kalerkantho


দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ও সরু গলির গাবতলী

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০




দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ও সরু গলির গাবতলী

ছবি : লুত্ফর রহমান

ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের উদ্দেশে যাত্রা কিংবা উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকায় প্রবেশ—দুটিরই কেন্দ্রবিন্দু গাবতলী বাস টার্মিনাল। পশুর হাটের জন্যও বিখ্যাত গাবতলী।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে গাবতলী। পুরো এলাকাই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। সরু রাস্তার কারণে অলিগলিতে যানবাহন তো দূরের কথা, রিকশা চলাচলেরই সুযোগ নেই। রয়েছে দখল, চাঁদাবাজি, মাদকসহ নানা সংকট। ওয়ার্ডটির সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে লিখেছেন আরিফুর রহমান

 

গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার উদ্দেশে যাত্রা করে। আবার হাজারো যাত্রী ঢাকায় প্রবেশ করে গাবতলী বাস টার্মিনাল দিয়েই। উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকার প্রবেশদ্বার বলা হয় গাবতলীকে। ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাত্রীরা গাবতলী বাস টার্মিনালে এসে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়ার সময় হওয়ার আগের সময়টুকু যাতে একটু বিশ্রাম নিতে পারেন, সে জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নির্মাণ করা হয় বিশাল এক বিশ্রামাগার। যে বিশ্রামাগার নির্মাণ করা হয়েছে যাত্রীদের জন্য, সে বিশ্রামাগারের দখল এখন টোকাই, ভিক্ষুক, হিজড়া আর মাদকসেবীদের হাতে।

ভয়ে যাত্রীরা বিশ্রামাগারের দিকে পা পর্যন্ত মাড়ান না। কোনো যাত্রী বিশ্রামাগারে বসতে গেলে শুরু হয় বিপত্তি। এ নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার নজির আছে অসংখ্য। বিশ্রামাগারে বসার জন্য সারি সারি চেয়ার আছে—ফ্যান, টিভিও আছে। এসব আয়োজন যাত্রীদের জন্য হলেও ভোগ করছে মাদকসেবী, টোকাই, ভিক্ষুক আর হিজড়ারা। সরেজমিনে গিয়ে ঘুরে দেখা মিলল, গাবতলী বাস টার্মিনালের বিশ্রামাগারে কয়েকজন হিজড়া একসঙ্গে খোশগল্পে মত্ত। তার পাশে কয়েকজন ভিক্ষুক বসে গল্প করছে। কাউকে দেখা গেল চেয়ারে শুয়ে ঘুমাতে। কয়েকজন মাদকসেবী আর ভবঘুরেও চোখে পড়ল। কোনো যাত্রীকে বিশ্রামাগারে বসতে দেখা গেল না। বিশ্রামাগারের অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা জাভেদ আক্তার নামে এক যাত্রীকে বিশ্রামাগারে বসতে যাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি নিজেই তো দেখতে পারছেন সেখানকার পরিবেশ কেমন। সব গাঁজা সেবনকারী, ভিক্ষুক, টোকাই বসে আছে। সেখানে যাত্রীদের বসার কোনো সুযোগ নেই। ’ এক টিকিট কাউন্টারের মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, স্থানীয় প্রভাবশালী ও পরিবহন মালিকদের ছত্রচ্ছায়ায় বিশ্রামাগারে এসব চলছে। তাদের বলার সাহস কারো নেই। পরিবহন মালিক আর স্থানীয় প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বিশ্রামগারে গাঁজা-ইয়াবা বেচা-কেনা চলে প্রকাশ্যে। সূর্য পশ্চিম আকাশের দিকে হেলে পড়লে শুরু হয় মাদক বেচা-কেনা। বিশ্রামাগারে বসেও মাদকসেবন চলে। গভীর রাত পর্যন্ত এসব চলতে থাকে। স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও এ বিষয়ে জোর কোনো তত্পরতার কথা শোনা যায়নি।

 

