kalerkantho


সদরঘাট

‘চাঁদার টাহা না দিলে ডাহায় মোর বাড়ি থাকত’

মো. জহিরুল ইসলাম   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘চাঁদার টাহা না দিলে ডাহায় মোর বাড়ি থাকত’

‘এরশাদের আমল থেইক্কা নৌকা চালাই, হেই সময় রোজগার আছিল, সংসারে কোনো অভাব আছিল না। বাবা, অহন বড় দুঃখে আছি। ৬০/৭০ বছর বয়স, অহনো নৌকা বাইয়া সংসার চালাই। যেই থেইক্কা নৌকা চালাই, চাঁদার টাহা না দিলে ডাহায় মোর একটা বাড়ি থাকত! মালিকরা ডাহাইত, নৌকা কিনতে দেয় না।’ কথাগুলো বলছিলেন সদরঘাটে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে নৌকা বাওয়া মান্নান মাঝি।

সদরঘাটে নৌকার মাঝিদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়ার নিয়ম না থাকলেও প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার মাঝির কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। বিআইডাব্লিউটিএ বলছে, এ বিষয়ে কিছুই জানে না তারা। আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা একে-অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে অবৈধ চাঁদা আদায়। অভিযোগ আছে, নিউভিশন ইকোসিটির পরিচালক মো. শিপু আহমেদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া এর সঙ্গে জড়িত বিআইডাব্লিউটিএর এক কর্মকর্তা, যাঁর বিরুদ্ধে এরই মধ্যে ঘুষ, চাঁদাবাজিসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।

সিমসনঘাট থেকে আলম মার্কেট, সদরঘাট থেকে তেলঘাট-রহমান সাহেবের ডগ, ওয়াইজঘাট থেকে আলমনগর নৌপথে চলে প্রায় দুই হাজার নৌকা। পারাপারের ইজারা নিয়ে অবৈধভাবে নৌকার মাঝিদের কাছ থেকে প্রতিদিন ১০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। অথচ এক বছর আগে টাকা আদায়ের দায়িত্ব নেয় বিআইডাব্লিউটিএ। যেখানে মাঝিদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কোনো নিয়ম ছিল না। বর্তমানে পারাপারের গেটগুলোতে প্রতিদিন দুই লাখের বেশি টাকা আদায় হলেও কর্তৃপক্ষ পায় মাত্র ৯০ হাজার টাকা। বাকি টাকার হিসাব নেই কারো কাছে। আর মাঝিদের কাছ থেকে তোলা টাকা কোথায় যাচ্ছে তা সবাই জেনেও জানে না। এ ছাড়া ওয়াইজঘাট এলাকায় আগের সবজির আড়ত খালি করে ব্যবহার করা হচ্ছে অস্থায়ী ট্রাক স্ট্যান্ড হিসেবে। যেখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার টাকা উঠলেও সরকারি কোষাগারে জমা হয় না এক টাকাও।

জানা যায়, পুরো প্রক্রিয়ার দেখাশোনা করছে ঘাটশ্রমিক নামে অনিবন্ধিত একটি সংগঠন। যার পরিচালনায় রয়েছে শিপু আহমেদ। আর এসব কাজে দূর থেকে সহযোগিতা করছেন সিবিএ সভাপতি ও বিআইডাব্লিউটিএ (সহকারী, অর্থ পুল, মতিঝিল) কর্মকর্তা আবুল হোসেন। এ বিষয়ে আবুল হোসেন বলেন, ‘আমি অফিসে কাজ করি। হঠাৎ করেই নেতৃত্বে চলে এসেছি। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার করা হচ্ছে। ওখানে আওয়ামী লীগের কেউ ছিল না। বেশির ভাগই বিএনপি মতাদর্শের। সংগঠনটি করার পরেই সবাই আমার পেছনে লেগেছে। সব বিষয় আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আমি এর কিছুই জানি না।’ নৌকা থেকে উঠানো টাকা পান কি না এমন প্রশ্নে উত্তরে তিনি বলেন, ‘এই টাকা কারা পাচ্ছে আমি জানি না। নৌকার মাঝিদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। শুধু জানি, ঘাটে শ্রমিক দিয়ে থাকে শিপু আহমেদ।’ আর শিপু আহমেদ বলেন, ‘এত টাকা মনে হয় নেওয়া হয় না। এটি আসলে টেন্ডার হয়ে থাকে; যার রাজস্ব বিআইডাব্লিউটিএও পায়। মাঝিদের কাছ থেকে কিসের টাকা তুলছে, কে নিচ্ছে এই বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমার লোক যে টাকা তোলে, সেটা আরো কম।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওয়াইজঘাটের কাছেই ঘাটশ্রমিক নামে সংঠনটির অফিস। সেখানে গিয়ে কথা বলা যায়নি কারো সঙ্গে। খবর নিয়ে জানা যায়, অফিস থাকলেও এখানকার কেউ দায়িত্ব নিয়ে কথা বলতে চায় না। যারা সংগঠনটির নাম দিয়ে সব কাজ পরিচালনা করছে তাদের কেউ কেউ নিজের পরিচয় গোপন করে আশপাশেই অবস্থান করে। অফিসের পাশ দিয়ে ভেতরে নদীর পারে যেতেই দেখা মিলল সারি সারি নৌকায় মাঝিরা ডাকছে—এই পারাপার-পারাপার বলে।

