kalerkantho


দখলে-দূষণে নিখোঁজ হতে চলেছে লবণদহ নদ

মো. মনির হোসেন   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দখলে-দূষণে নিখোঁজ হতে চলেছে লবণদহ নদ

শ্রীপুরে সিরামিক কারখানার দখলে লবণদহ নদের গতিপথ পরিবর্তন। পরে বালু ফেলে নতুন পাড় তৈরি করছে কারখানা কর্তৃপক্ষ

লবণদহ নদ, জনশ্রুতি আছে লবলং সাগর হিসেবে। একসময় এ নদ দিয়ে চলত পালতোলা নৌকা, শোনা যেত মাঝির আকুল করা গান।

নদটি গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার দক্ষিণ সীমান্তঘেঁষা ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার ক্ষীরু নদীর সংযোগস্থল থেকে উৎপত্তি হয়ে আঁকাবাঁকা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে মীর্জাপুরের কাছে তুরাগ নদে গিয়ে মিশেছে। একসময় একে দেখে মনে হতো, জলে টইটম্বুর এক রাক্ষস! আর সেই রাক্ষসরূপী নদ এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে। হারিয়ে ফেলেছে তার নদী চরিত্র। এখন কেউ বলে লবলং খাল আবার কেউ বলে লবলং নালা। লবণদহ দখল ও ভরাট করে নদের ওপরে বা গতিপথ পরিবর্তন করে গড়ে উঠেছে শত শত কলকারখানা।

শিল্পনগরীখ্যাত গাজীপুরের অন্যতম একটি উপজেলা এই শ্রীপুর। সবুজের সমারোহে প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এক ভিন্ন রকম মনোমুগ্ধকর পরিবেশের অপর নাম শ্রীপুর। তবে একদিকে যেমন আমরা আধুনিকায়নের স্বর্ণযুগে পদার্পণের নেশায় দিন-রাত খেটে যাচ্ছি, অন্যদিকে প্রাকৃতিক সম্পদ দিন দিন ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের চরম পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছি। উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও আধুনিকায়নের মানদণ্ডে আজকে মনে বারবার একটি প্রশ্নের উদ্রেক হচ্ছে তা হলো—শিল্পায়ন কি শুধুই এগিয়ে নেয়? না ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তেও দাঁড় করিয়ে দেয়? অধিক বিশ্লেষণে না গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি দেখে সহজেই অনুমেয় যে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন মানবজীবনের উন্নয়ন না ঘটিয়ে ধ্বংসও ডেকে আনতে পারে।

 

অতিসম্প্রতি লবণদহ নদের বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করে দেখা যায়, নদের পুরো অংশই গিলে ফেলেছে তথাকথিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান। নদ দখল করে নালা বানিয়ে ফেলেছে; আবার সেই নালায় ছেড়ে দিচ্ছে বিষাক্ত তরল বর্জ্য—এ যেন ভুক্তভোগী স্থানীয়দের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। একদিকে নদ, খাল, বিল আর ফসলি জমি ভরাট করে তৈরি করা হচ্ছে কারখানা, অন্যদিকে অবশিষ্ট জায়গায় ফেলা হচ্ছে কারখানার তরল ও কঠিন বর্জ্য। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে কৃষক তাঁর জমি ওই ভুমিখেকোদের কাছে নামমাত্র মূল্যে বেচে দিয়ে নির্বাসনে যাচ্ছেন। মির্জাপুর, পিরুজালী, বাগেরবাজার ও বাংলাবাজার ঘুরে দেখা যায়, সব জায়গায়ই লবণদহ অস্তিত্বের সংকটে। তবে পৌর এলাকার বেড়াইদেরচালা এসে তো চক্ষু চড়কগাছ! অন্যান্য জায়গায় দখল-দূষণ দেখলেও দখলযজ্ঞ চলছে—এ রকম দৃশ্য চোখে পড়েনি। এখানে খালের ওপারে পুরনো কারখানা আর এপাড়ে সম্প্রসারণ কাজ চলছে। আর মাঝখান দিয়ে কোনো রকমে চলছে লবণদহ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এক্স সিরামিক নামের কারখানা খালের বিভিন্ন স্থান ভরাট করে নতুন প্লান্ট তৈরি করা হচ্ছে। পরিদর্শনে দেখা গেছে, খালের ওপর বালুর বস্তা ফেলে ভরাট করা হয়েছে। আর পানি নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে পাইপ। এভাবে খালের ওপর তৈরি করা হয়েছে কারখানাটির চাহিদা অনুযায়ী সড়ক। এতে করে খালের পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কারখানার সিরামিকস বর্জ্য খালেই ফেলা হচ্ছে। অব্যবহারযোগ্য ও ভাঙা টাইলসের টুকরা কৃষিজমিতে রাখা হচ্ছে স্তূপ করে। ফলে আশপাশের কৃষিজমিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকরা ফসল উৎপাদন করতে না পারায় নামমাত্র মূল্যে কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে কৃষিজমি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

