kalerkantho

সুখে নেই সুখীরা

সোহেল হাফিজ, বরগুনা ও মির্জা খালেদ, পাথরঘাটা   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সুখে নেই সুখীরা

পাথরঘাটার এক সিডর শিশুর নাম সুখী। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে তার বাবার মৃত্যু হয়।

তখন সুখীর বয়স তিন-চার বছর। সেই থেকে পিতৃহীন এই শিশুকে আগলে রেখে অনেক কষ্টে বড় করেন অসহায় মা। রোগাক্রান্ত মায়ের স্বপ্ন ছিল মেয়েকে সরকারি চাকরিজীবী বানাবেন। কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। মেধাবী সুখী যখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী তখন স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবারের বখাটে সন্তানদের চাপ ও প্রলোভনে এক অশিক্ষিত ছেলের সঙ্গে তাকে বাল্যবিয়ে দিতে বাধ্য হন মা। শেষে দাম্পত্য কলহে অল্প সময়েই ভেঙে যায় সুখীর সংসার।

পাথরঘাটার তরুণী সুখীর মতোই ভালো নেই জেলার শত শত সিডর শিশু। সিডরে বাবা-মাকে হারানো এই শিশুদের অনেকেই এখন কিশোর-তরুণ। অভাব-অনটন আর সামাজিক বঞ্চনা নিয়ে জীবন যাপন করছে তারা।

অনেকেই দিনমজুর। কন্যাশিশুদের অনেকে বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে ভুগছে নানা সামাজিক সমস্যায়। ভুগছে রোগে-শোকেও। কারো কারো সংসার ভেঙে গেছে। স্বামীহারা তরুণীদের অনেকেই শ্বশুরবাড়ির স্বজন, দেবর, ভাশুরকে বিয়ে করে আবার সংসারী হয়েছেন। আবার অনেকের মা-বাবার মৃত্যু নিবন্ধনও হয়নি। সরেজমিনে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।

সিডরে শুধু পাথরঘাটা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ৩৪৯ জনের মৃত্যু হয়। তাঁদের ৪৬ জনই ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম পুরুষ। পাথরঘাটার বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন সংকল্প ট্রাস্টের একটি জরিপসূত্রে জানা গেছে, ওই ৪৬ জনের মৃত্যু হয় সিডরের সময় গভীর সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে। তাঁদের এক থেকে চারজন করে ৮৮ জন সন্তানসহ স্ত্রীরা চরম অসহায়ত্ব নিয়ে বসবাস করছেন।

আবার সিডরের কবলে হারিয়ে যাওয়া (মৃত বা নিখোঁজ) অনেকেই এখনো ‘নিখোঁজ’ হিসেবে পরিগণিত। সরকারের নীতিমালাসংক্রান্ত কিছু জটিলতার কারণে এই নিখোঁজদের অধিকাংশ পরিবার পায়নি উপযুক্ত ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা। পরিবারগুলোর তেমন তথ্যও নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে। ওই সব পরিবারের মায়েরা পিতৃহারা সন্তানদের অনেক কষ্টে আগলে রেখেছেন। দরিদ্রতার কারণে ইচ্ছা সত্ত্বেও দুই ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া করাতে পারেননি পাথরঘাটার বাদুরতলা গ্রামের কমলা বেগম। পাথরঘাটার পদ্মা গ্রামের করিম মুন্সীর সঙ্গে সিডরের বছর খানেক আগে বিয়ে হয় মনিরা খাতুনের। মনিরার কোলজুড়ে আসে একটি ছেলে। ছেলের নাম হয় ওয়াজকুুরুনী। ওয়াজকুরুনীর দেড় মাস বয়সে সিডরে নিখোঁজ হন করিম। একপর্যায়ে উভয় পরিবারের সিদ্ধান্তে দেবরকে বিয়ে করতে বাধ্য হন অসহায় মনিরা। ১১ বছরের ওয়াজকুরুনী এখন মাদরাসার ছাত্র। তবে অভাবে-রোগে টালমাটাল তার শিক্ষাজীবন। পূর্ব বাদুরতলা গ্রামের জাকির হোসেন হাওলাদার সিডরে নিখোঁজ হন। তখন দুই বছরের ছেলে মো. হাসানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আর বিয়ে করেননি জাকিরের স্ত্রী মর্জিনা। অন্যের বাড়িতে কাজ করে ছেলের লেখাপড়া চালাচ্ছেন। মর্জিনা বলেন, হাসান যখন তার বাবার কথা জানতে চায় তখন মর্জিনার বুক ফেটে কান্না আসে। উৎসবের দিনে অন্য শিশুরা বাবাদের সঙ্গে আনন্দ করে, হাসান তখন বিষণ্নমনে বাড়ি ফেরে। সিডরে স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর সম্পদ থেকে বঞ্চিত করতে অনেক গৃহবধূকে বাড়ি থেকে বের করে দেন শ্বশুর-শাশুড়িরা। তাঁদের একজন পাথরঘাটার চরলাঠিমারা গ্রামের পুতুল রানী। স্বামী নির্মল চন্দ্র মিস্ত্রি সিডরে নিখোঁজ হওয়ার পর ছয় বছরের কন্যা পূর্ণিমা ও ৯ বছরের ছেলে নিমন্ত্রণকে নিয়ে এখন তাঁর আশ্রয় বকুলতলা গ্রামের পিত্রালয়ে। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে পূর্ণিমা এবার চরদুয়ানী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষার্থী। নিমন্ত্রণের একাদশ শ্রেণিতে থাকার কথা থাকলেও মাঝে সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকায় এখন সে সপ্তগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। পুতুল রানী বকুলতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে চকোলেট, বাদাম, চাটনি বিক্রির পাশাপাশি অন্যের বাড়ির কাজ করে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন।

পাথরঘাটার চরদুয়ানী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলাম মাওলা মিলন বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দারিদ্র্যের কারণে সিডরে নিখোঁজ মা-বাবার সন্তানদের লেখাপড়া হচ্ছে না।

স্থানীয় সংকল্প ট্রাস্টের পরিচালক (মনিটরিং) মো. মুনিরুল ইসলাম জানান, বিধ্বস্ত পরিবারগুলো দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সমাজসেবা অধিদপ্তর বরগুনার উপপরিচালক স্বপন কুমার মুখার্জি জানান, দাতা সংস্থা অর্থ সহযোগিতা বন্ধ করে দেওয়ায় প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়।

বরগুনার জেলা প্রশাসক মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, সিডরের কারণে পিতৃ-মাতৃহীন শিশুদের জন্য বর্তমানে কোনো প্রকল্প নেই। তবে তিনি এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রস্তাব তুলে ধরবেন।


মন্তব্য