অনিবন্ধিত ঘাটশ্রমিক অফিস

উপস্থিত মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সারা দিন নৌকা চালিয়ে একজন মাঝি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করতে পারেন। বৈধ-অবৈধ ও নিজের খরচের টাকা বাদ দিয়ে নামমাত্র টাকা থাকে মাঝির পকেটে। আব্দুর রহমান নামে এক মাঝি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাঙ্গা দিন নাও চালাইয়া ৬০০/৭০০ টাকা কামাই হরি। এহান থেইকা ১০০ টাহা ইজারাদাররে দেতে অয়, মালিকরে ৮০ টাহা, ফাহারা ও সিরিয়াল ১৫ টাহা, আরো এই হেই মিলাইয়া ২০০ টাহা খরচ। দিন শেষে ৩০০ টাহার মতো থাহে। এই দিয়া বাসা ভাড়া, হগ্গলরে লইয়া থাকতে কষ্ট অয়।’ মাঝিদের নিয়ে ‘ঢাকা নৌকা মাঝি বহুমুখী সমবায় সমিতি’ নামে একটি সংগঠন রয়েছে। সমিতির কারো কারো আর মাঝিদের মতে, সময়ের বিবর্তনে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, নানা অজুহাতে পাবলিক পরিবহনের ভাড়া বেড়েছে; তার পরও ভাড়া বাড়াননি মাঝিরা। একজন লোক পার করলে আগে নিতেন পাঁচ টাকা। এখনো সেই টাকাই নেন তাঁরা। সরকার সবার উন্নতির কথা ভাবলেও মাঝিদের কথা ভাবছে না।

জানা যায়, মাঝিরা দলগত, এককভাবে ও ঘণ্টা হিসেবে সাধারণত পারাবার করে থাকে। দলগতভাবে ৮/১০ জন যাত্রী থাকে, নেওয়া হয় পাঁচ টাকা করে, একক হলে ২৫-৩০ টাকা আর ঘণ্টা হিসেবে দরাদরির মাধ্যমে ভাড়া ঠিক হয়। কিছু মাঝি আছেন, যাঁরা নোঙর করা লঞ্চে যাত্রী উঠিয়ে দেন। তবে এত কষ্টের আয়ের সিংহ ভাগ অর্থ থাকছে না মাঝিদের হাতে।

এ বিষয়ে বিআইডাব্লিউটিএ ঢাকা নদী বন্দরের যুগ্ম পরিচালক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘নৌকা থেকে কে টাকা নেয় সেটা আমি জানি না। আমরা টার্মিনালগুলোর উন্নয়ন ও পরিবেশ সুন্দর করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি।’ আবুল হোসেনকে চেনেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তিনি মতিঝিল অফিসে বসেন। তাঁর সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারব না। আমরা কিছু শ্রমিক নিয়ে থাকি, যা ঘাটশ্রমিক সংগঠন দিয়ে থাকে। ওয়াইজঘাটের পাশে খালি জায়গায় স্ট্যান্ড করা হবে। আমি ব্যস্ত আছি আর সময় দিতে পারছি না ভাই।’


মন্তব্য