kalerkantho


যাত্রাবাড়ীর অগ্রদূত বিদ্যানিকেতন

শত অভিযোগেও বহাল প্রধান শিক্ষক

তৈমুর ফারুক তুষার   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



শত অভিযোগেও বহাল প্রধান শিক্ষক

শত অভিযোগের পরও নিজ পদে বহাল রয়েছেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর অগ্রদূত বিদ্যানিকেতনের প্রধান শিক্ষক এনামুল হক রিপন। স্কুল ফান্ডের টাকা নয়-ছয়, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়, টাকার বিনিময়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, অন্য স্কুলের শিক্ষার্থীদের টাকার বিনিময়ে নিজের স্কুলে পরীক্ষার সুযোগ করে দেওয়াসহ নানা অভিযোগ রয়েছে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে।

এমনকি বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্রীর শ্লীলতাহানির অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে। শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা তাঁর বিরুদ্ধে মানববন্ধনও করেছেন। স্কুলের ২৫ জন শিক্ষকের মধ্যে ১৯ জনই তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ও দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দিয়েছেন। তার পরও প্রধান শিক্ষক এনামুল হক রিপন রয়েছেন বহাল তবিয়তে।

প্রধান শিক্ষক রিপনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির অভিযোগে অক্টোবর মাসের শুরুতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি। তদন্ত কমিটিতে স্থানীয় গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে শফিউল্লাহ সরকার, শাহ আলম মুকুল ও কাজী সালামকে সদস্য করা হয়। এ তদন্ত কমিটি বিদ্যালয়ের নির্যাতিত সব শিক্ষার্থীর সাক্ষ্য রেকর্ড করে। শিক্ষার্থীরা প্রধান শিক্ষকের দ্বারা তাদের যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনাগুলো তদন্ত কমিটির কাছে তুলে ধরে। তদন্ত কমিটির সদস্য শাহ আলম মুকুল বলেন, ‘আমরা ছাত্রীদের কাছে গেছি।

তাদের সাক্ষ্য রেকর্ড করেছি। তারা যে অভিযোগগুলো তুলেছে সেগুলো প্রতিবেদন আকারে জমা দিয়েছি। ’ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহরাব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের জন্য গঠিত তদন্ত কমিটি এরই মধ্যে আমার কাছে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। আমি তদন্ত প্রতিবেদনটি স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে জমা দিয়েছি। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে আমরা একটি সিদ্ধান্ত নেব। ’

এসব বিষয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক এস এম ওয়াহিদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অগ্রদূত বিদ্যানিকেতনের শিক্ষকদের অভিযোগের বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে এ বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। ’

গত সেপ্টেম্বর মাসে স্কুলের ১৯ জন শিক্ষক একযোগে অভিযোগ জমা দেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। সেখানে বলা হয়, স্কুলে তিনতলা ভবন নির্মাণের জন্য সরকারি বরাদ্দ আসে। কিন্তু তিনি এই ভবন নির্মাণের জন্য সব শিক্ষকের ১০ মাসের টাকা আটকে রেখেছেন। স্কুলে বছরের ১২ মাসই চলে কোচিং বাণিজ্য। আর এর পুরো টাকা যায় প্রধান শিক্ষকের পকেটে। নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলসহ আশপাশের বেশ কিছু স্কুল যাদের পরীক্ষা দেওয়ার অনুমোদন নেই, তারা এই স্কুল থেকেই পরীক্ষায় অংশ নেয়। প্রধান শিক্ষক এনামুল হক রিপন চড়া মূল্যে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেন। তবে কোনো রশিদ দেন না। পিএসসি, জেএসসি ও এসএসসি মিলিয়ে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী অগ্রদূত থেকে পরীক্ষা দিয়ে থাকে। এর পুরো টাকাই যায় প্রধান শিক্ষকের পকেটে।

এনামুল হকের বিরুদ্ধে এসএসসির টেস্ট পরীক্ষায় ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগ করা হয়। তিনি টেস্ট পরীক্ষায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর দুটি নম্বরপত্র তৈরি করেন। যারা পাস করে তাদেরও দুই-তিন বিষয়ে ফেল দেখানো হয়। এর পর প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে পরীক্ষায় ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়। এমনকি এই স্কুলের পরীক্ষার কেন্দ্র পড়ে যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুলে। ওই স্কুলের সঙ্গে চুক্তি করে তিনি টাকার বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের নকল সরবরাহ করেন। একাধিক শিক্ষকের কাছে এমপিওভুক্তির জন্য টাকা নেওয়া হলেও তাঁদের এমপিওভুক্ত করতে পারেননি, টাকাও ফেরত দেননি। এমনকি প্রতিবছর বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও মিলাদের জন্য টাকা উঠানো হলেও এর কোনো আয়োজন নেই স্কুলে। পুরো টাকাই মেরে দেন তিনি।

অভিযোগে আরো বলা হয়, স্কুলের সামনে একাধিক দোকান রয়েছে। এ ছাড়া একসময় অডিটোরিয়ামও ভাড়া হতো। এসবের ভাড়ার পুরো টাকাই যায় প্রধান শিক্ষকের পকেটে। শিক্ষাক্রম বহির্ভূত একাধিক বই এই স্কুলে পাঠ্য করা হয়। যার বিনিময়ে প্রতিবছর তিনি কমিশন বাবদ পান দুই থেকে তিন লাখ টাকা। এমনকি শিক্ষার্থীদের প্রশংসাপত্র নিতে এসেও দিতে হয় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী সালমা আক্তার এসএসসি পাস হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে বিএ পাস দেখিয়ে শিক্ষকের চাকরি দিয়েছেন। কয়েক বছর আগে বেলায়েত হোসেন নামে একজন শিক্ষককে তিনি টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দিয়েছেন। অথচ তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি পাস।

প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে রয়েছে শ্লীলতাহানির অভিযোগ। তিনি এই স্কুলেরই একাধিক ছাত্রীর শ্লীলতাহানি করেছেন। এমনকি প্রাইভেট পড়াতে গিয়েও তিনি ছাত্রীদের সঙ্গে একই আচরণ করেন। সম্প্রতি অভিভাবকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পরিচালনা পর্ষদ বিষয়টি তদন্ত করে। এতেও অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এর পরও কোনো এক অদৃশ্য হাতের ইশারায় তিনি বহাল তবিয়তেই প্রধান শিক্ষক হিসেবে তাঁর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

অগ্রদূত বিদ্যানিকেতনের প্রধান শিক্ষক এনামুল হক রিপন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা। আসলে আমাকে স্কুল থেকে উত্খাত করতেই একটি চক্র ষড়যন্ত্র করছে। আর ছাত্রীর শ্লীলতাহানির কোনো ঘটনাই ঘটেনি। যাদের নিয়ে এসব কথা রটানো হয়েছে, তারাই লিখিতভাবে জানিয়েছে, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। ’


মন্তব্য