kalerkantho


অধিগ্রহণের টাকা দেয়নি প্রশাসনের ওপর গোসসা

বিষ্ণু প্রসাদ চক্রবর্ত্তী, বাগেরহাট   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



অধিগ্রহণের টাকা দেয়নি প্রশাসনের ওপর গোসসা

দুই বছর আগে কাজ শুরু হলেও জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা দেয়নি বাগেরহাট জেলা প্রশাসন। এ কারণে শরণখোলা উপজেলায় বলেশ্বর নদের পাড়ে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।

দুই বছরে এগিয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ কাজ।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে সিডরে ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে শরণখোলায় বলেশ্বর নদের বেড়িবাঁধ ধ্বংস হয়ে যায়। উপজেলার চারটি ইউনিয়নের গ্রামের পর গ্রাম লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। শিশু থেকে শুরু করে নানা বয়সের নারী-পুরুষ, ঘরবাড়ি, গবাদি পশু, মাছ ধরার জাল-নৌকাসহ মালামাল পানিতে ভেসে যায়। সরকারি হিসাবে এ উপজেলায় ৬৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বিভাগ জানায়, জেলায় তাদের ৩১৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। সিডরে বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চার গুচ্ছপর্বে বাগেরহাট সদর, শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, রামপাল এবং খুলনার দাকোপ উপজেলায় মজবুত ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত জলকপাট নির্মাণ ও মেরামত, নদীভাঙন রোধ এবং ছোট নদী-খাল খনন করা হচ্ছে।

দ্য ফাস্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো অফ হ্যানান ওয়াটার কনসাভেন্সি নামে চায়নার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই বাঁধ নির্মাণের কাজ করছে। বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

শরণখোলায় বলেশ্বর নদের পাড়ে সম্প্রতি গিয়ে দেখা গেছে, রাজেশ্বর আর সোনাতলা এলাকার কিছু অংশে বাঁধের ওপর উঁচু করে মাটি ফেলে রাখা হয়েছে। কোনো কোনো স্থানে বালুও ফেলা হয়েছে। রাজেশ্বরের একটি পয়েন্টে বাঁধের পাশে সিমেন্ট-বালু-পাথর দিয়ে তৈরি ব্লক বসানো হচ্ছে। কয়েকজন শ্রমিক এ কাজ করছে। চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একজন প্রতিনিধি ওই কাজ তদারকি করছেন। প্রায় আধাকিলোমিটার দূরে গাবতলায় ব্লক তৈরির কাজ চলছে। রায়েন্দায় বাঁধের পাশে নদীর মুখে থাকা পরিবারগুলো তাদের বাড়িঘর ভেঙে মালামাল নিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। বলেশ্বর নদের চরে বনায়ন করা হয়েছে। বাঁধের পাশে ঝুপড়ি ঘরে দেখা গেছে, কয়েকটি পরিবারের বসবাস। ওই পরিবারগুলোর অভিযোগ—ত্রাণ সহায়তা পেলেও তাদের ঘর মেলেনি।

সাউথখালী ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সাইফুল ইসলাম জানান, বেড়িবাঁধের পাশে তাঁর ঘরবাড়ি, গাছপালসহ প্রায় ১২ শতাংশ জমি অধিগ্রহণের আওতায় পড়েছে। এক বছর আগে তাঁর জমিতে মাটি ভরাট করা হয়েছে; কিন্তু আজ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি।

চালিতাবুনিয়া গ্রামের মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার পাঁচ কাঠা জমি অধিগ্রহণ করার নোটিশ পেয়েছি; কিন্তু ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আগেই জমিতে মাটি ভরাট করা হয়েছে। ’

সাউথখালী গ্রামের হাবিবুর রহমান ও মনির হাওলাদার জানান, এক বছর আগে বাঁধের পাশে তাঁদের পুকুর এবং বাড়িঘরে মাটি ফেলে ভরাট করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার কথা তাঁরা শুনেছেন। তবে কবে নাগাদ হাতে পাবেন, তাঁরা জানেন না।

স্থানীয় কলেজশিক্ষক বাবুল দাস বলেন, ‘সিডরের পর এলাকাবাসীর দাবি ছিল, ত্রাণ চাই না, টেকসই বাঁধ চাই। দুই বছর আগে বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে; কিন্তু কাজের যে গতি তাতে কবে নাগাদ শেষ হবে, তা কেউ বলতে পারছে না। ’

জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা জানায়, বেড়িবাঁধের জন্য ৭৪ একর জমি অধিগ্রহণ করতে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে চলতি বছরের ১৩ জুলাই চূড়ান্ত অনুমতি পাওয়া গেছে। এখন ঘরবাড়ি এবং গাছপালার মূল্য নির্ধারণের জন্য গণপূর্ত এবং বন বিভাগের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যেসব জমি অধিগ্রহণ করা হবে, তার মূল্য নির্ধারণ করা হলেই ক্ষতিপূরণের টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প ধাপ-১-এর (সিইআইপি-১) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুল হান্নান জানান, শরণখোলা থেকে মোরেলগঞ্জ পর্যন্ত নদীপাড়ে ৬২ কিলোমিটার মজবুত ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে। ১২ থেকে ১৪ ফুট উচ্চতার বাঁধের ওপরের অংশে প্রস্থ হবে ১৪ ফুট। সিমেন্ট ও বালুর সঙ্গে পাথর দিয়ে এমনভাবে ব্লক নির্মাণ করে বসানো হবে, যাতে ঢেউয়ের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস এই বাঁধ মোকাবেলা করতে পারবে। তিনি বলেন, জমি অধিগ্রহণের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে অনেক আগে জেলা প্রশাসক বরাবর প্রয়োজনীয় অর্থ জমা দেওয়া হয়েছে।

বাঁধ নির্মাণকারী চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক লিউ টাইলিয়াং বলেন, ‘২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি আমরা বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করেছি। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে কাজ শেষ হওয়ার কথা। এটি ৫০ বছর টিকসই হবে। কিন্তু আমাদের কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। জমি অধিগ্রহণ করে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। কাজ শুরুর প্রায় দুই বছরেরও মালিকরা ক্ষতিপূরণের টাকা পায়নি। মালিকরা অন্যত্র সরে না যাওয়ায় কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ’

এ বিষয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক তপন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে পদ্ধতিগত জটিলতা তৈরি হয়। কারণ সেখানে আগে থেকে একটি বেড়িবাঁধ ছিল। অধিগ্রহণের কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। শিগগিরই জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া হবে। ’


মন্তব্য