kalerkantho


ঢাকার খোঁজে

আলু বেচ, ছোলা বেচ, বেচ বাখরখানি

আবুল হাসান রুবেল   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আলু বেচ, ছোলা বেচ, বেচ বাখরখানি

ছবি : শেখ হাসান

বাংলাদেশ ভাতের দেশ। ভাতই আমাদের প্রধান খাদ্য। কিন্তু ঢাকায় বিভিন্ন ধরনের এত রুটি পাওয়া যায় যে যেসব দেশে রুটিই প্রধান খাদ্য, সেখানেও হরেক রকমের এত রুটি পাওয়া যায় না। এসব রুটির প্রতিটিরই নিজস্ব ইতিহাস ও বংশ পরিচয় আছে। ঢাকার অধিবাসীরা বহুদিন থেকেই রুটি খেতে অভ্যস্ত ছিল, শত বছর আগেও তারা শুধু দুপুরে ভাত খাওয়ার অভ্যাসটা রপ্ত করেছিল। একসময় লোকজন ঘড়ি ব্যবহার করত খুব কম। তখন ঢাকার বাসিন্দারা চক থেকে দুধ ও সর বিক্রেতাদের উঠে যাওয়া থেকে বুঝত রাত ১২টা বেজে গেছে। আর তন্দুরের চুলায় আগুন জ্বালানো থেকে বুঝত ভোর হয়েছে। এ থেকে রুটির সঙ্গে ঢাকাবাসীর জীবনযাত্রার ঘনিষ্ঠতার পরিচয় মেলে। 

এখন বাড়িতে ছেঁকা যে রুটি খুব সাধারণ, সেটাকে হাকিম হাবিবুর রহমান তাঁর ১৯৪৫ সালের দিকে রচিত ‘ঢাকা পাচাশ্ বারস্ পহেলে’ গ্রন্থে বলেছেন সেটা ইদানীং চালু হয়েছে। তখনো ঢাকার বেশির ভাগ পরিবার সকালবেলা বাখরখানি দিয়ে নাশতা করত। লখনউতে যেমন বাখরখানি আর শেরমাল একই জিনিস, ঢাকায় তা নয়। বাখরখানি আর শেরমালের খামিরও ছিল আলাদা ধরনের। এই দুই-ই ঢাকায় প্রচলিত ছিল। ছিল তন্দুর রুটি, নান রুটি, চাপাতি রুটি, আবি রুটি, ভাঁজযুক্ত মচমচে পরোটা, রিলের পরোটা, টানা পরোটা, কিমা পরোটা, শবরাতি রুটি, বাগদাদি রুটি, গোল পাউরুটি, ছিত্রুটি, কাকচা, কুলচা, নানখাতায়ি ইত্যাদি নামে হরেক রকমের রুটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অনেকটাই হারিয়ে গেছে, আবার অনেকটা নানা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গিয়ে হয়তো রূপ বদলে টিকে আছে। যেমন নানখাতায়ি এখন টিকে আছে বিস্কুট হিসেবে।

ঢাকার শেরমাল ছিল তিন ধরনের রওনগী শেরমাল, গাওদিদাহ বা টাপু, গাওযবান। এর ভেতরে প্রধান ছিল রওনগী শেরমাল, যেটা প্রধানত রাতে খাওয়া হতো। গাওদিদাহ খাওয়া হতো সাধারণভাবে সকালে। বাচ্চা ও অসুস্থ ব্যক্তিরাও এটা খেত আর ডিম্বাকৃতির শেরমালকে বলা হতো গাওযবান। শেরমাল এখন বিশেষ উপলক্ষ ছাড়া বা বিশেষ ব্যবস্থা ছাড়া পাওয়া যায় না। সেই তুলনায় বাখরখানি এখনো ভালোভাবেই টিকে আছে বলা যায়। কিন্তু তার মান ব্যাপকভাবে কমে গেছে, তার উপাদানেরও পরিবর্তন হয়েছে। বাখরখানি বানাতে ভালো মানের ময়দা ও মাওয়া মিলিয়ে খুব ভালোভাবে ছানতে হয়। এরপর লেই বানিয়ে ঘি লাগিয়ে সেটা ভাঁজ করতে হয়। এরপর পিঁড়িতে রুটি বানিয়ে তার ওপর তিল ছিটাতে হয়। এরপর একে তন্দুরে স্থাপন করে এতে দুধের ছিটা দিতে হয়। এরপর বাখরখানি প্রস্তুত হয়। আর এখন বাখরখানি তৈরির উপকরণ হলো—ময়দা, তেল, লবণ ও পানি। তৈরির পদ্ধতিও অনেকটা সাধারণ রুটির মতোই। যে বাখরখানিতে পানির ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল, ব্যবহৃত হতো দুধ ও ঘি। সেসবের বালাই এখন নেই।

