kalerkantho


ঘুম পাড়িয়ে বের করা হয় গুহাবন্দি শিশুদের

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



ঘুম পাড়িয়ে বের করা হয় গুহাবন্দি শিশুদের

রয়াল থাই নেভির বুধবার প্রকাশিত ছবিতে স্পষ্টই দেখা যায়, থাইল্যান্ডের থাম লুয়াং গুহা থেকে উদ্ধারের পর ঘুমন্ত শিশু-কিশোরদের স্ট্রেচারে করে বয়ে নেওয়া হয়। ছবি : এএফপি

থাইল্যান্ডের বিপজ্জনক গুহা থেকে শিশু-কিশোররা সুস্থ ও অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে এসেছে, এটাই এখন সবচেয়ে খুশির এবং স্বস্তির খবর। থাই জনতার পাশাপাশি বিশ্ববাসীকে এ আনন্দ উপহার দিয়ে গিয়ে উদ্ধারকারীরা কতটা বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে গেছে, সেসব খবরের গুরুত্ব কিন্তু নিতান্ত কম নয়। আর অবুঝ কিশোরদের নিরাপদে উদ্ধার করার স্বার্থে কর্তৃপক্ষকে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, সে খবরও এরই মধ্যে বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছে।

গত ২৩ জুন থাম লুয়াং গুহায় ঢুকে আটকে পড়া ১২ কিশোর ফুটবলার ও তাদের তরুণ কোচকে খুঁজে পেতে বিপত্সংকুল পথ পাড়ি দিয়েছেন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের খ্যাতিমান ও অভিজ্ঞ সব ডুবুরি। গুহার ভেতর জমে ওঠা ঘোলা পানির প্রবল স্রোতের কাছে তাঁদের সব অভিজ্ঞতা মার খেতে থাকে। শক্তিশালী হেডলাইট জ্বালিয়েও ওই ঘোলা পানির ভেতর প্রথম তিন দিন দিক ঠাহর করা যাচ্ছিল না। পানি তো নয়, যেন ঘন কুয়াশা—এমন মন্তব্য করেন ব্রিটিশ কেভ রেসকিউ কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান বিল হোয়াইহাউস। এ অবস্থার ভেতর আটকে পড়া ১৩ জনকে উদ্ধারে সফলতার সম্ভাবনা আর ব্যর্থতার আশঙ্কা দুটিই ছিল সমান সমান।

থাইল্যান্ডের নৌবাহিনীর সিল কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আর্পাকর্ন ইউকংকায়েও জানান, কিশোরদের খুঁজে পাওয়ার আশা ছিল একেবারে তলানিতে, কিন্তু হাল ছাড়েনি কেউ। পানির ঘোলাটে ভাব একটু কমতে থাকায় অন্য সব বাধা পেরিয়ে ব্রিটিশ অভিযাত্রী জন ভোলান্দেন ৯ দিন পর যখন কিশোরদের দেখা পান, তখন তাদের উদ্ধারের প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু হয় আরেক দুশ্চিন্তা। কারণ তাদের বের করে আনার জন্য বিকল্প নিরাপদ পথ পাওয়া যাচ্ছিল না। এদিকে তারা ডুবুরিদের সঙ্গে পানিপথ পেরোনো দূরে থাক, সাঁতারই জানে না। ফলে গুহার চার কিলোমিটার ভেতর থেকে তাদের কী করে বের করা হবে, সে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে কর্তৃপক্ষের অনেকটা সময় লেগে যায়। শেষে সিদ্ধান্ত হয়, ডুবুরিদের সঙ্গেই একে একে বের করে আনা হবে কিশোরদের, যদিও উদ্ধারপ্রক্রিয়া শুরুর আগ পর্যন্ত এ পরিকল্পনা গোপন রাখা হয়েছিল। অন্য কোনো রাস্তা না পেয়ে সবচেয়ে বিপজ্জনক উপায়টি বেছে নিতে বাধ্য হন বিশেষজ্ঞরা।

ঘোলা পানিতে ডুবে থাকা সরু পথ বেয়ে যখন কিশোররা বেরিয়েছে, তখন তাদের মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল, তা নিয়ে বিশ্ববাসীর কৌতূহলের শেষ নেই। সেই গোমর ফাঁস করেছেন খোদ থাইল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট প্রায়ুত চ্যান ও চা। গত মঙ্গলবার তিনি জানিয়েছেন, কিশোরদের ‘হালকা মাত্রায় ট্রাংকুইলাইজার’ দেওয়া হয়েছিল। আর সাবেক সিল কমান্ডার চাইয়ানান্তা পিরানারং স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন, উদ্ধারের পুরো রাস্তাটা ঘুমিয়ে ছিল কিশোররা। থাই সিল সদস্যরা কিশোরদের যেসব ছবি প্রকাশ করেছে, তাতেও দেখা গেছে, গুহা থেকে বের করে আনার পর কিশোরদের স্ট্রেচারে করে বয়ে আনা হয়েছে। যেভাবেই কিশোরদের বের করে আনা হোক, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, তারা জীবিত ও সুস্থ আছে’, এমন মন্তব্য করেন সিল কমান্ডার ইউকংকায়েও।

কোচ ও কিশোরদের নিরাপদে বের করে আনার পর বিপদে পড়ে গিয়েছিল গুহার ভেতরে থাকা উদ্ধারকারী দলটি। ওই দলে থাই সিল সদস্যদের সঙ্গে ছিলেন বিদেশি ডুবুরিরাও। গুহার পানি বের করার জন্য যেসব পাম্প চালানো হচ্ছিল, সেগুলোর কয়েকটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাতেই বিপদটা তৈরি হয়েছিল। চাইয়ানান্তা বলেন, ‘ওই মুহূর্তে চারপাশে নজর রাখতে থাকা অস্ট্রেলীয় লোকটি হঠাৎ চিৎকার করে জানান, পানির পাম্প আর কাজ করছে না।’ ফলে সংশ্লিষ্ট চেম্বারটিতে পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। সর্বশেষ একজন ডুবুরি যখন পানি থেকে উঠে আসেন, তখন গুহার ওই চেম্বারে পানির উচ্চতা ডুবুরিদের মাথাসমান হয়ে গিয়েছিল। ডুবুরিরা ওখান থেকে বের হওয়ার আগে পানি মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেলে তাঁদের অক্সিজেন মাস্ক ব্যবহার করতে হতো, আর তাতে গুহা থেকে বের হওয়ার আগেই তাঁদের অক্সিজেন শেষ হওয়ার ভয় ছিল। তাঁদের শেষ রক্ষা অবশ্য হয়েছে।

ফলে অর্জন আর আনন্দটা এখন ‘প্রায়’ শতভাগ। রুদ্ধশ্বাস এ অভিযানের মাঝপথে সাবেক সিল সদস্য সামান কুনানকে না হারাতে হলে হয়তো ‘প্রায়’ শব্দটা যোগ করতে হতো না, সেটা হতে পারত শতভাগ উল্লাস।

সূত্র : সিএনএন, এএফপি।



মন্তব্য