স্থানীয়রা জানান, নব্বইয়ের দশকেও এ খাল দিয়ে নৌকা চলত, এলাকাবাসী মাছ ধরত, গোসল থেকে শুরু করে সব কাজকর্ম করত এই খালের পানি দিয়ে। এই খালের মাছ মানুষের মাছের চাহিদা মেটাত। কিন্তু যখন থেকে এর পাশে  শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে, তখন থেকে তার বর্জ্যে পানি বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন শিল্প-কারখানা খালের বিভিন্ন অংশ দখল করে ফেলেছে। এখন শুধু কাগজপত্রে খালের নাম উল্লেখ রয়েছে। বাস্তবে খালটি খুঁজে পাওয়া বড়ই কষ্টসাধ্য। এ খাল দিয়েই  শ্রীপুর উপজেলার পানি নিষ্কাশন হতো। কিন্তু যেভাবে খাল দখল হয়ে যাচ্ছে, তাতে একসময় শ্রীপুরের প্রধান সমস্যা হবে জলাবদ্ধতা। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য এলাকাবাসী নদী ও পরিবেশবান্ধব বর্তমান জেলা প্রশাসকের সুনজর ও হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি শ্রীপুর পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আমজাদ হোসেন বলেন, ‘সিরামিকের কারখানা খালটিকেই ভরে ফেলছে। পৌরসভার তিনটি ওয়ার্ডের পানি নিষ্কাশন হতো এই খাল দিয়ে। পৌরসভার পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ কোনো কর্ণপাত করছে না। খাল উদ্ধারে পৌরসভার পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হবে। ’


নদ-নদী ও খাল-বিল রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে

ড. আনিসুজ্জামান খান

ভাইস চেয়ারম্যান, নদী ও প্রকৃতি সংশ্লিষ্ট গবেষণা সংস্থা

‘ইসাবেলা ফাউন্ডেশন’

 

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে আলোচিত বিষয় জলবায়ু পরিবর্তন। বিশ্বের তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে নানা ধরনের বিপর্যয়ের সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের মতো ক্রান্তীয় জলবায়ুর দেশে বর্ধিত তাপমাত্রার প্রভাব এর মধ্যেই পড়তে শুরু করেছে। গাজীপুরও তার ব্যতিক্রম নয়। লবণদহ, তুরাগ নদসহ গাজীপুরে বিভিন্ন নদ-নদী, খাল-বিল যদি আমরা রক্ষা করতে না পারি, তাহলে এ এলাকার আর্দ্রতা কমে যাবে, তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। এতে এলাকার মানুষসহ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। ভয়াবহ বন্যার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়বে। কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাবে। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়বে। গাছপালা, লতা, গুল্ম, উদ্ভিদ ও প্রাণীবৈচিত্র্য ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে। নিরাপদ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দেবে। মিঠা পানির প্রাপ্যতা হ্রাস পাবে। সর্বোপরি টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা পড়বে হুমকির মুখে। তাই এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য লবণদহ, তুরাগ নদসহ অন্যান্য নদ-নদী ও খাল-বিল রক্ষায় সরকার, জনগণ, এনজিও, সুধীসমাজ, সংগঠক, গবেষকসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।


লবলং খাল দূষণমুক্ত করা গেলে তুরাগের দূষণ হ্রাস পাবে

সাঈদ চৌধুরী

সদস্য, উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি ও রসায়নবিদ, শ্রীপুর, গাজীপুর

 

লবলং সাগরখ্যাত যে খালটি রক্ষার কথা বারবার বলা হচ্ছে, সে খালটি ছিল একটা সময় এই অঞ্চলের সেচের প্রধানতম উৎস। অনেক প্রশস্ত ও খরস্রোতা ছিল। আজ এটি দখলে-দূষণে নিখোঁজ হতে চলেছে। ভূগর্ভস্থ পানি তোলার কোনো ধরনের নিয়ম-নীতি পালন না করার ফলে কলকারখানাগুলো প্রচুর পরিমাণ পানি প্রতিদিন উত্তোলন করার কারণে এই খালটি আজ মৃতপ্রায়। প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ দূষিত পানি এ খাল দিয়ে বয়ে গিয়ে পতিত হয় তুরাগ নদীতে। অনেক প্রতিষ্ঠান এই খাল ব্যবহার করার মাধ্যমেই তাদের আয়ের উৎস সৃষ্টি করলেও প্রকৃতির যত্ন নেওয়ার ব্যাপারটি যেন তাদের কাছে তামাশাই। শুধু সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত নিয়মগুলো পালন করলেই এই খাল হতে পারত পরিবেশ-উপযোগী একটি জলাশয়। অনেক প্রতিষ্ঠানই পানি পরিশোধনাগার ব্যবহার করে না। এভাবে চলতে থাকলে মাওনা, বাংলাবাজার, হোতাপাড়া, পিরুজালী, মির্জাপুরের ভূগর্ভস্থ পানির মান স্বাস্থ্যসম্মত না থাকার অবস্থা সৃষ্টি হবে। ভূগর্ভস্থ পানি তোলার একটি নীতিমালা থাকতে হবে এবং সে অনুযায়ী পানি তোলার নিয়ম চালু করতেই হবে। যে পরিমাণ পানি তোলা হবে, জিরো ডিসচার্জ প্লান্টের মাধ্যমে ওই পানি আবার ব্যবহারের পদ্ধতি চালুর ব্যাপারে সরকারের মনোযোগী হতে হবে। লবলং খালটি দূষণমুক্ত করা গেলে তুরাগের দূষণ ৩০ শতাংশ হ্রাস পাবে।


মন্তব্য