kalerkantho


কালশী সড়ক ও ফুটপাত বেদখল

ভোগান্তিতে পথচারী

মো. হারুন অর রশিদ   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ভোগান্তিতে পথচারী

কালশী সড়কটি ৮০ ফুট প্রশস্ত। এ সড়কটি উত্তরা, আব্দুল্লাহপুর থেকে মিরপুর হয়ে গাবতলী যাতায়াতের একমাত্র অবলম্বন।

এটা বেশ জনবহুল একটি সড়ক। গাবতলী থেকে আব্দুল্লাহপুরগামী সব পরিবহনই দিন-রাত এ সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে। আব্দুল্লাহপুর থেকে কুড়িল উড়াল সড়ক হয়ে মিরপুর ১২ নম্বর প্রধান সড়কে এসে মিলেছে এই সড়ক। সরেজমিনে দেখা গেছে, এ সড়কের দুই ধারে ফুটপাতসহ সড়কের এক-তৃতীয়াংশ জায়গা দখলদারদের কবলে। সড়কের দুই ধারেই ফুটপাতজুড়ে ভাঙ্গারির দোকান, নতুন-পুরনো ফার্নিচারের দোকান, গ্রিলের কারখানা, চা দোকানসহ ইমারত তৈরির সরঞ্জাম—ইট, বালু, রড ইত্যাদি দিয়ে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে রাখা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা মজিবর রহমান বলেন, ‘এই সড়কের পাশে যত দোকানদার রয়েছে, সবাই সড়ক দখল করে ব্যবসা করছে। এর ফলে সড়কের প্রশস্ততা কমে গেছে, আর ফুটপাত তো পুরোপুরিই বন্ধ। বাধ্য হয়ে পথচারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়কের মাঝখান দিয়ে চলাচল করে। যার ফলে প্রায় সময়ই এখানে যানজট লেগে থাকে।

মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনাও ঘটে। ’

নাদিম ফার্নিচারের মালিক ফাহিম মিয়া বলেন, ‘বেআইনিভাবে দখলের কারণে পুরো পরিবেশটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা এই বেআইনি দখলকৃত সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রেখে ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাচ্ছি। এর ফলে ফুটপাত ধরে অবাধে পথচারীরা হাঁটতে পারবে। এলাকায় যানজট ও দুর্ঘটনার মাত্রাও কমবে। ’

এ এলাকার ভ্যানচালক শহিদ উদ্দিন বলেন, ‘সড়ক ও ফুটপাত দখলের কারণে মানুষের চলাচলে অনেক সমস্যা হয়, বিশেষ করে স্কুলের মেয়েরা ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে পারে না। এখানে ফার্নিচার, গ্রিলের দোকানের কিছু কারিগর আছে, যারা প্রায়ই স্কুলগামী মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে। ফুটপাত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে মানুষ রাস্তা দিয়া চলাচল করে, অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। কিছুদিন আগেও একটি স্কুলের বাচ্চা গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে প্রাণ হারিয়েছে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘এখানে ফুটপাতের ধারে অনেক চা দোকান পাবেন, যেখানে মাদক বিক্রি হয়। যথারীতি পুলিশ টহল থাকলেও তাদের সামনেই সব কিছু হয়। তারা দেখেও না দেখার ভান করে। যদি কখনো মাদকসেবনকারীকে পুলিশ আটক করলেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়। কারণ এসব কাজের সঙ্গে পুলিশও জড়িত। আমি ভ্যান চালাই, গরিব মানুষ, অনেক কিছুই দেখি, কিন্তু কইতে পারি না। তা ছাড়া এলাকার বড় ভাইরা তো আছেই। ’

