kalerkantho

বাসে নতুন আতঙ্ক

মারুফা মিতু   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বাসে নতুন আতঙ্ক

ছবি : শেখ হাসান

‘প্রথমত, মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের কোনো আইন না থাকলেও অন্যান্য আইনের যেসব ধারা রয়েছে সেগুলোর মাধ্যমে আচরণকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যুবসমাজের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

বিশেষ করে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া, শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করা—এ বিষয়গুলো ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে তৈরি করতে পারি। ’

 

‘বাসে যখন উঠতে যাই, তখন আতঙ্ক থাকে হেলপারের। কারণ হেলপার বাসে ওঠার সময় কেন যেন তোড়জোড় করে উঠাতে গিয়ে গায়ে হাত দেবেই। যতই আপনি সচেতন থাকুন না কেন, হেলপারের চতুরতায়-নোংরামিতে পেরে ওঠা যায় না। আর বাসের ভেতরে বিকৃত রুচির যাত্রীদের কথা আর নাই বা বললাম। সিটে বসি কিংবা দাঁড়িয়ে, নানা উপায়ে তারা গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করেই। এত দিন ছিল এই বিড়ম্বনা। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জামা-কাপড় কেটে দেওয়ার মতো নতুন যন্ত্রণা। কি যে বিব্রতকর।

’ নিয়মিত বাসে যাতায়াত করেন এমন এক তরুণী রাইসা ইয়াসমীন। তিনি জানালেন তাঁর বাসে চড়ার এমন অভিজ্ঞতার কথা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি ঘটনার উল্লেখ করেন এক তরুণী। একদিন সন্ধ্যায় নিউ মার্কেট থেকে বাসায় ফিরতে ঠিকানা বাসে করে দুই বান্ধবী শনির আখড়ায় নামেন। বাস থেকে নেমে দেখতে পান তাঁর বান্ধবীর জামা সেমিজসহ বক্স করে কাটা। এ সময় তাঁর বান্ধবী ওড়না দিয়ে কাটা অংশ ঢেকে ফেলেন। এরপর যখন তিনি তাঁর বান্ধবীর সামনে দিয়ে হাঁটা শুরু করেন তখন দেখা যায় তাঁর নিজের জামাও একইভাবে কাটা।

ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর জামা ও পাজামা দুটিই কেটে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। সামাজিক মাধ্যমে ওই তরুণী লিখেছেন, ভার্সিটি থেকে বাসায় আসার সময় রামপুরা থেকে বাসে উঠি আমি আর আমার বন্ধু। আমার দুই সিটে আমি একা। বাসের সিটটা একটু নড়াচড়া করছিল। ব্রেক করলে সিটটা সামনে চলে যাচ্ছিল। হতেই পারে পাবলিক বাস! পিঠের সিট আর বসার সিটের জয়েন্ট দুইয়ের মধ্যে ফাঁক হয়ে যাচ্ছিল বারবার। হঠাৎ মনে হলো ওই ফাঁক দিয়ে পেছনের লোকটা হাত দেওয়ার চেষ্টা করছে। বুঝতে পেরে আমি পেছনের লোকটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বয়স ৪৫ বছরের বেশি হবে। আমার তাকানো দেখে সে কিছুই বুঝল না ভাব। আমি সরে পাশের সিটে গিয়ে বসলাম। বাস থেকে নামার পর আমার ফ্রেন্ড জানতে চায় আমার জামা ছিঁড়ল কিভাবে? তখন দেখি এ অবস্থা! আমি তো থ! তখন বুঝলাম ঘটনাটি ঘটেছে ওই সময়ই! ভেবে পাই না কী পেল এটা করে, কেন করল? তারপর ভাবলাম পায়জামাটা দেখি তো, তখন হাত দিয়ে দেখি পায়জামাও কাটা। এত কিছু কখন, কিভাবে করল, আমি কিচ্ছু টের পেলাম না। হাত-পা কাঁপা শুরু হয়ে গেছে।

