kalerkantho


শত প্রতিকূলতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো লুবনা

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



শত প্রতিকূলতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো লুবনা

মিরপুরের মেয়ে লুবনা আহমেদ। অল্প বয়সে পরিবারের অমতে বিয়ে করেন।

বিয়ের পর স্বামীপ্রবর হয়ে ওঠেন নেশাগ্রস্ত। পিতৃগৃহে ফিরে এলেও চলে একাকী জীবনযুদ্ধ। একে একে এনজিও, গার্মেন্ট, বিদেশি বায়িং হাউসে চাকরির পাশাপাশি ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্বপ্নীল বিউটি সিক্রেট’। বর্তমানে তাঁর তিনটি আউটলেট। নির্ভীক এই নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প শোনাচ্ছেন হোসাইন মোহাম্মদ জাকি

 

‘শৈশব-কৈশোর থেকেই আমি ছিলাম বেশ দুরন্ত। ১৯৯৫ সালে এসএসসি পাসের পরপরই মা-বাবা আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়েন। বিদেশে সেটেল্ড পাত্রের কাছে পাত্রস্থ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। সেই পাত্র দেখার সুযোগ হলো। একেবারেই পছন্দ হলো না।

দেশত্যাগেরও ঘোরবিরোধী ছিলাম। উচ্চশিক্ষা অর্জন করে স্বাবলম্বী হব, এটাই ছিল আমার প্রত্যাশা। বেঁকে বসায়, অবধারিতভাবে গৃহবন্দি হলাম। বন্দিদশা থেকে মুক্তির পথ খুঁজছিলাম। বান্ধবীদের কাছে শুনেছি, মহল্লার এক তরুণ ছোটবেলা থেকেই আমাকে পছন্দ করে। এ সময় ছেলেটি সম্পর্কে জানার কৌতূহল হয়। অপরিপক্ব বয়সের ভাবনায় এসেছিল—দেশি যুবককে বিয়ে করলে অন্তত পড়াশোনাটা সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। নিজের মতো করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পাব। পালিয়ে ছেলেটির সঙ্গে একাধিকবার দেখা করি। জীবনসঙ্গী হিসেবে তাকে ভাবতে শুরু করি। ফলে বাড়ি থেকে এক কাপড়ে পলায়ন। ’ স্মৃতি হাতড়ে লুবনা তাঁর মর্মস্পর্শী এই জীবনকাহিনি বলে চললেন।

‘পরিবারের অমতে বিয়ের সিদ্ধান্তটা যে ভুল ছিল, বছর না ঘুরতেই বুঝতে পারি। একদিকে মা-বাবা ও অন্য আত্মীয়-স্বজনের রাগ, ক্ষোভ ও ঘৃণার পাত্র, অন্যদিকে আমার পরিবারকে বলে স্বামীকে যেন বিদেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করি, সে জন্য শাশুড়ি ও ননদের প্রচণ্ড মানসিক চাপ। উঠতে-বসতে মা-বাবা সম্পর্কে কটুবাক্য। দিনান্ত পরিশ্রম করে স্বামীর উপার্জন ছিল যৎসামান্য। প্রথমবার সন্তান গর্ভে আসার খবর শুনে শাশুড়ি খাবারে ওষুধ মিশিয়ে অকালে গর্ভপাত ঘটান। কী যে কষ্টে একেকটা দিন পার হতো বলে বোঝাতে পারব না। এ সময়ে ব্র্যাকের এডুকেশন প্রগ্রামে চাকরি পেলাম। মাস শেষে শাশুড়ি বেতনের টাকা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিতেন। কিছুদিন পর ননদের মাধ্যমে জানতে পারেন, যাতায়াত ভাতা বাবদ পাওয়া ৩০০ টাকা আমি তাঁকে দিই না। খবরটা শুনে তাঁর সে কী সহিংস মূর্তি! এদিকে আমার স্বামীও তখন নেশাগ্রস্ত হয়ে রাত-বিরাতে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। অভিশপ্ত এই জীবনের দুরবস্থার কথা কারো কাছে বলারও সুযোগ ছিল না। ’ জীবনযুদ্ধের এই গল্প বলতে গিয়ে লুবনা বারংবার কান্না আড়ালের চেষ্টা করছিলেন।