কেমন করে এলো এই বাখরখানি বা কেমন করেই তার নাম হলো বাখরখানি? জনশ্রুতি আছে, “নর্তকি খনি বেগম ও আগা বাকের পরস্পরের প্রেমে পড়েন। উজিরপুত্র নগর কোতোয়াল জয়নাল খানও ভালোবাসতেন খনি বিবিকে। এতে জয়নালের সঙ্গে আগা বাকেরের যুদ্ধ হয় এবং জয়নাল হেরে যান। এর প্রতিশোধ নিতে জয়নাল খনি বেগমকে তলোয়ারের আঘাতে হত্যা করেন। বাকেরগঞ্জে সমাধিস্থ করা হয় খনি বেগমকে। পরে আগা বাকের সুবেদার মুর্শিদকুলী খাঁর মেয়ের জামাই হয়েছিলেন। ঢাকার মানুষ এই কাহিনি জীবিত রাখতে তাঁর প্রিয় রুটির নাম রাখেন ‘বাকরখনি’। পরে তা পরিবর্তিত হয়ে ‘বাখরখানি’ হয়েছে।’’ গল্পটা বেশ জমজমাট তাতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু কতটুকু সত্য আর কতটুকু রং চড়ানো সেটা বলা মুশকিল। হাকিম হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, ঢাকার বাখরখানির সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্য কোনো জায়গার বাখরখানি পুরোপুরি মেলে না। সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্য পাওয়া যায় কাশ্মীরি বাখরখানির সঙ্গে। সেই বাখরখানিও ঢাকায় এসে গুণে-মানে প্রভূত উন্নতি করেছে। ফলে ঢাকার বাখরখানি সম্পূর্ণ আলাদা বলে নিজেকে দাবি করতে পারে। বিভিন্ন জায়গায় বিশেষত পুরান ঢাকায় এখনো বাখরখানির অনেক কারিগর আছেন, যাঁরা পোষাতে পারেন না বলে সবচেয়ে ভালো মানের বাখরখানি হয়তো বানান না; কিন্তু তার প্রস্তুতপ্রণালী তাঁরা ভোলেননি, বংশপরম্পরায় তাঁরা সেই বিদ্যা বহন করে চলেছেন। যদি এই খাবারের সুস্বাদু হওয়ার সুনাম আমরা ফিরিয়ে আনতে এবং ঢাকার এই ঐতিহ্যকে আবারও জীবন্ত করতে চাই তাহলে এই কারিগররা তার বড় সহায় হতে পারেন। যদি কোনো উদ্যোক্তা এগিয়ে আসেন এবং ভালো মানের নিশ্চয়তাসহ বাজারজাত করার উদ্যোগ নেন, তবে তা বাণিজ্যিকভাবেও অলাভজনক হবে বলে মনে হয় না।

অধুনা ঢাকায় যত ধরনের ফাস্ট ফুডের চল হয়েছে, তার প্রতিটির সঙ্গেই স্বাদে-গন্ধে পাল্লা দিতে পারে ঢাকার এসব ঐতিহ্যবাহী রুটি। আর এর সঙ্গে যেসব হালুয়া, কাবাব, মাংসের চাপ, মসলা চা, নানা রকম শরবত খাওয়া হতো তা এক অপূর্ব স্বাদের আস্বাদ দিত ঢাকাবাসীকে। এই স্বাদ জিবে অনেক দিন লেগে থাকার মতো। প্রতিটি দেশই তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোকে সংরক্ষণ করেছে, তার উন্নতি ঘটিয়েছে, তাকে ছড়িয়ে দিয়েছে। আর আমরা আমাদের বিপুল বৈচিত্র্যকে হারিয়ে ফেলেছি, তার মানের অবনমন ঘটিয়েছি, নানা ভেজাল মিশিয়ে তার বিশিষ্টতা নষ্ট করেছি। ফলে এগুলো জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। আমাদের নগরায়ণের ধরনের কারণে সব ক্ষেত্রেই একটা বিষম বিকাশ ঘটেছে। ঢাকার বৈচিত্র্যময় রুটিগুলোর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।


মন্তব্য