kalerkantho

ঢাকার অতিথি

গতির শহর ঢাকা!

মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দেখতে বাংলাদেশে এসেছিলেন আমেরিকান তরুণ জোশ মোজিকা। ঢাকা ও কক্সবাজার মিলিয়ে থেকেছেন ১২ দিন। এর মধ্যে বন্ধুত্ব পাতিয়েছেন অনেক বাংলাদেশির সঙ্গে। তাঁর সেসব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



গতির শহর ঢাকা!

‘হিচহাইকিং’ শব্দটি বাংলাদেশে খুব একটা পরিচিত নয়। ইউরোপ-আমেরিকায় যাঁরা ভ্রমণ করেন, তাঁরা পথের পাশে দাঁড়িয়ে বুড়ো আঙুল দেখালেই ট্রাক ড্রাইভাররা বুঝে যান, এই পর্যটককে বিনা খরচায় নিয়ে যেতে হবে। যদি সময় ও সুযোগ থাকে, তাহলে ট্রাক থামিয়ে তুলে নেন যাত্রীকে। বাংলাদেশে ভ্রমণ করতে এসে বিদেশিদের অনেকে এটি করতে চাইলেও সুযোগ হয়ে ওঠে না। তবে আমেরিকান তরুণ জোশ মোজিকা সেই সুযোগটাও আদায় করে নিয়েছেন।

৩২ বছর বয়সী মোজিকা পেশায় ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট। গত নভেম্বরের ১৬ তারিখে ঢাকায় এসেছিলেন। পরে গিয়েছিলেন কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরে। সেখান থেকে আবার ঢাকায় এবং একই মাসের ২৮ তারিখ বাংলাদেশ ছাড়লেন। হিচহাইকিংয়ের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাটা তাঁর হয় কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গাশিবিরে যাওয়ার পথে। মোজিকা বললেন, ‘কক্সবাজার পৌঁছে প্রথম দিনেই সিদ্ধান্ত নিলাম মিয়ানমার সীমান্তের কাছে যাব। অর্থাৎ যেখানে রোহিঙ্গারা আছে। আশ্রয়শিবিরে ওরা কেমন আছে দেখাটা জরুরি। ওখানে যেতে হলে বেশ কয়েক মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে। সিএনজি নিলাম। অনেকটা পথ এগোলাম। পরে আমাকে কিছু সময়ের জন্য হিচহাইকিং করতে হয়। ছোট্ট একটি সাদা ট্রাকে চড়ে বসেছিলাম। প্রথমে সামনের দিকে ছিলাম। কিন্তু এক লোক আমাকে পেছনে যেতে বললেন। তাঁর সঙ্গে একটি শিশু ছিল। আমি দেখলাম, ট্রাকের পেছনটা লোকে বোঝাই। পরে চলে গেলাম একেবারে পেছনের দিকে। ট্রাকের বডির সঙ্গে ঝুলে রইলাম। ঝুলে ঝুলেই বাংলাদেশের গ্রাম দেখেছি। আর স্থানীয়রা আমাকে এই অবস্থায় দেখে খুব হাসছিল। আমিও মজা পাচ্ছিলাম।’

ঢাকা তাঁর কাছে একটি দারুণ শহর। তবে এই দারুণ শহরটি প্রথমেই তাঁকে ভোগান্তিতে ফেলেছিল বলে জানান মোজিকা। বললেন, ‘এর জন্য প্রধানত দায়ী ভাষা। ভাষাগত বাধার কারণে বিমান থেকে নেমে আমার হোস্ট জাফরের বাড়ি চিনতে খুব সমস্যা হয়েছিল। সিএনজি ড্রাইভার, নিরাপত্তাকর্মী—কারো সঙ্গে ভাষাগত যোগাযোগটা সহজ ছিল না। আমি বাংলা বলতে জানি না। আর ওরা জানে না ইংরেজি। অনেক ধকল সামলে জাফরকে খুঁজে পেতে হয়েছে। সে আমাকে সত্যিই ভালো একটা থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তার পরিবারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। আমার বিমানের টিকিট কাটাসহ অনেক কিছুই করেছে সে।’

এই অনেক কিছুর মধ্য থেকে কী কী আবিষ্কার করলেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি আবিষ্কার করেছি গতি। সবখানে দেখলাম লোকজন খুব ব্যস্ত। শুধুই ছুটে চলছে। ঢাকার এই ছুটে চলাটা ব্যাপক রঙিন, মনোমুগ্ধকর! এর মধ্যেই ঘটে যাচ্ছে

আরো অনেক কিছু। গতির শহর ঢাকা! আমি ওসব গতি ফোনে ভিডিও করে রেখেছি। ব্যস্ত হয়ে মানুষের হেঁটে চলার দৃশ্যও আছে। কক্সবাজার থেকে ফিরে এসে আট দিন পর আবার জাফরের সঙ্গে দেখা করি। তখন শপিং মলে যাই। জনারণ্যের মধ্য দিয়ে চার চাকার বাসে ঘুরে বেড়িয়েছি। পাগলাটে ট্রাফিকব্যবস্থা দেখতে পারাটা আমার কাছে ছিল অন্যতম মজার অভিজ্ঞতা।’

বাংলাদেশের মানুষ কেমন? ‘সত্যি বলতে, বাংলাদেশের মানুষ অসাধারণ। সবাই সহযোগিতাপ্রবণ। অনেকেই আমার সঙ্গে দেখা করে একসাইটেড ছিল। অনেকেই যখন বুঝতে পারল আমি আমেরিকান, তাদের অন্য রকম সাড়া পেয়েছি। বাংলাদেশে আমি বেশ কয়েকজন ভালো বন্ধুও পেয়ে গেছি। সামগ্রিকভাবে গোটা দেশের মানুষকে বলা যায় বন্ধুপ্রবণ, দয়ালু এবং সব সময়ই উত্ফুল্ল। এরা একজন অন্যজনের সঙ্গে যেভাবে কৌতুক করে, এটা দেখে ভালো লেগেছে। আমার বন্ধু ইরফান, রোহিঙ্গাশিবিরে আমাকে সহযোগিতা করেছে। এক ফটোগ্রাফারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সে ভালো ছবি পেতে আমাকে কিছু টিপস দিয়েছিল। ছবির ভালো স্পটগুলোর কথা বলেছিল। আর হ্যাঁ, বাংলাদেশের খাবার খুব আশ্চর্যজনক। পৃথিবীর যেখানে যাই, সেখানেই ফ্রাইড রাইস আমার প্রিয়।’


মন্তব্য