‘‘এরপর আবারও গর্ভবতী হলাম। হাসপাতালে সন্তান জন্মদানের সময় স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির কারো দেখা পেলাম না। অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার আগে অঙ্গীকারনামায় অভিভাবকের স্বাক্ষর দেওয়ার জন্য বাধ্য হয়ে আমার মাকে হাসপাতালে আসতে হলো। কিন্তু তাঁর একটাই দাবি—‘আগে তথাকথিত স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্সের কাগজে সই কর, তারপর তোমার দায়িত্ব নেব। ’ এমন সময় রাগ ভুলে গিয়ে বাবা এগিয়ে এলেন। আমার চিকিৎসার সমুদয় ব্যবস্থা করলেন। কন্যাসন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে এলাম। কিন্তু পরিবারের সঙ্গে একটা অদৃশ্য দেয়াল রয়েই গেল। বাবার ওপর বোঝা হতে আমার তীব্র আপত্তি ছিল। পরিচিতজনের মাধ্যমে মিরপুর-১১-তে অবস্থিত সিপ নামের এনজিওতে চাকরির ব্যবস্থা হলো। এরই মধ্যে আমি নিজের উদ্যোগে এইচএসসি ও ওপেন ইউনিভার্সিটির দূরশিক্ষণের আওতায় গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করলাম। ২০০৪ সালে একটি গার্মেন্ট কম্পানিতে চাকরির ব্যবস্থা হলো। রিসিপশন থেকে শুরু করে পালাক্রমে অ্যাডমিন ও মার্চেন্ডাইজিংয়ে প্রায় ১০ বছর এখানে কাজ করার সুযোগ হলো। স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য বন্ধের দিনগুলোতে ব্লক, বাটিক, মেকআপ, বিউটি ট্রিটমেন্ট—এসব শিখতে সচেষ্ট হলাম। স্বামীকে তালাক দিলাম।

বেতন থেকে অল্প অল্প করে জমিয়ে ২০০৮ সালে চাকরির পাশাপাশি স্বল্পপরিসরে শুরু করলাম ‘স্বপ্নীল ড্রেস কালেকশন’। কালশীতে বাবার বাড়ির কাছেই একটি দোকান ভাড়া নিয়ে শুরু করি এই কার্যক্রম। সেখান থেকে গুটিয়ে ২০১০ সালে পৈতৃক ভিটার নিচতলা ভাড়া নিয়ে নতুন উদ্যমে শুরু করি ‘স্বপ্নীল বিউটি সিক্রেট’। এখানে চালু করি সাজসজ্জার সব আয়োজন এবং ব্লক, বাটিক, মেকআপ ও বিউটি ট্রিটমেন্টের প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি চলে বিভিন্ন ধরনের ব্লক, বাটিকের কাপড় বিক্রি। তখন বেতনভুক কর্মী ছিল মাত্র একজন। খণ্ডকালীন সহযোগী হিসেবে ছিল চার-পাঁচজন। গার্মেন্টে কাজের অনেক চাপ ও ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অদম্য বাসনায় ১৮-১৯ ঘণ্টা কাজের মধ্যে থাকতেও আমার কষ্ট হয়নি; কিন্তু পরিবারের অমতে বিয়ের শাস্তি যেন শেষ হয়নি তখনো। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো একদিন সাবেক স্বামী অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় কর্মস্থলে এসে চিৎকার-চেঁচামেচি করল, বিষোদ্গার করল। যা হোক, সম্মানহানি হলেও কর্তৃপক্ষের মহানুভবতায় সে যাত্রায় চাকরির কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু এবার শুরু হলো নতুন উৎপাত। অফিসের সহকর্মীদের খারাপ ইঙ্গিত ও অসহযোগিতায় পরিবেশ প্রতিকূল হয়ে পড়ল। বাধ্য হয়ে চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। এরপর ২০১৫ সালে একটি বিদেশি বায়িং হাউসে যোগ দিলাম।

চাকরির অভিজ্ঞতাগুলো ব্যবসায় পুঁজি হিসেবে বেশ কাজে লাগল। মিরপুর ডিওএইচএসে দ্বিতীয় আউটলেট খুললাম। এখানে দুজন পূর্ণকালীন ও একজন খণ্ডকালীন কর্মী নিয়োগ দিলাম। বাবার পৈতৃক ভিটার পাঁচতলাটা ভাড়া নিলাম কর্মীদের থাকা-খাওয়ার জন্য। এরপর তৃতীয় আউটলেট নিলাম মিরপুরের ইসিবি চত্বরের কাছে। দুজন পূর্ণকালীন কর্মীর মাধ্যমে আউটলেটটি পরিচালনা করছি। আউটলেটটির বাহ্যিক ডেকোরেশনের কিছু কাজ এখনো অসমাপ্ত রয়েছে। অনলাইনেও স্বপ্নীলের বিক্রি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যাতায়াতের সুবিধার জন্য কিনলাম স্কুটি। ডিভোর্সি নারীর জন্য ঘরে-বাইরে-কর্মস্থলে সর্বত্রই জীবন অতিবাহিত করা বেশ কষ্টের, অস্বস্তিকর একটা পরিবেশ। ২০১৭ সালের শুরুতে বায়িং হাউসের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে ওমরাহ হজে গেলাম। ফিরে এসে ব্যবসার পাশাপাশি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সোশিও ইকোনমিক প্রগ্রামে খণ্ডকালীন বিউটি স্টাইল প্রশিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছি। এরই মধ্যে কন্যার বয়স বেড়েছে। সে এখন এসএসসি পরীক্ষার্থী। আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে তিনটি আউটলেট থেকে এখন মাসিক আয় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। সঙ্গে চাকরির আয় তো রয়েছেই। দীর্ঘ সময়ের এই পরিক্রমায় এখন নিজেকে অনেকটা স্বাবলম্বী মনে হয়। আমি মনে করি, যেকোনো মানুষই সাহস ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে পারলে সফলতা ধরা দেবেই। ’’


মন্তব্য