এক নারী সাংবাদিক সামাজিক মাধ্যমে এ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, একদিন বসুন্ধরার গেটে বাস থেকে নামলাম, দেখি আমার সামনে এক মেয়ে খুব বিব্রত হয়ে রিকশা খুঁজছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি তার সাদা জামা ব্লেড কিংবা এন্টিকাটার জাতীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে অনেক জায়গায় কেটে দেওয়া। সে জন্য মেয়েটি এত বিব্রত বোধ করছে। ঠিক তার পাঁচ দিন পরে আমি অফিস থেকে ফিরছি, পরনে ছিল শাড়ি। পেছনের সিট থেকে কেউ আমার কোমরে হালকা স্পর্শ করছিল। আমি কয়েকবার হাত দিয়ে সরিয়ে দিলাম। ভেবেছিলাম পেছনের ভদ্রলোক পা তুলে বসেছে, তাই তার পায়ের নখ সিটের ফাঁক দিয়ে আমার কোমরে লাগছে। কিন্তু না, বাসায় ফিরে দেখি আমার শাড়ির ১০ থেকে ১২ জায়গায় ব্লেড দিয়ে কেটে দেওয়া। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় রিকশা আরোহী এক তরুণীর জামা কাটার উদ্দেশ্যে তাঁকে পেছন থেকে ব্লেড দিয়ে আক্রমণ করে দুর্বৃত্তরা। এতে ওই তরুণীর শরীরের একটি বড় অংশ কেটে যায়। তাকে হাসপাতালে গিয়ে সেলাই নিতে হয়। এই ঘটনার দুদিন পর একই স্থানে অপর এক তরুণী একইভাবে আক্রান্ত হন। তবে সেখানকার পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি।

বাস ছাড়াও দু-একজন নারী যাঁরা রিকশায় বসা অবস্থায় এ ধরনের বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন, তাঁদের একজন শায়লা মুস্তারী। তাঁর ঘটনাটুকু তিনি জানান এভাবেই—‘সন্ধ্যায় আমি আমার স্বামী ও ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। শান্তিনগর ইস্টার্ন প্লাস থেকে ফেরার পথে মৌচাক মোড়। প্রচণ্ড জ্যাম। গাড়ি চলছেই না বলতে গেলে। জ্যাম ঠেলে ধীরগতিতে আমাদের রিকশা চলছিল। মৌচাক মার্কেটটা পার হতেই হঠাৎ দেখি আমার গলায় বিশাল এক থাবা। এবং আঁচড়। আমার গলার চেইনটা টান দেয়। আমি ভাবলাম যাক চেইন নিয়ে গেছে সমস্যা নেই। কিন্তু বাসায় এসে দেখি যে জায়গাটায় চেইন নেওয়ার জন্য টান দিয়েছিল সে জায়গার জামাটুকু অনেকখানি কাটা। চুল ছাড়া থাকার জন্য আমি বুঝতে পারিনি পিঠের এতটুকু কাটা। আমরা এমন একটা আজব দেশে বাস করছি আর মানুষের এমন আজব ব্যবহারে আশ্চর্য হওয়া ছাড়া আমাদের আসলে কিছু করার নেই। ’  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারাহ দীবা জানান, ‘গণপরিবহনে মেয়েদের চলাফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার যে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে সেখানে একেক সময় একেক কারণ লক্ষ করা যায়। আমাদের দেশে পাবলিকলি চলাফেরা করার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের যে সমঝোতা থাকা দরকার কিংবা একজন আরেকজনকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করার যে মানসিকতা সেখানে সামাজিক শিক্ষার যে ঘাটতি রয়েছে তা স্পষ্ট। ’ প্রযুক্তির অপব্যবহারকে দায়ী করে ওই মনোবিজ্ঞানী আরো বলেন, ‘যুবক সমাজের মধ্যে বিকৃত যৌন লালসার চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন মাধ্যমে সমাজজীবনে নারীদের যৌন লালসা মেটানোর মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। মোবাইল ও ইন্টারনেটের কারণে পর্নোগ্রাফি মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেছে। এগুলো উপভোগ করার কারণে তার মধ্যে বিকৃত যৌন মানসিকতা তৈরি হয়। এগুলো তারই বহিঃপ্রকাশ। ’ এমনকি আইন করে নারী সমাজকে এই ধরনের ঘটনা থেকে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ সীমিত বলে মনে করেন ওই সমাজবিজ্ঞানী। এর প্রতিকার হিসেবে দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের কোনো আইন না থাকলেও অন্যান্য আইনের যেসব ধারা রয়েছে সেগুলোর মাধ্যমে আচরণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যুবসমাজের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। বিশেষ করে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া, শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করা—এ বিষয়গুলো ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে তৈরি করতে পারি। ’ দুটি বিষয়ের সমন্বয় করা হলে এ ধরনের ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।


মন্তব্য