kalerkantho


শিশুশ্রমেই তৈরি হচ্ছে শিশুর বই

জাহিদুল ইসলাম   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



শিশুশ্রমেই তৈরি হচ্ছে শিশুর বই

আসছে নতুন বছর। প্রেসগুলোতে এখন চলছে নতুন বই তৈরির কাজ।

নতুন এসব বই মূলত তৈরি হচ্ছে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য। এসব বই তৈরিতে কাগজ পরিবহন, মেশিনে কাগজ জোগান দেওয়া, মেশিন চালনা, বাঁধাই, বই প্রক্রিয়াজাতকরণসহ নানা কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বেশির ভাগই শিশু। অর্থাৎ শিশুশ্রমেই তৈরি হচ্ছে শিশুদের বই। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে যারা এসব বই তৈরি করছে তারাই বঞ্চিত হচ্ছে এসব পড়ার সুযোগ থেকে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বাংলাবাজার, প্যারিদাস রোড, হেমেন্দ্র দাস লেন, তনুগঞ্জ লেন, শিরিশ দাস লেন, পাতলা খান লেনসহ যেসব এলাকায় প্রিন্টিং প্রেস আছে সেসব প্রিন্টিং প্রেসের বেশির ভাগ শ্রমিকই ১০ থেকে ১২ বছরের শিশু। আর যারা ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সের আছে, তারাও এসব প্রেসে কাজ করছে সেই শিশুকাল থেকেই। এদের অনেকে প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডিও পার হতে পারেনি। অনেককে স্কুলমুখী হওয়ার আগেই নামতে হয়েছে কাজে।

বাংলাবাজারে যেসব প্রিন্টিং প্রেস রয়েছে প্রায় সব কটিতেই দারিদ্র্যের দায়ে অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশু কাজ করছে এসব বই তৈরিতে।

বাংলাবাজারের একাধিক প্রিন্টিং প্রেস ও বাঁধাইখানায় ১০ থেকে ১২ বছরের অনেক ছেলেকে কাজ করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া সূত্রাপুর, পাতলা খান লেনসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য ছাপা ও বাঁধাইখানা রয়েছে, যেখানে সস্তা শ্রমে দিনে ১০-১২ ঘণ্টা করে কাজ করছে শিশুরা। এসব শিশুশ্রমিককে নামমাত্র বেতনে কাজ করিয়ে নিচ্ছে মালিকপক্ষ। ফলে তারা ন্যায্য পাওনা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরে দু-একবার কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লেও তার ছুটি নেই। এমনও ঘটেছে যে অমনাবিকভাবে কাজ করিয়ে নেওয়ায় অনেক শিশু পালিয়ে গেছে।

কথা হলো আকসার বুক বাঁধাইয়ে কর্মরত টাঙ্গাইল থেকে আসা রমজানের সঙ্গে।   সে বলল, ‘এই প্রেসে দুই বছর ধইরা কাজ করি, বেতন পাই তিন হাজার ৫০০ টাকা। ওভার টাইম করলে মাসে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আসে। থাকার ব্যবস্থা মালিকের হলেও নিজের টাকায় খাইতে হয়। এতে প্রতি মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার বেশি থাকে না। ’ যা তাদের পরিশ্রমের তুলনায় খুবই নগণ্য। আল মনসুর বুক বাইন্ডিংয়ে দেখা গেল আরেক চিত্র। এখানে বাঁধাইকাজে নিয়োজিত ১০ জনের মধ্যে সাতজনের বয়স ১২ বছরের নিচে। নোয়াখালী থেকে আসা আব্দুল্লাহ ও তুহিন দুজনে চাচাতো ভাই, এক বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করছে এখানে। তাদের থাকা ও খাওয়া মালিকের হলেও বেতন আড়াই হাজার টাকা। এত বেশি শ্রম দিয়ে এত কম টাকা কেন জানতে চাইলে তারা জানায়, ‘কোনো উপায় নেই, কারণ তাদের কেউ কাজ দেবে না, কিন্তু তারা কাজ না করলে খাবে কী?’ এ কারণে এক প্রকার বাধ্য হয়েই এ কাজ করতে হয় তাদের। মিনার বুক বাইন্ডিংয়ে কাজ করে ৯ বছরের হালিম। সে জানাল, ‘আমাকে ছয় মাস শুধু পেটে-ভাতে থাকতে হইছে। কাজ শেখার পর থাইকা, খাওয়া বাদে এক হাজার ৫০০ টাকা বেতন ধরছে। ’

মোকসেদ প্রিন্টিংয়ে কাজ করা সোহেল জানায়, ‘এক বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করি কিন্তু আমার বেতন বাড়ে না। ’ নতুন বছরের বই প্রসঙ্গে আরমান জানায়, ‘নতুন বইয়ের ঘ্রাণ পাইতে ছোটবেলায় ভালো লাগত। আমি পড়তে পারি না দেখে কি হইছে—যারা পড়বে তারা তো আমার মতোই শিশু!’

কেন শিশুদের এসব ভারী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি আরিফ হোসেন (ছোটন) বলেন, ‘বাঁধাই প্রতিষ্ঠানের মালিকদের আমরা বারবার সতর্ক করেছি এবং বলেছি শিশুশ্রমিকদের কাজে নেবেন না। আর নিলেও তাদের দ্বারা ভারী কাজ করাবেন না। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখে যদি এ রকমটি পাই, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে সমিতির নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুস্তক বাঁধাই সমিতির সভাপতি এমএ মল্লিক বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি বিষয়টি খতিয়ে দেখার। এ রকমটি হলে সমিতির পক্ষ থেকে তাঁদের ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল করার সুপারিশ করা হবে। ’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির পরিচালক আনজির লিটন বলেন, ‘শুধু বই বাঁধাই নয়, যারা বিভিন্ন কাজে শিশুদের ব্যবহার করে তাদের সচেতন করতে হবে। এ বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগ ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করি। ’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মিজানুর রহমান বলেন, ‘শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও বিনোদনের কোনো বিকল্প নেই। সরকার জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী শিশু অধিকার সংরক্ষণ, শিশুর জীবন ও জীবিকা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ প্রদান, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি পরিচালনাসহ শিশু নির্যাতন বন্ধ, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের বৈষম্য বিলোপ সাধনে বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর পাশাপাশি প্রণয়ন করা হয়েছে ‘জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি-২০১০’ ও ‘জাতীয় শিশুনীতি-২০১১’। এসব কর্মসূচি ও নীতিমালা শিশুর শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে গুরুতপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ’

শিশু অধিকার নিশ্চিত ও শিশুশ্রম বন্ধ করতে আমাদের সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে। এ জন্য মিডিয়া, সুধীসমাজ, শিক্ষাবিদসহ সমাজের সব নাগরিককে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, জাতীয় শিশুনীতি-২০১১, জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০সহ শিশুদের স্বার্থ রক্ষায় সব আইন ও নীতিমালার বাস্তবসম্মত সমন্বয়, বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ করা খুবই জরুরি।


মন্তব্য