kalerkantho


সৌন্দর্য হারাচ্ছে ফার্মগেটের একমাত্র পার্কটি

হাবিবুর রহমান   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সৌন্দর্য হারাচ্ছে ফার্মগেটের একমাত্র পার্কটি

ছবি : লুৎফর রহমান

চারদিকে ভাঙা লোহার বেস্টনি। ভেতরে ঢুকতেই ময়লার স্তূপ। কখনো কখনো পথেই কাউকে দেখা যায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। সবুজ ঘাসের আস্তর তেমন চোখেই পড়ে না। এমন অবস্থা ঢাকার কেন্দ্রস্থল ফার্মগেটের একমাত্র পার্ক, আনোয়ারা পার্কটির। এটির নেই কোনো নামফলকও। তাই ভেতরে আসা বেশির ভাগ মানুষের কেউই নির্দিষ্টভাবে এই পার্কের নাম জানে না। পার্কের পশ্চিম পাশে বসেছিলেন ষাটোর্ধ্ব বয়সের সাবেক সরকারি চাকরিজীবী এনায়েত রহমান। কথা হলো তাঁর সঙ্গে। তিনি জানান, যখন চাকরি করতেন বেশির ভাগ সময় এখানে ঘুরতে আসতেন। ২০ কিংবা ২৫ বছর আগে পার্কটি ছিল বেশ আকর্ষণীয়। সবুজ গাছের নিচে সাজানো-গোছানো পরিবেশ। বসলে মন জুড়িয়ে যেত। চারদিকে নিরাপত্তাব্যবস্থা আর প্রবেশমুখেই সব সময় থাকত পাহারাদার। পার্কের এই অবস্থায় থাকায় আগের মতো আর এখানে আসেন না তিনি। তাই তাঁর বহুদিন পর এখানে আসা। এ পার্কে এখন দিনের আলোতেই দেখা মেলে মাদকসেবী, যৌনকর্মী, ছিন্নমূল মানুষ, হকারসহ সব ধরনের মানুষ। তবে যাদের মুক্ত আকাশের নিচে পার্কে ঘুরতে আসার কথা, তাদেরই দেখা মেলে কম। সকাল-বিকাল পার্কটি রূপ নেয় বিশাল আকারের মাঠের মতো। বিকেলে মাঠের চেয়েও বেশি অত্যাচার হয়। ভেতরে দুই অংশে ১০ থেকে ১৫ শতাংশে চলে ক্রিকেট, ফুটবল ও ভলিবল খেলা। পার্কের মধ্যে দর্শনার্থী বসার জন্য সিমেন্টের তৈরি বেঞ্চগুলো নেই বললেই চলে। ময়লা ছাতাপড়া বেঞ্চগুলো ভেঙে পড়ে আছে এখানে-সেখানে। ভাঙা থেকে রেহাই পাওয়া কিছু বেঞ্চির বেশির ভাগই থাকে মাদকসেবী আর ছিন্নমূল মানুষের দখলে। রোদ থেকে বাঁচতে ছায়ার জন্য দেওয়া ছাতাগুলোর একই অবস্থা। মাঝেমধ্যে কাগজপত্রবিহীন অবৈধ লেগুনা গাড়িগুলো পার্কের ভেতরেই পার্ক করে রাখা হয়। হকারের গাড়ি মালামালের স্টোর হিসেবে ব্যবহার হয় পার্কের বিভিন্ন অংশে। অনেককেই দেখা যায় পার্কের ভেতর বসে বিক্রির জন্য বিভিন্ন পণ্য প্রস্তুত করতে। আবার অনেকে পার্কের ভেতরেই সাজিয়ে বসেছে চা, পান, বিস্কুটের দোকান।

পার্কের ভেতরে দোকানের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে বিক্রেতা আবুল হোসেন বলেন, ‘আমার দোকানটি বাইরেই থাকে। বিকেল হলে ভেতরে আসি, আবার বাইরে চলে যাই। পার্কের ভেতরটা ময়লা-আবর্জনায় নোংরা কইরা রাখছে। আমি যতটুকুতে থাকি সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখার চেষ্টা করি। তাই আমারে কেউ কিছু কয় না।’

যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে পুরো পার্কটি এখন রূপান্তরিত হয়েছে ডাস্টবিনে। ভাসমান মানুষসহ পথচারীরা মলমূত্র ত্যাগ করার জন্য বেছে নিয়েছে পার্কটিকেই। কোথাও কোথাও পাশ দিয়ে চলার মতো অবস্থা নেই, গন্ধে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। যদিও পার্কের পশ্চিম পাশে সিটি করপোরেশনের উন্নত টয়লেট রয়েছে। পার্কের ময়লা আবর্জনার এমন অবস্থা দেখে আড্ডা দেওয়ার সময় তেজগাঁও কলেজ সমাজকর্ম বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মোমেন, মেহেদী, অপু, আফিফ, তারেকসহ ছয় বন্ধু মিলে ভেবেছিলেন পার্ক পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু তাঁদের ওই উদ্যোগ বেশি দূর এগোতে পারেনি। মোমেন আমিন বলেন, ‘আমরা বেশির ভাগ সময় বন্ধুদের নিয়ে এখানে আড্ডা দিই। বন্ধুদের নিয়ে আড্ডার সেলফি তুলেও ফেসবুকে দিতে পারি না। কারণ যেদিকেই ছবি তুলি পেছনে ময়লা থাকে, পুরো পার্কের পরিবেশটাই অস্বাস্থ্যকর। পরিষ্কার কিভাবে করব, যতটুকু পরিষ্কার করব তার চেয়ে আরো বেশি ময়লা হয় প্রতিদিন।’ মেহেদী বলেন, ‘এখানে ময়লার অবস্থা অনেক করুণ। দিনে পার্কে আসতে পারলেও রাতে আসার মতো পরিবেশই থাকে না। রাতে চলে নেশাসহ নানা ধরনের অসামাজিক কাজ।’

হকার মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আগে সংসদ ভবনের ঝাড়ুদাররা সকালে এখানে পরিষ্কার করে, এরপর সংসদ ভবন পরিষ্কার করতে যেত। কিন্তু এখন অনেক বছর ধরে আর আসে না। এটা নিয়ে কারো মাথাব্যথাও নেই।’ নিম্ন আয়ের কিছু পরিবার পার্কটিকে ঘিরে গড়ে তুলেছে বসতি। বসতির লোকজন কাপড় শুকানোর স্থান বেছে নিয়েছে পার্কের ভেতরে। তাদের অনেকে মাদক বিক্রি করে। মাদকসেবীরা দলবেঁধে খোলা স্থানে বসে প্রকাশ্যেই সেবন করে মাদক। বেশির ভাগ সময় অনেক মাদকসেবী মাতাল হয়ে উদ্যানের যেখানে-সেখানে শুয়ে থাকে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেল রাতের আনোয়ারা পার্ক। রাতে পার্কের অবস্থা আরো ভয়াবহ। পার্কের ভেতরের বেশি ভাগ লাইট নষ্ট থাকার কারণে সৃষ্টি হয় ভৌতিক পরিবেশের। ভেতরে পাহারাদার, পুলিশ কিংবা কোনো ধরনের নিরাপত্তাকর্মী থাকে না। ভ্রাম্যমাণ পতিতারা খদ্দেরের অপেক্ষায় বসে থাকে পার্কের পূর্ব ও দক্ষিণ কোনায়। পার্কের ভেতরেই চলে এসব অনৈতিক কার্যকলাপ। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, লাইটগুলো ঠিক করা হলেও ছিনতাইকারী আর দেহব্যবসায়ীর দালালরা সব লাইটের তার ছিঁড়ে ফেলে। বাল্ব নষ্ট করে ফেলে। তাই সন্ধ্যা নামলেই এখানে হরহামেশাই ছিনতাইসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যায়।

এ বিষয় মুঠোফোনে তেজগাঁও থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার রুবায়েত জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের পুলিশ পার্কে  দিনরাত পাহারায় থাকে। পার্কের ভেতরে অনৈতিক কার্যকলাপ দেখলে অথবা মাদক ব্যবসায়ীদের পেলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিই। তবে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে পার্কের এসব বিষয়ে কেউ লিখিত কিংবা মৌখিক অভিযোগ জানায়নি। অভিযোগ জানালে আমাদের ব্যবস্থা নিতে সুবিধা হয়।’

এ বিষয়ে ২৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান (ইরান) বলেন, ‘পুলিশ কিংবা আমাদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযান চালালে পুলিশ একদিকে এলে মাদকসেবীরা পার্কের অন্য দিক দিয়ে পালিয়ে যায়। তাই মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের ধরা সম্ভব হয় না। এখানে পুলিশের স্থায়ীভাবে থাকা জরুরি। পার্কটি আগে ছিল গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতায়। দুই মাস হলো সিটি করপোরেশনের আওতায় এসেছে। যেহেতু আমাদের হাতে এসেছে, এখন আমরা পরিকল্পিতভাবে পার্কের বেঞ্চ, লাইট, চারপাশে নিরাপত্তা, ছাতাগুলোর নিচে বসার ব্যবস্থা, বিনোদনের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থাসহ একটা পরিপূর্ণ আধুনিক পার্ক বলতে যা বোঝায় তার ব্যবস্থা গ্রহণ করব। আমরা এরই মধ্যে এমন একটি আবেদনও করেছি সিটি করপোরেশনের কাছে। এখন  সিটি করপোরেশন যদি এগিয়ে আসে তবেই সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আমাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে তো আর এত সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। আমাদের এলাকার লোকজন ও প্রশাসনের সহযোগিতায় কুতুববাগ দরবার শরিফের বার্ষিক ওরশ শরিফ বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি। তাই আমি মনে করি, প্রশাসন আর সবার সহযোগিতা পেলে এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে।’


মন্তব্য