আছে মাদকের সমস্যা

গাবতলী এলাকায় আছে বেশ কয়েকটি বস্তি। অপেক্ষাকৃত নিম্নবিত্তদের বসবাস এই ওয়ার্ডে। বংশী নদ আর তুরাগ নদ একসঙ্গে মিলিত হয়েছে গাবতলী-আমিনবাজার সেতুর পাশে। এলাকাটি নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা হওয়ায় মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য বেশ পছন্দের রুট হিসেবে পরিচিত। এলাকায় বস্তি থাকায় মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত ৯ নম্বর ওয়ার্ড। নৌপথ ব্যবহার করে মাদক ব্যবসায়ীরা তা ছড়িয়ে দেয় ঢাকার বিভিন্ন অলিগলিতে। এই মাদকের টাকা জোগাড়ে করা হয় চাঁদাবাজি ও ছিনতাই। দিনের বেলায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হয়। প্রকাশ্যেই মাদক সেবনের কথাও বলেছেন এলাকাবাসী। আর এর পেছনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুটিকয়েক সদস্য, স্থানীয় প্রভাবশালী ও পরিবহন মালিকরা জড়িত বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। মাদকের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি ছোট দিয়াবাড়ী, গাবতলী আর ডিনএনডি বাঁধে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযানও পরিচালনা করা হয় না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

কোটবাড়ী এলাকার বাসিন্দা ইয়াকুক আলী জানান, ‘৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রধান সমস্যা মাদক। পুরো এলাকা মাদকে ছেয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের হাত থেকে উদ্ধার করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘এই ওয়ার্ডের রাস্তাঘাট ঘিঞ্জি। মূল রাস্তা পেরিয়ে অলিগলিতে মানুষ ছাড়া আর কোনো যানবাহন চলতে পারে না। জরুরি কোনো কাজে হেঁটেই যেতে হয়। ড্রেনেজ-ব্যবস্থাও অত্যন্ত খারাপ। যানজট সমস্যা প্রকট। এখন বর্ষাকাল। তাই নাকে কোনো গন্ধ আসে না। গ্রীষ্মকালে পানির গন্ধে এ এলাকায় তো টিকে থাকাই দায় হয়ে যায়। বিভিন্ন কারখানার বর্জ্য পানি এসে মিশে নদীর পানিতে। আর এতে পানির গুণগত মান খারাপ হয়ে যায়। তখন নদীর পানিতে গোসলও করা যায় না। আর মাদকের সমস্যা তো আছেই। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান পরিচালনা হয় না। ফলে দিন দিন মাদক ব্যবসা এলাকা ছেয়ে গেছে। এটা চলে এখন প্রকাশ্য। ’

অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও রাস্তা দখল

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে অবকাঠামো গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। পুরো ওয়ার্ডের রাস্তাগুলোই অত্যন্ত সরু। অলিগলির রাস্তা দিয়ে কোনো রিকশা চলাচল করতে পারে না। জরুরি কোনো রোগী হাসাপাতালে নিয়ে যেতে চাইলেও তা সম্ভব হয় না ওই এলাকায়। কারণ অলিগলি এত সরু যে অ্যাম্বুল্যান্স ঢোকারও সুযোগ নেই। ওই এলাকায় আগুন লাগলে, সে আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশের রাস্তা নেই। মানুষ হেঁটেই বড় রাস্তা থেকে বাসাবাড়িতে যাতায়াত করে। অনেক স্থানে দেখা গেছে, রাস্তা দখল করে লেগুনা রাখা হয়েছে। অনেক স্থানে ট্রাক, মিনি ট্রাকও রাখা হয়েছে। এতে যানজট আরো তীব্র হচ্ছে। এ ছাড়া মানুষের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে রাস্তা দখল করে কেউ কেউ গাড়ির ওয়ার্কশপ দিয়েছেন। ডিএনডি বাঁধের রাস্তা দখল করেও ট্রাক, মিনি ট্রাক ও লেগুনা রাখা হয়েছে।

 

খানাখন্দে ভরা সড়ক

চলছে বর্ষাকাল। পুরো এলাকা তুলনামূলক নিচু হওয়ায় একটু বৃষ্টি হলেই দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। হাঁটু সমান পানি মাড়িয়ে এলাকাবাসীকে চলাচল করতে হয়। মাজার রোড থেকে গাবতলী-আমিনবাজার সেতু পর্যন্ত চলছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি আর ড্রেন নির্মাণের কাজ। মাটি ফেলে রাখা হয়েছে মূল সড়কের ওপর। এতে দেখা দিচ্ছে মারাত্মক যানজট। ওয়ার্ডের বাগবাড়ী, হরিরামপুর, জহুরাবাদ, গোলারটেক, কোটবাড়ী, গাবতলী, আনন্দনগর ও জাহানাবাদ ঘুরে দেখা গেল, চলছে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ। বিশেষ করে রাস্তা সংস্কারের কাজ। ফলে একদিকে জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে খোঁড়াখুঁড়ি। আর তাতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের। নেই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা। এসব রাস্তা দিয়ে কিছু লেগুনা চললেও এখন তা বন্ধ রয়েছে রাস্তা সংস্কারের কারণে। বাগবাড়ী, হরিরামপুর, জহুরাবাদ, গোলারটেক, কোটবাড়ী, গাবতলী ও দিয়াবাড়ী এলাকার রাস্তাঘাট সব ভাঙাচোরা আর খানাখন্দে ভরা।

