kalerkantho


আশারচর খলিলকে দিয়েছে হতাশা

সোহেল হাফিজ, বরগুনা   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আশারচর খলিলকে দিয়েছে হতাশা

খলিল হাওলাদার ও তাঁর শিশুকন্যা ডলি। ছবি : কালের কণ্ঠ

বরগুনার তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নের কবিরাজপাড়া গ্রামের খলিল হাওলাদার জীবিকার প্রয়োজনে পরিবার-পরিজন নিয়ে বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন আশারচরের জেলেপল্লীতে অস্থায়ী বসতি গড়েছিলেন। ১৮ সদস্য নিয়ে একান্নবর্তী পরিবার ছিল তাঁর।

পরিবারের নারী ও শিশুরা দিনভর ব্যস্ত থাকত চিংড়ি পোনা শিকারের কাজে, পুরুষ আর কিশোর সদস্যরা কেউ ছিল শুঁটকি শুকানোর শ্রমিক, কেউ মাছ ধরত গড়াজালে, কেউ বা ছিল শুঁটকি মাছের পাইকারি বিক্রেতা। ৮০ বছরের বাবা খালেক হাওলাদারও বসে থাকতেন না। জমজমাট শুঁটকিপল্লীতে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান ছিল তাঁর। পরিবারের দু-একজন নারী সদস্য ছাড়া সবারই কমবেশি আয়-রোজগার ছিল। সবারই চোখে ছিল এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন।

৩৭ বছরের তরুণ খলিল হাওলাদারের স্ত্রী আমেনা বেগমের কোলে তখন দেড় মাসের শিশু ডলি। বড় মেয়ে কলির বয়স তখন চার বছর। ভালোই চলছিল তাঁদের। হাতে কিছু টাকাও জমেছিল খলিলের।

স্ত্রী আমেনাকে নিয়ে রাজধানী ঢাকার শহর দেখার বড় ইচ্ছে ছিল তাঁর। দুজন মিলে পরিকল্পনাও করেছিলেন তাঁরা।

কিন্তু না, নিয়তির নির্মম হিসাব-নিকাশ সবকিছু এলোমেলো করে দিল তাঁদের। ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর থেকেই আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। থমথমে আবহাওয়া। থেমে থেমে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। আবহাওয়ার পূর্ব সংকেত প্রচার করে চলেছে রেড ক্রিসেন্ট আর ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) স্বেচ্ছাসেবকরা। একটাই কথা, নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ। কিভাবে কী সামলাবেন তা ভেবে পাচ্ছিলেন না খলিল। বৃদ্ধ বাবা খালেক হাওলাদারসহ দু-একজন নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে রাজি হলেও পরিবারের অধিকাংশ সদস্য বেঁকে বসলেন জীবন আর জীবিকার সবটুকু সম্বল রেখে কোথাও যেতে। অগত্যা থেকেই গেলেন সবাই। এর আগেও অনেকবার এমন অনেক পূর্ব সংকেত শুনেছেন খলিল ও তাঁর পরিবারের সবাই। পরে তেমন কিছু হয়নি। এবারও তেমনটাই হবে হয়তো, এমন ভেবেই নারী, শিশুসহ পরিবারের ১৮ সদস্যই রয়ে গেলেন আশারচরের সেই ঝুঁকিপূর্ণ অস্থায়ী বসতিতে।

সন্ধ্যার পর থেকেই বাড়তে থাকে বাতাসের গতিবেগ। রাত ৮টার দিকে বালুকণার মতো উড়ে গেল হোগলাপাতা আর বাঁশের তৈরি ঘরখানা। এরপর পাশের জঙ্গলের গাছপালার আড়ালে লুকালেন সবাই। রাত সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ পাহাড়ের মতো উঁচু ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল সবাইকে। বৃদ্ধ বাবা, মা আর দুই শিশুকন্যাসহ স্ত্রী আনোয়ারাকে নিয়ে তখনো সাঁতরে বেড়াচ্ছেন খলিল। চোখের সামনে প্রচণ্ড ঢেউয়ের তোড়ে একে একে ভেসে গেলেন বাবা খালেক হাওলাদার, মা নূরজাহান বেগম, বড় বোন রেহেনা বেগম, ভগ্নিপতি ছাত্তার হাওলাদার, ভাগ্নি শিউলী, সীমা, খুকুমণি, ভাইয়ের ছেলে সোহাগ, ভাতিজি আমেনা ও বড় বোনের নাতি রিয়ামণি।

দেড় মাস বয়সী শিশু ডলি আর চার বছর বয়সী কলিকে নিয়ে তখনো প্রাণপণ সাঁতরে বেড়াচ্ছেন খলিল। একটি গাছের ডাল হাতে পেয়ে বড় মেয়ে কলিকে গাছের ডালে বসিয়ে দিয়ে আবারও হারিয়ে গেলেন খলিল। সঙ্গে দেড় মাসের ছোট্ট শিশু ডলি। এরপর আর হুঁশ ছিল না তাঁর। যখন হুঁশ ফিরল তখন নিজেকে দেখতে পেলেন নদীর পাড়ের একটি চরে শুয়ে আছেন। কোলে তার দেড় মাস বয়সী শিশু ডলি।

এরপর খলিল যখন তাঁর দুই মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন, তখন সব শেষ হয়ে গেছে তাঁর। একচিলতে জমির ছোট্ট উঠোনে একে একে জমা হলো পরিবারের ১০ সদস্যের লাশ। শুধু পাওয়া গেল না স্ত্রী আমেনা বেগমের কোনো খোঁজ। সিডরের ১০ বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত আমেনা নিখোঁজই রয়ে গেছেন। সেই থেকে স্বজন হারানোর দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন খলিল হাওলাদার।

কখনো মাটি কাটার কাজ, কখনো অন্যের বাড়িতে মজুরের কাজ করে কোনোমতে চলছে এখন খলিল হাওলাদারের জীবন। সেই সময়ের চার বছর বয়সী মেয়ে কলি সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর অভাবের কারণে তার লেখাপড়া বন্ধ রয়েছে। আর সেই দেড় মাসের মেয়ে ডলি এখন চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী।

একবুক কষ্ট নিয়ে খলিল হাওলাদার বলেন, ‘সিডরের পর কত মানুষের কতভাবে ভাগ্য পরিবর্তন হলো। কিন্তু আমার অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেল। একসময় সবই ছিল আমার। এখন আমার কিছুই নেই। ’

উপকূলীয় উন্নয়ন সংগঠন জাগো নারীর প্রধান নির্বাহী হোসনে আরা হাসি বলেন, সিডরে বরগুনার প্রায় দেড় হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। তালতলীর খলিল হাওলাদারের মতো অনেক পরিবার রয়েছে, যাদের পাঁচ থেকে ১০ জন সদস্য সিডরে নিহত হয়েছেন। এসব পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র কোনো প্রকল্প হাতে নেওয়া উচিত।


মন্তব্য