স্থানীয় চা দোকানদার জামিল মিয়া একজন দখলদার। তিনি বলেন, ‘আমরা বিহারি। এই জায়গা আমার দখলে। সরকার আমারে অন্য জায়গায় বসার ব্যবস্থা করে দিক, আমি এই যায়গা ছাইড়া দিমু। ’ আরেক দখলদার গ্যারেজ মালিক শহিদ বলেন, ‘আমাদের মালামাল রাখার জায়গা নেই। তাই ফুটপাতে মালামাল রাখছি, তাতে কী হয়েছে? আমরা তো পুরো রাস্তা বন্ধ করিনি। তা ছাড়া আমরা রীতিমতো চাঁদা দিচ্ছি। ’ কাকে চাঁদা দেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বড় ভাই ফাক্কু মিয়া, শাহাজাদা আর পুলিশ তো আছেই। ব্যবসার প্রয়োজনে তাদের চাঁদা দিতে হয়। একাই রাজত্ব করবেন তা হইব না ভাই, কিছু খাইতে হইলে দিয়া-থুইয়া খাইতে হইব। ’

স্থানীয় বাসিন্দা বাবু রহমান বলেন, ‘এই দখলদারদের সঙ্গে কিছু স্থানীয় ও বিহারি ক্যাম্পের নেতারা জড়িত। পাশেই বিহারি ক্যাম্প আছে, তাই তারা এখানে প্রভাব খাটিয়ে, পুলিশকে বখরা দিয়ে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করছে। পাশাপাশি এখানে রীতিমতো মাদকের বাজার বসে। ’ এই মাদক ব্যবসায়ী কারা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফাক্কু গ্রুপ ও শাহাজাদা গ্রুপ। তারা পুরো মিরপুরের ২, ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড এলাকাজুড়ে মাদক ব্যবসা চালায়। বছরের পর বছর এদের মাদক ব্যবসা চললেও কেউ যেন দেখার নেই। কে দেখব—শস্যের মধ্যেই যদি ভূত থাকে, তাইলে কে কারে দেখব বলেন। ’ কথা হয় মাদক ব্যবসায়ী ফাক্কু মিয়ার সঙ্গে। তার কাছে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মিথ্যা কথা, আমারে অপমান করার জন্য, বিপদে ফালানোর জন্য আমার বিপক্ষের কিছু লোক এই বদনাম দিচ্ছে। আমি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত না। আপনি প্রমাণ দিতে পারলে পুরস্কার আছে। ’ দখলের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দখল তো আমরা করিনি, বরং সরকার আবাসনের ব্যবস্থা না করে, আমাদের দোকানপাট ভেঙে রাস্তায় নামিয়েছে। ’

সাংবাদিক প্লট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা উম্মে কুলসুম লিপি বলেন, ‘সড়ক ও ফুটপাত দখলের কারণে এখানে যানজট লেগেই থাকে। আমাদের স্কুলভ্যান যাতায়াতে বিলম্ব হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা সময়মতো স্কুলে উপস্থিত হতে পারে না। এ ছাড়া দখলের কারণে শিক্ষার্থীরা সড়কে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করে। মাঝেমধ্যে ওই সব ভাঙ্গারি, গ্রিল ও ফার্নিচার দোকানের সামনে দিয়ে যাতায়াতের সময় ছাত্রীরা লাঞ্ছিত হয়। এ সড়কের দুই ধারেই আরো বেশ কয়েকটি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও হাসপাতাল রয়েছে। দখলের কারণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। কোমর সমান পানিতে ফুটপাতসহ সড়ক ডুবে যায়। বৃষ্টি এলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসতে মহাসমস্যায় পড়তে হয়; কিন্তু কী করার, চাকরি যেহেতু করি, স্কুলে তো আসতেই হবে। আমরা এই দখলের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বলেছি, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। মেয়র মহোদয়ের অঙ্গীকার ছিল—দখল, মাদকমুক্ত ও সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ গড়ার। আমাদের আবেদন, তিনি যেন তাঁর অঙ্গীকার রক্ষা করে সুন্দর একটি পরিবেশ আমাদের উপহার দেন। ’

অত্র এলাকার কাউন্সিলর মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা এই দখলদারদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। একবার উচ্ছেদ করি তো আবার দখল হয়ে যায়। আমি মেয়র মহোদয়ের কাছে আবেদন করেছি, তিনি যেন স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। মেয়র মহোদয় শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকার কারণে, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের কাজে কিছুটা দেরি হচ্ছে। তবে খুব শিগগিরই পুরো এলাকা দখলমুক্ত করা হবে। ’ মাদকের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার এলাকা মাদকমুক্ত করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছি; কিন্তু পুলিশ প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। ’


মন্তব্য