kalerkantho


৮০ শতাংশ মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র নেই

বাতাস বইলে কাঁপন ধরে

বরগুনা প্রতিনিধি   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



‘হোমুকে গাঙ, পিছে খাল, উত্তরে-দক্ষিণে, ধারে-কাছে কোনোহানে একটা বিল্ডিং নাই। বাতাস ছোডলেই কইলজা কাইপ্পা ওডে।

বইন্যা আইলে কুম্মে যাইয়া এট্টু আশ্রয় লমু? পরানডারে বাঁচামু?’ সত্তোরোর্ধ্ব বৃদ্ধ আশরাফ আলী আকনের চোখেমুখে ভীতি নিয়ে এসব কথা বলেন। বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কুপদোন গ্রামের বাসিন্দা তিনি।

বিষখালী নদীর তীরঘেঁষে এই গ্রাম। গ্রামটিতে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। অদূরে পাড় ভেঙে ক্রমে লোকালয়ে প্রবেশ করছে খরস্রোতা নদীটি। পেছনে খাল, উত্তর ও দক্ষিণে দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নেই। সিডরে এ গ্রামের পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছিল। এদের প্রত্যেকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে বানের জলে ভেসে ডুবে মরেছে।

জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য মতে, এ জেলায় আশ্রয়কেন্দ্রের (সাইক্লোন শেল্টার) সংখ্যা ৩৫১টি।

এতে দেড় লাখ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। যেখানে জেলার জনসংখ্যা প্রায় ১২ লাখ।

কুপদোন গ্রামের বাসিন্দা রুস্তম আলীর স্ত্রী ময়না বেগম বলেন, ‘কয়দিন আগে মোরা বইন্যার সংকেত দেছে। ডরের চোডে নাওয়া-খাওয়া বন্ধ অইয়া গেছিল। গুরাগারা (ছেলেপুলে) লইয়া কুম্মে যাইয়া উইট্টা পড়ানডা বাঁচামু। ’ ঠিক একইভাবে বিষখালী, বলেশ্বর ও পায়রার তীরঘেঁষে বসবাসরত বরগুনার বিশাল এক জনগোষ্ঠী দুর্যোগে অনিরাপদ হয়ে পড়ে। দূরবর্তী আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য ছোটাছুটি করতে গিয়ে প্রাণহানি ঘটে।

দুর্যোগঝুঁকি নিরসনে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা এনএসএসের নির্বাহী পরিচালক সাহাবুদ্দিন পান্না বলেন, ‘সিডরের ১০ বছর পরও পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। বড় কোনো দুর্যোগের সংকেত এলে এখানকার বাসিন্দারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এসব বিষয় ভাবনায় রেখে ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামগুলো বাছাই করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। ’

উপকূলীয় উন্নয়ন সংগঠন ‘জাগো নারী’র প্রধান নির্বাহী হোসনে আরা হাসি বলেন, ‘উপকূলীয় বাসিন্দাদের দুর্যোগকালীন নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। ’

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির বরগুনা সদর উপজেলার সভাপতি জাকির হোসেন মিরাজ বলেন, সিডরের পর অপরিকল্পিতভাবে কিছু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীনরা তাঁদের ইচ্ছেমতো স্থানে তা নির্মাণ করেছেন। অথচ যেসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রের চরম সংকট, সেখানে তা নির্মিত হয়নি।

পাথরঘাটার কালমেঘা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আকন মো. শহীদ বলেন, ‘এ ইউনিয়নের অর্ধলক্ষাধিক মানুষের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশের বসবাস নদীতীরে। ঘূর্ণিঝড়ে আশ্রয় নেওয়ার জন্য এ ইউনিয়নে মাত্র ছয়টি কেন্দ্র রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে অপ্রতুল। ’

বরগুনার জেলা প্রশাসক মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘বরগুনা দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ জেলা। সুদীর্ঘ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে বড় বড় দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছে এ এলাকার বাসিন্দারা। ধাপে ধাপে বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। ’


মন্তব্য