kalerkantho


তাণ্ডবের স্মৃতি ভোলার নয়

শিরিনা আফরোজ, পিরোজপুর   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সুপার সাইক্লোন সিডরের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে আজও আঁতকে ওঠে পিরোজপুর উপকূলের মানুষ।

সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঝড়ের আলামত শুরু হলেও রাত ১১টার দিকে প্রচণ্ড বেগে নদী তীরবর্তী এলাকায় আঘাত হানে জলোচ্ছ্বাস।

৮-১০ ফুট উঁচু ঢেউয়ে প্লাবিত হয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। হাজার হাজার গাছপালা এবং সহস্রাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। গৃহহীন হয়ে পড়ে অসংখ্য পরিবার। ইন্দুরকানী, কাউখালী, ভাণ্ডারিয়া, মঠবাড়িয়া, নাজিরপুর ও স্বরূপকাঠিতে ৪০৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। নিখোঁজ হয় ৫০০ জনের বেশি।

ইন্দুরকানীর চণ্ডীপুর গ্রামের জেলে ইব্রাহীম সেখ বলেন, ঝড় প্রচণ্ড বেগে শুরু হলে নদী থেকে বিদ্যুেবগে পানি আসতে দেখে স্ত্রী জয়নব বিবি ছেলে রাকিব (১), সাকিব (৪) ও নাইমকে (১১) নিয়ে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হন। তিনি ও তাঁর স্ত্রী বেঁচে গেলেও দুই দিন পর এক কিলোমিটার দূরে মালবাড়ী সেতুর কাছে ধানক্ষেতে তিন সন্তানের লাশ পাওয়া যায়।

চার বছরের শিশুকন্যা চাঁদনিকে হারিয়ে এখনো মূর্ছা যান মা খাদিজা বেগম। সন্তান হারানোর কথা বর্ণনা করতে গিয়ে মেয়ের ছবি বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

প্রচণ্ড বাতাস আর জলোচ্ছ্বাসে যখন তাঁর ঘর দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে, তখন মেয়ে চাঁদনিকে নিয়ে নেমে পড়েন বাইরে। কিন্তু রাস্তায় উঠতেই তাঁদের দুজনকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় স্রোত। খাদিজাকে একটি গরুর লেজ ধরা অবস্থায় ভোরে বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে পানের বরজ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। কিন্তু ছয় দিন পর ধানক্ষেত থেকে একমাত্র মেয়ে চাঁদনির লাশের সন্ধান মেলে।

পূর্ব চরবলেশ্বর গ্রামের দিনমজুর মতিউর রহমান মতির স্ত্রী লালভানু (৩০) তখন তিন সন্তান নিয়ে বাড়িতেই ছিলেন। প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাসে ঘরে থাকতে পারছিলেন না। বাঁচার তাগিদে সন্তানদের নিয়ে পাশের একটি এনজিও অফিসে আশ্রয় নেওয়ার জন্য রাস্তায় বের হন। সঙ্গে সঙ্গে পানির তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায় তাঁদের সবাইকে। তিন দিন পর লালভানুর লাশ মেয়ে কুলসুম (৪) এবং ছেলে সাকিবকে (২) বুকে জড়ানো অবস্থায় বাড়ি থেকে আধাকিলোমিটার দূরে ধানক্ষেতে পাওয়া যায়। বাড়িতে অবস্থান না করায় সেদিন বেঁচে যান মতিউর। কিন্তু স্ত্রী ও দুই সন্তান হারিয়ে নির্বাক হয়ে যান তিনি।

খোলপটুয়ার হানিফ জোমাদ্দারের স্ত্রী ও এক সন্তান, মাঝের চরের গৃহবধূ ময়না ও কুলসুম, চণ্ডীপুর গ্রামের ফয়সাল (৭), ১৪ দিন বয়সের হৃদয়ের মৃত্যু হয়েছে।

পূর্ব চণ্ডীপুর গ্রামের জেলে মনির গাজী সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি মনে করে বলেন, ‘সেদিন বড় ড্যাগের (পাতিল) মধ্যে করে ভাসিয়ে নিয়ে আমার দুই শিশুর প্রাণ রক্ষা করি। ’

একই গ্রামের সোহাগ বলে, ‘সিডরের সময় আমার বয়স পাঁচ বছর। বাঁচার জন্য সেদিন আমিসহ আরো আটজন তিন ঘণ্টা পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে একটি আমগাছের ডাল ধরে জীবন বাঁচাই। ’

বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কবির হোসেন বলেন, ‘সিডরে আমার এ ইউনিয়নে অসংখ্য প্রাণহানি, গাছপালা, বাড়িঘর, কাঁচাপাকা রাস্তাঘাটসহ বেড়িবাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কিন্তু আজও সেই ক্ষত কাটিয়ে উঠতে পারেনি এলাকার মানুষ। ’


মন্তব্য