kalerkantho


ক্ষতবিক্ষত খেতাছিঁড়া

দেবদাস মজুমদার, পিরোজপুর   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ক্ষতবিক্ষত খেতাছিঁড়া

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার বলেশ্বর নদতীরের খেতাছিঁড়া গ্রামের জেলে খলিল শরীফ সিডরে হারিয়েছেন পরিবারের সাত সদস্যকে। এখানেই দাফন করা হয় একসঙ্গে ১০ জনকে। ছবি : কালের কণ্ঠ

বলেশ্বর নদের মোহনায় পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার খেতাছিঁড়া গ্রাম। সিডরের জলোচ্ছ্বাস প্রথম আঘাত হানে এই গ্রামে।

জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধ ভেঙে স্রোতের তোড়ে ভাসিয়ে নেয় পুরো গ্রামের ঘরবাড়ি ও গাছপালা। এক গ্রামে ৫৪ জনের মৃত্যু ঘটে।

সিডরের ১০ বছর উপলক্ষে এই গ্রামে গিয়ে উন্নয়ন বঞ্চনা ও বৈষম্য দেখেছেন এই প্রতিবেদক। গত সোমবার দুপুরে মঠবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে সাপলেজা ইউনিয়নের ওই গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, সিডরের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত হয়নি। বাবুরহাট থেকে খেতাছিঁড়া হয়ে কচুবাড়িয়া পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার বাঁধ এখনো বিধ্বস্ত। এ বাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রতিদিন ঢোকে গ্রামে। কৃষিজমিতে বাড়ছে লবণাক্ততা। খেতাছিঁড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়  থেকে হাজীগঞ্জ বাজার পর্যন্ত এক কিলোমিটার বিপর্যস্ত সড়ক আজও পাকা হয়নি। সুপেয় পানির কোনো ব্যবস্থা হয়নি গ্রামের মানুষের জন্য।

বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধের বাইরে এখনো ৪৫০ জেলে পরিবারের বসতি। সিডরে নিহতদের গণকবরটি পাকাকরণ তো দূরের কথা, এটি এখন নদীভাঙনের কবলে। বাবুরহাট থেকে খেতাছিঁড়া গ্রাম পর্যন্ত বেড়িবাঁধে কিছু মাটি ভরাটের কাজ চলছে ঢিমেতালে।

গ্রামবাসীর অভিযোগ, বেড়িবাঁধে দায়সারাভাবে মাটি ভরাট করা হচ্ছে। নদীর জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে তা কাজে আসবে না। অন্যদিকে খেতাছিঁড়া গ্রামের কিছু অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ব্লক নির্মাণের কাজ চলছে। বিধ্বস্ত বাঁধের পাড়ে দায়সারাভাবে ব্লক বসানো হচ্ছে, যা জলোচ্ছ্বাস ঠেকানোর উপযোগী নয়। এ ছাড়া মোহনায় নদীশাসন কিংবা ডাম্পিং (বালুর বস্তা ফেলা) না করে ব্লক নির্মাণের ফলে তা ধসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বয়সী জেলে খলিল শরীফ জানান, ওই রাতে জলোচ্ছ্বাসে তাঁর পরিবারের সবাই ভেসে যায়। তিনি একটি গাছ আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকেন। তাঁর পরিবারের সাতজনের লাশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছেন তাঁর মা আলেয়া বেগম, স্ত্রী রওশন আরা, মেয়ে কারিমা, তিন নাতি সোনিয়া (৮), সিদ্দিক (৫), মিরাজ (৩) ও ভাই জলিল শরীফের স্ত্রী তাছলিমা বেগম। এদের সঙ্গে অজ্ঞাতপরিচয় আরো তিনজনের লাশসহ গণকবর রয়েছে বেড়িবাঁধের পাড়ে।

খেতাছিঁড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রশীদ মোল্লা বলেন, ‘খেতাছিঁড়া নদীর মোহনা সিডরের উৎসমুখ। গ্রামে আশ্রয়কেন্দ্র থাকলে সিডরে মানুষের এতো প্রাণহানি ঘটত না। ঝড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বিধ্বস্ত হওয়ার পর স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়। তবে ছোট ও অপরিসর এ সাইক্লোন শেল্টারে ২০০ মানুষের বেশি আশ্রয় নিতে পারে না। অথচ গ্রামের জনসংখ্যা ছয় হাজার ৫০০। গ্রামে বড় সাইক্লোন শেল্টার দরকার। সেই সঙ্গে বিদ্যালয়ে সুপেয় পানি ও চারপাশে মাটি ভরাট প্রয়োজন। ’

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৩ সালে বেড়িবাঁধ ও ব্লক নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা এন্টারপ্রাইজ ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে কাজ শুরু করে।

সাপলেজা ইউপির (ইউনিয়ন পরিষদ) খেতাছিঁড়া গ্রামের সাবেক সদস্য মো. গোলাম কবির বলেন, ‘সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধে মাটি ভরাটের কাজ চলছে চার বছর ধরে। তবে ১০ ভাগ কাজও সম্পন্ন হয়নি। দায়সারাভাবে মাটি ভরাটের কাজ দিয়ে সিডরের উৎসমুখের এ বেড়িবাঁধের কার্যকর সুরক্ষা সম্ভব নয়। ডাম্পিং ছাড়া ব্লক ছয় মাসের বেশি টিকবে না। ’

বর্তমান ইউপি সদস্য মো. আফজাল হোসেন বলেন, ‘৪৫০ জেলে পরিবারের অনেকের বসতি জমি নেই। এ কারণে তারা বাঁধের বাইরে থাকে। ঝড় উঠলে তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘খেতাছিঁড়া সিডরদুর্গত। এ হিসেবে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও এক হাজার ৮০০ মিটার ব্লক নির্মাণের কাজ চলছে। বাঁধের পাড়ের বসতি সরিয়ে না নেওয়ায় আপাতত মাটি ভরাটের কাজ থমকে আছে। কাজটি সম্পন্ন হলে জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে গ্রামের মানুষ রক্ষা পাবে। ’


মন্তব্য