নেই আবর্জনা ফেলার জায়গা

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আরেক সমস্যা ময়লা-আবর্জনা রাখার সুনির্দিষ্ট জায়গার অভাব। যে যেভাবে পারছে নিজের মতো করে ময়লা-আবর্জনা রাখছে রাস্তার ধারে। গাবতলী-আমিনবাজার সেতুর আগে রাস্তার দুই ধারে দেখা গেছে ময়লা-আর্বজনার স্তূপ। ময়লা সরানোর কোনো উদ্যোগ নেই। এতে এলাকায় বাড়ছে মশার উৎপাত। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মশানিধনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। ওয়ার্ডের ময়লা পানি সরানোর জন্য ডিএনডি বাঁধের নিচ দিয়ে পাশের বংশী ও তুরাগ নদের সঙ্গে পাইপ বসিয়ে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে নদীর পানি নষ্ট হচ্ছে। চৈত্র মাসে নদীতে পানি তেমন থাকে না, তখন এলাকায় দুর্গন্ধে টিকে থাকা দুরূহ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ট্যানারির শিল্পবর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনা গিয়ে পড়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে। বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে সংযোগ তুরাগ আর বংশী নদের। তখন নদী ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। রাস্তায় হাঁটার সময়ও নাক চেপে রাখতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে ময়লা-আবর্জনা রাখার কোনো ব্যবস্থা না করায় যত্রতত্র তা ফেলা হচ্ছে। ’ তাঁর অভিযোগ, ‘ডিএনডি বাঁধ দখল করে কেউ বাস, কেউ ট্রাক, মিনিবাস রাখছে। কেউ আবার ওয়ার্কশপও দিয়েছে রাস্তা দখল করে। এসব দেখার যেন কেউ নেই। ’ স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় রয়েছে গ্যাসের তীব্র সংকট। পুরো ওয়ার্ডই অপরিষ্কার। পশুর হাট বসানোর কারণে রাস্তায় ধুলাবালি ওড়ে। এসব সমস্যার সমাধানে কেউ এগিয়ে আসে না।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী আসনের কাউন্সিলর রাজিয়া সুলতানা ইতি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় বিশ্রামাগারে টোকাই ও ভবঘুরেদের কারণে যাত্রীরা বসতে পারে না—এমন অভিযোগ আমাদের কানেও এসেছে। বিশ্রামাগারে যাতে যাত্রীরা বসতে পারে, সে জন্য টোকাই, ভিক্ষুক আর ভবঘুরেদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু তারা আবার ফিরে আসে। এ ছাড়া টার্মিনাল এলাকায় ফুটপাত দখল করে সেখানে ফল বিক্রির কথাও শুনেছি। তাদের অন্তত পাঁচবারের মতো উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু দুই দিন না যেতেই আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। কিভাবে ফিরে আসে, কারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় জানি না। ’ মাদক ব্যবসা প্রসঙ্গে রাজিয়া সুলতানা ইতি বলেন, ‘গাবতলী এলাকায় মাদকের ব্যবসা হয়—এ অভিযোগ আমার কাছেও এসেছে। অনেকে প্রকাশ্যেই মাদক সেবন করে। এ ব্যাপারে আমি সাধ্যমতো যথাযথ ব্যবস্থা নেব। ’ আর এলাকার সরু রাস্তাঘাটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অনেক রাস্তা সম্প্রসারণ করেছি। ওয়ার্ডের বাগবাড়ী, হরিরামপুর, জহুরাবাদ, গোলারটেক, কোটবাড়ী, গাবতলী, আনন্দনগর, দিয়াবাড়ী ও জাহানাবাদ এলাকার রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী তিন বছরে রাস্তাঘাটের চিত্র বদলে যাবে। আর ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জলাবদ্ধতা নিরসনেও কাজ চলছে। বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিগগিরই জনগণ এর সুফল পাবে। ’

 


মন্তব্য