল বানান ও বাক্য, যতি চিহ্নের সঠিক ব্যবহার না থাকলেও নম্বর কম দেন পরীক্ষকরা। নম্বরের সঙ্গে উত্তরের পরিধির সামঞ্জস্য, আপডেট তথ্য থাকতে হবে। হাতের লেখা ও উপস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাতের লেখা সুন্দর হলে ভালো। না হলেও অসুবিধা নেই। আপনি যা লিখছেন তা যেন স্পষ্ট হয়। অর্থাৎ পরীক্ষক আপনার খাতা পড়তে পারলেই চলবে। লেখায় অতিরিক্ত কাটাকাটি, হাতের লেখা অতিরিক্ত বড় বা ছোট হলে পরীক্ষক বিরক্ত হতে পারেন। এখন থেকেই প্রস্তুতি নিন। পরীক্ষা ভালো হবেই।


মন্তব্য